ভারতে ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস: উচ্চশিক্ষায় নতুন দিগন্তের সূচনা
ভারতের দিল্লির উপকণ্ঠে একটি আধুনিক অফিস ব্লকে একদল শিক্ষার্থী বিজনেস ম্যানেজমেন্টের ক্লাসে অংশ নিচ্ছেন। এটি ইউনিভার্সিটি অব সাউদাম্পটনের ক্লাস, যার মূল ক্যাম্পাস প্রায় ৭ হাজার কিলোমিটার দূরে যুক্তরাজ্যের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত। কেবল সাউদাম্পটন নয়, যুক্তরাজ্যের আরও বেশ কিছু নামী বিশ্ববিদ্যালয় এখন ভারতে তাদের ক্যাম্পাস খোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এই খবর নিশ্চিত করেছে।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও শিক্ষা খাতের সহযোগিতা
২০২৫ সালে ভারত ও যুক্তরাজ্যের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন শুরুর অংশ হিসেবে দুই দেশ শিক্ষা খাতে সহযোগিতা বাড়াতে একমত হয়। এর আওতায় গত বছর আগস্টে ১২০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে ভারতে প্রথম ব্রিটিশ ক্যাম্পাস হিসেবে যাত্রা শুরু করে সাউদাম্পটন। আগামী এক দশকের মধ্যে এখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫ হাজার ৫০০-তে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টির।
২০২৩ সালে ভারত সরকার শীর্ষস্থানীয় বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দেশে শাখা খোলার অনুমতি দিয়ে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করে। লক্ষ্য হলো ২০৩৫ সালের মধ্যে ভারতে উচ্চশিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় আনুমানিক ৭ কোটি আসনের চাহিদা মেটানো। ভারতে ক্যাম্পাস খোলার পরিকল্পনা করা ১৯টি বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৯টিই যুক্তরাজ্যের।
যুক্তরাজ্যের আর্থিক সংকট ও ভারতের বাজার
বর্তমানে যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজ দেশে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে ব্যাপক চাপের মুখে রয়েছে। অভিবাসন কমাতে ব্রিটিশ সরকার বিদেশি শিক্ষার্থীদের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করছে। গত নভেম্বরে সরকার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ওপর বার্ষিক ৯২৫ পাউন্ড ফি নির্ধারণ করেছে এবং পড়াশোনা শেষে দেশটিতে অবস্থানের ভিসার নিয়ম আরও কঠোর করেছে।
শিক্ষা যুক্তরাজ্যের অন্যতম শীর্ষ রফতানি খাত, যার বার্ষিক মূল্য প্রায় ৩ হাজার ২০০ কোটি পাউন্ড। কিন্তু নিজ দেশে ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আর্থিক সংকটে রয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে ইংল্যান্ডের প্রায় ৪৫ শতাংশ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঘাটতির মুখে পড়তে পারে। এই সংকট কাটাতে ও আয়ের উৎস বহুমুখী করতে তারা এখন ভারতের বিশাল বাজারের দিকে ঝুঁকছে।
নতুন মডেল ও শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া
সাউদাম্পটন ইউনিভার্সিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু আথারটন ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, "মডেলের নতুন অংশটি হলো, এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই শিক্ষার্থীদের কাছে যাচ্ছে। এটি দ্বিমুখী প্রবাহ। কিছু শিক্ষার্থী মূল ক্যাম্পাসে যাবে, আবার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও ক্রমবর্ধমান হারে শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছাবে।"
দিল্লিতে বড় হওয়া সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাধিকা মেহরোত্রা বলেন, "ভারতে থেকেই যদি যুক্তরাজ্যের মতো সুপ্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি পাওয়া যায়, তবে শিক্ষার্থীরা কেন যাবে না? এর নিজস্ব কিছু সুবিধা রয়েছে।"
ভারতে ক্যাম্পাসের সুবিধা ও পরিকল্পনা
ভারতে এই ক্যাম্পাসগুলোর পাঠদানের মান যুক্তরাজ্যের মূল ক্যাম্পাসের সমান রাখার বাধ্যবাধকতা থাকলেও ফি রাখা হচ্ছে অনেক কম। যুক্তরাজ্যে যে কোর্সের ফি ২৫ হাজার পাউন্ডের বেশি, ভারতে সেই একই কোর্স ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার পাউন্ডের মধ্যে করার সুযোগ পাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।
গত অক্টোবরে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার একটি বাণিজ্যিক প্রতিনিধিদল নিয়ে মুম্বাই সফর করেন। সেই সফরে ১৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিরা তার সঙ্গে ছিলেন। স্টারমার সাংবাদিকদের বলেছিলেন, "এটি ভারতের মানুষের জন্য শিক্ষার সুযোগ তৈরির এক চমৎকার মাধ্যম। এখানে ভিসার কোনও জটিলতা নেই।"
ইউনিভার্সিটি অব ইয়র্ক এই বছরের শেষ নাগাদ ভারতে ক্যাম্পাস খোলার পরিকল্পনা করছে। এছাড়া ইউনিভার্সিটি অব সারে গুজরাটের গিফট সিটিতে শাখা খোলার কথা ভাবছে। এই উদ্যোগগুলি উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে একটি নতুন যুগের সূচনা করছে, যা শিক্ষার্থীদের জন্য আরও সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী সুযোগ তৈরি করবে।
