গ্রামের বাড়িগুলো ফাঁকা, শহরমুখী হচ্ছে মানুষ: শিক্ষার অভাব কেন্দ্রীয় কারণ
গ্রামের বাড়ি ফাঁকা, শহরমুখী মানুষ: শিক্ষার অভাব কেন্দ্রীয় কারণ

গ্রামের বাড়িগুলো ফাঁকা, শহরমুখী হচ্ছে মানুষ: শিক্ষার অভাব কেন্দ্রীয় কারণ

গ্রামগুলো থেকে শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা ক্রমাগত বাড়ছে, যার ফলে গ্রামীণ এলাকার বাড়িগুলো ফাঁকা হয়ে পড়ছে। রমনা গ্রামের উদাহরণে দেখা যায়, ওসমান আলী সরকারের চকে দেড় বিঘার ওপর পুকুর, গোয়ালসহ দোতলা বাড়ি রয়েছে, কিন্তু নয় সদস্যের পরিবারে মাত্র তিনজন বাস করেন। একইভাবে, খলিলুর রহমান ও সাত্তার সরকার টিনের বাড়ি ভেঙে এই বাড়ি নির্মাণ করেছেন, কিন্তু অধিকাংশ সদস্য শহরে চলে গেছেন।

গ্রামের অবস্থা: বাড়িগুলো ফাঁকা, মানুষ শহরে

পাশের লুৎফর সরকারের চকেরও একই অবস্থা। দুই বিঘা জমির ওপর খেলার মাঠসহ তিনতলা বাড়ি, কিন্তু এক ছেলে অস্ট্রেলিয়ায়, আরেক ছেলে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। গ্রামের শিশুরা খেলাধুলা করে, কিন্তু বাড়িগুলো ফাঁকা। আবদুল বারী সরকারের চকেরও একই অবস্থা, যেখানে তিন ছেলে, ছেলের বউ, নাতি-নাতনিদের ভরা চক ছিল, এখন মাত্র চারজন মানুষ বাস করছেন।

ঘটনাগুলো রমনা গ্রামের সবচেয়ে বড় পাড়া এনায়েতুল্যাহ সরকারের গ্রামের। এই পাড়া চারটি অংশে বিভক্ত, মূল অংশে বিখ্যাত জোতদার এনায়েত সরকার ও জেনায়েত সরকারের বাড়ি। এনায়েত সরকারের তিন ছেলে দবির উদ্দীন সরকার, নুরুল হক সরকার ও নছির সরকারের পরিবারের সদস্যরা চাকরি, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও উন্নত জীবনের উদ্দেশ্যে গ্রাম ছেড়েছেন।

শিক্ষার অভাব: গ্রাম ছাড়ার মূল কারণ

দেখা গেছে, গ্রাম ছাড়ার মূল কারণ উপযুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাব। প্রথমে আশপাশের শহরগুলোয় উন্নত স্কুল আছে, সেখানে অভিভাবকেরা সন্তানদের নিয়ে যাচ্ছেন। তারপর যে শহরগুলোয় বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজ আছে, এমন শহরে মানুষ স্থানান্তরিত হচ্ছেন। অর্থাৎ, গ্রামে ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলে চাকরিজীবীরা সন্তানদের এলাকায় রেখে পড়ালেখা করাতে পারতেন।

পাশের গাইবান্ধা জেলার উদাহরণে দেখা যায়, সেখানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ভালো স্কুল থাকায় গ্রাম ছাড়ার হার অনেক কম। অথচ নব্বইয়ের দশকে চিলমারীতে চারটি লোকাল ট্রেন চলত, এবং গ্রাম ও শহরের স্কুলের মধ্যে তেমন ভেদ ছিল না, তখন পিতারা পরিবারকে গ্রামে রেখে চাকরি করতে যেতেন।

ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ: গ্রামভিত্তিক বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা

রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য, মৌলভি ইসমাইল হোসেন সিরাজী, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, আবুল ফজল, আরজ আলী মাতুব্বরের মতো ব্যক্তিরা গ্রামে বসে জ্ঞানচর্চা করেছেন। তাঁরা শহরমুখী না হয়েও বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য ও যুক্তিবাদী চিন্তা চর্চা করে গেছেন। কিন্তু বর্তমানে ইন্টারনেটের যুগে গ্রামে বড় মানুষ তৈরি হচ্ছে না, কারণ শিক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় সমস্যা রয়ে গেছে।

অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের ভাষায়, শিক্ষা ব্যবস্থা 'টপ হেভি' হয়ে পড়েছে, যেখানে শক্তিশালী মিডল স্কুলের অভাব রয়েছে। কলেজ তৈরির আগে সাপোর্টিং স্কুল গড়ে তোলা হয়নি, ফলে গ্রামেগঞ্জে কলেজ থাকলেও তা কার্যকর নয়। শিক্ষার আসল জায়গায় নজর দেওয়া হচ্ছে না, যা গ্রাম থেকে শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা বাড়াচ্ছে।

প্রভাব: গ্রামের শিশুরা বড় স্বপ্ন দেখতে পাচ্ছে না

সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো, বড় মানুষেরা সব বড় শহরে চলে যাচ্ছেন, ফলে গ্রামের শিশুরা গাঁয়ে বড় মানুষ দেখতে না পেয়ে বড় স্বপ্ন আর দেখতে পায় না। তাঁদের শিক্ষা ও জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তরুণেরা, এবং কৃষিতে মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। গ্রামে উন্নত স্কুল আর যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করলেই লোকে ভরে উঠবে লোকালয়, এবং গ্রাম থেকে শহরমুখী হওয়ার এই প্রবণতা কমবে।

গ্রামের বাড়িগুলো ফাঁকা হয়ে পড়া এবং মানুষ শহরমুখী হওয়ার এই প্রবণতা শিক্ষার অভাবকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে, যা সমাধানের জন্য গ্রামীণ শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি।