ডাকসু নেত্রী জুমার অভিযোগ ও সমন্বয়হীনতার বিতর্কে উত্তপ্ত শিক্ষাঙ্গন
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সমন্বয়হীনতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা ফেসবুকে শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ তুলেছেন, যা পরে ক্লিকবেইট সাংবাদিকতার দাবিতে আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনে বাদ পড়া সদস্যদের ক্ষোভ
২১ ফেব্রুয়ারি প্রথম প্রহরে ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ডাকসু সদস্যদের একটি অংশ উপস্থিত ছিলেন। সেখানে ভিপি সাদিক কায়েম, জিএস এস এম ফরহাদ ও এজিএস মহিউদ্দিন খানসহ মূলত ছাত্রশিবির সংশ্লিষ্টরা ছিলেন। তবে ডাকসুর অন্যান্য সদস্য, যেমন ফাতিমা তাসনিম জুমা, সর্বমিত্র চাকমা, হেমা চাকমা ও উম্মে উসওয়াতুন রাফিয়ার মতো নেতারা এই অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পারেননি।
এই ঘটনায় প্রথমে ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য সর্বমিত্র চাকমা। পরে ফাতিমা তাসনিম জুমা একটি পোস্টে সমন্বয়হীনতার তীব্র অভিযোগ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘সব সমস্যার মাঝেও সবচেয়ে প্রকট হয়ে ওঠে ডাকসুর সমন্বয়হীনতা। শহীদ মিনারে প্রথম প্রহরে ডাকসু কখন ফুল দিতে যাবে— প্রশ্ন দুইবার করার পর আমাকে জানানো হয়, সিনেট সদস্যরা কেবল রাষ্ট্রীয় প্রটোকলে যাবে। কিন্তু পরে দেখা গেল, একটি দলের ইউনিয়ন লেভেলের কর্মীরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন, কেবল ডাকসুর সদস্যদের জন্য জায়গা হয়নি।’
জুমার পোস্ট ও সংবাদ প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়া
জুমার এই পোস্টের ভিত্তিতে যুগান্তর অনলাইন ‘সাদিক কায়েমদের বিরুদ্ধে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ আনলেন জুমা’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ করে। পরবর্তীতে জুমা নিজের ফেসবুক পেজে এই সংবাদের ফটোকার্ড শেয়ার করে আরেকটি পোস্ট দেন এবং একে ক্লিকবেইট সাংবাদিকতা বলে অভিযোগ তোলেন।
তিনি দাবি করেন, ‘শুরু হয়েছে অপ-সাংবাদিকতা। আমি কোনো পোস্টে সাদিক ভাইয়ের নাম ধরি নাই, অথচ সংবাদমাধ্যম তার নাম ব্যবহার করছে।’ তবে যুগান্তরের প্রতিবেদনে ‘সাদিক কায়েমদের’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যা জুমার আগের পোস্টে ভিপি-জিএস-এজিএসদের দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্নের প্রেক্ষাপটে তৈরি। সংবাদটি সরাসরি জুমার পোস্ট থেকে নেওয়া হয়েছিল এবং এতে ক্লিকবেইট করার কোনো প্রমাণ নেই।
ডাকসুর অভ্যন্তরীণ বিভেদ ও সমালোচনা
ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য হেমা চাকমা যুগান্তরকে জানিয়েছেন, ডাকসুর শীর্ষ তিন নেতা শুরু থেকেই নিজেদের মতো করে চলছেন। তিনি বলেন, ‘মাতৃভাষা দিবস উদযাপনে ডাকসুর আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে কোনো আলোচনা করা হয়নি। ভিপি সাদিক কায়েম, জিএস এস এম ফরহাদ ও এজিএস মহিউদ্দিন নিজেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। শুধু আজ নয়, এর আগেও বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানে তারা একইভাবে কাজ করেছেন।’
জুমার অভিযোগের পর তার ফেসবুক পোস্টের মন্তব্যের ঘরে সমালোচনার ঝড় বইছে। ব্যবহারকারীরা বিভিন্ন মন্তব্যে জুমার অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন:
- মুনতাসির মাহমুদ বলেন, ‘ডাকসুর বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন, যার ভিপি সাদিক কায়েম, তাহলে অভিযোগ তাদের দিকেই যায়।’
- আবুল বাশার মন্তব্য করেন, ‘এখন সাংবাদিকতাও শেখান! আপনি নাম ধরেননি কিন্তু বুঝিয়েছেন কী? ডাকসু নিয়ে কিছু বলবেন সেখানে সমন্বয় করবে অন্য কেউ?’
- জাহিদ মাহমুদ উল্লেখ করেন, ‘সাদিক কায়েমরা মানে ডাকসু নেতারা, টেকনিক্যালি তারা ভুলও না।’
অন্যান্য মন্তব্যকারীরা জুমার পোস্টকে বিভ্রান্তিকর ও অপ্রয়োজনীয় বলে উল্লেখ করেছেন, যা ডাকসুর অভ্যন্তরীণ সংঘাতকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
শেষ কথা: বিতর্কের মূল কারণ ও ভবিষ্যৎ প্রভাব
এই ঘটনা ডাকসুর অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতা ও যোগাযোগের ঘাটতিকে স্পষ্ট করে তুলেছে। ফাতিমা তাসনিম জুমার অভিযোগ এবং পরবর্তীতে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনকে ক্লিকবেইট বলে দাবি করা একটি জটিল বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। শিক্ষার্থী প্রতিনিধিত্বের এই সংগঠনে নেতৃত্বের মধ্যে বিভেদ ক্রমাগত বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে ডাকসুর কার্যক্রমকে প্রভাবিত করতে পারে।
এই বিতর্কে উভয় পক্ষের অবস্থান ও সমালোচনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, সুষ্ঠু সমন্বয় ও স্বচ্ছ যোগাযোগের অভাবে ডাকসুর সদস্যদের মধ্যে অনাস্থা তৈরি হচ্ছে। শিক্ষাঙ্গনের এই সংকট সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, নতুবা ছাত্র সংগঠনের ভূমিকা ক্ষুণ্ণ হতে পারে।
