বিপন্ন ভাষা রক্ষায় এসআইএলের উদ্যোগ: ৯টি নৃগোষ্ঠীর ভাষার বর্ণমালা ও বানানরীতি তৈরি
বাংলাদেশের নৃগোষ্ঠীগুলোর ভাষা একেবারে যাতে হারিয়ে না যায়, সেজন্য ভাষাগুলোর বর্ণমালা ও বানানরীতি তৈরি করছে আন্তর্জাতিক সংগঠন সামার ইনস্টিটিউট অব লিঙ্গুইস্টিকস (এসআইএল)। কোচ, কুঁড়ুক্ষ, হাজংসহ নয়টি ভাষার ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে কাজ করেছে তারা।
ভাষা হারানোর ভীতি ও বর্ণমালার প্রয়োজন
‘তিনটিকিয়া’ ভাষার বর্ণমালা ছিল না। কোচ সম্প্রদায়ের লোকজন ভয় পেতেন, তাদের এই ভাষা বুঝি হারিয়ে যায়। নতুন প্রজন্মের মধ্যে নিজ ভাষার ব্যবহার অনেকটাই কমে যাওয়ায় এই ভীতি অমূলক ছিল না। শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলার শালচোরা গ্রামের বাসিন্দা অমৃত কোচ বলেন, ‘একটি বর্ণমালার দরকার ছিল। সেই বর্ণমালা এখন পেয়েছি। হয়তো এটা আমাদের ভাষার সুরক্ষায় কাজ করবে।’
২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, কোচদের সংখ্যা ১৩ হাজার ৭০২। এত কম সংখ্যায় মানুষের ভাষা বিপন্ন প্রায়। বাংলাদেশে ৫০টির বেশি নৃগোষ্ঠীর প্রতিটির ভাষাই ঝুঁকির মধ্যে। সংখ্যায় যারা বেশি যেমন চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা বা সান্তাল—তাদের ভাষা হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কিছুটা কম। কিন্তু কোচদের মতো ছোট জনগোষ্ঠীর ঝুঁকি অনেক বেশি।
এসআইএলের কাজের পদ্ধতি ও ভাষার তালিকা
এসআইএল ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর কর্নেলিয়াস টুডু বলেন, ‘যখন একটি ভাষা হারিয়ে যায়, তখন হারিয়ে যায় এক বৈচিত্র্যময় জগৎ। গল্পগুলো আর বলা হয় না, পৃথিবীকে দেখার এক স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। আমরা হারিয়ে যাওয়া রোধ করতে চাই।’
সংস্থাটি এক্সপান্ডেড গ্রেডেড ইন্টিগ্রেশনাল ডিসরাপশন স্কেল (ইজিআইডিএস) মানদণ্ড ব্যবহার করে ভাষার অবস্থান জানতে চেষ্টা করে। প্রতিটি বানানরীতি এবং বর্ণমালা তৈরির প্রক্রিয়া ভাষাগোষ্ঠীর মানুষদের সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিয়েই করা হয়। প্রথমে এসব জাতিগোষ্ঠীর লিখিত দলিল বা সাহিত্যের সন্ধান করা হয়। এসব না পাওয়া গেলে বোঝা যায়, তাদের কোনো সুনির্দিষ্ট হরফ নেই। এরপর হরফ ঠিক করা হয়।
এ পর্যন্ত যেসব ভাষার ক্ষেত্রে কাজ করা হয়েছে:
- কোল
- কোডা
- মাহালী
- কুঁড়ুক্ষ
- মাল পাহাড়িয়া
- কোচ
- হাজং
- বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি
- উসই ত্রিপুরা
এসআইএলের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা স্কলাসটিকা শেফালি রিবেরু বলেন, ‘জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেয় তারা কোন হরফ বেছে নেবে। এখানে চাপিয়ে দেওয়ার কিছু নেই।’ গল্প লিখন, বাক্য লিখন, দলগত আলোচনার মাধ্যমে বানানরীতি তৈরির প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
‘ভাষা শিখন’ কর্মসূচি ও শিশুদের শিক্ষা
শুধু বর্ণমালা তৈরি করেই থেমে থাকেনি সংস্থাটি। তারা ‘ভাষা শিখন’ নামে একটি কর্মসূচি চালু করেছে। এর মূল লক্ষ্য হলো ভাষাগোষ্ঠীর মানুষকে তাদের নিজস্ব ভাষার ধ্বনির সঙ্গে পরিচিত করা এবং সেই ধ্বনি থেকে শব্দ ও বাক্য গঠনের কৌশল শেখানো।
প্রাথমিক পর্যায়ে কুঁড়ুক্ষ ও কোচ ভাষাগোষ্ঠীর সঙ্গে এই কর্মসূচি পরিচালিত হয়েছে। এতে ৪০০-এর বেশি তরুণ-তরুণী ও প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি নিজেদের মাতৃভাষায় পড়া ও লেখার দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পেয়েছেন। শিশুদের জন্য মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমও চালাচ্ছে এসআইএল।
রংপুরের মিঠাপুকুরের ওরাঁও সম্প্রদায়ের নির্মলা কুজুর বলেন, ‘আমার আর নিজের ভাষা হারানোর কোনো ভয় নেই। নতুন প্রজন্ম অন্তত ভাষাটি হারাবে না।’
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও সরকারি উদ্যোগের আহ্বান
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান এসআইএলের কাজটিকে ‘খুবই তাৎপর্যপূর্ণ’ বলে মনে করেন। তিনি বলেন, ‘ভাষার লিখিত রূপ বা বর্ণমালা না থাকলে মুখে মুখে তা বেশি দিন টিকতে পারে না। আর যেসব শিশু নিজের ভাষায় ছোটবেলায় শিখতে পায়, তাদের লেখাপড়ার মান ভালো হয়, এটা গবেষণায় প্রমাণিত।’
তিনি বেসরকারি এই উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগে বিপন্ন ভাষার বর্ণমালা বা বানানরীতি তৈরির উদ্যোগ নেওয়ারও পরামর্শ দেন।
