শিক্ষার্থীরাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর: ডিজিটাল দায়িত্ববোধ জরুরি
শিক্ষার্থীরাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর

শিক্ষার্থীরা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ—এ কথা শুধু অলঙ্কার নয়, একেবারে বাস্তব সত্য। একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচয় গড়ে ওঠে তার শিক্ষার্থীদের চিন্তা, আচরণ, সৃজনশীলতা ও মূল্যবোধের মধ্য দিয়ে। তাই শিক্ষার্থীরা অজান্তেই হয়ে ওঠে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর’। কিন্তু ডিজিটাল এই যুগে সেই ভূমিকা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। ক্যাম্পাসের ভেতরের একটি ঘটনা, একটি মন্তব্য, একটি ভিডিও, মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ছে হাজারো মানুষের কাছে। ফলে এখন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম গড়ে ওঠা বা ভেঙে পড়া, দুটোই অনেকাংশে নির্ভর করছে শিক্ষার্থীদের অনলাইন আচরণের ওপর।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ও ডিজিটাল ঝুঁকি

বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম তৈরি হয় দীর্ঘ সময় ধরে গবেষণা, একাডেমিক উৎকর্ষ, নৈতিকতা এবং শিক্ষার্থীদের অর্জনের ভিত্তিতে। কিন্তু একটি অসচেতন ফেসবুক পোস্ট, একটি আক্রমণাত্মক টুইট, একটি অপমানজনক ভিডিও বা লাইভ স্ট্রিম, এই দীর্ঘদিনের অর্জনকে মুহূর্তেই প্রশ্নবিদ্ধ করে দিতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছি, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মারামারি, র‍্যাগিং বা অশোভন আচরণের ভিডিও ভাইরাল হয়ে পড়েছে। এসব কনটেন্ট শুধু বিনোদনের উপাদান হয়ে থাকেনি; বরং তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনমনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ডিজিটাল পরিসংখ্যানের বাস্তবতা

ডিজিটাল পরিসংখ্যানও এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে। সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৭০-৭৫ শতাংশ নিয়োগদাতা চাকরিপ্রার্থীদের সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল যাচাই করেন। আবার প্রায় ৬০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান মনে করে, প্রার্থীর অনলাইন আচরণ তার পেশাগত মানসিকতার প্রতিফলন। অর্থাৎ, একজন শিক্ষার্থীর একটি অসংযত পোস্ট বা বিতর্কিত মন্তব্য তার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির পাশাপাশি তার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেজকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে ভবিষ্যতে চাকরির বাজারে তাকে বাড়তি প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হয়। শুধু চাকরি নয়, উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন আবেদনকারীর ডিজিটাল উপস্থিতিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে আবেদনকারীর অনলাইন আচরণ, মতামত ও সামাজিক সম্পৃক্ততা যাচাই করা হয়। ফলে কোনো নেতিবাচক বা অনৈতিক কনটেন্ট একজন শিক্ষার্থীর বিদেশে পড়াশোনার স্বপ্নকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শিক্ষার্থীদের অসচেতনতার কারণ

প্রশ্ন হলো—কেন শিক্ষার্থীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় এতটা অসচেতন? এর পেছনে কাজ করে ‘ভাইরাল’ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, মুহূর্তের আবেগে প্রতিক্রিয়া জানানোর প্রবণতা এবং ডিজিটাল দায়িত্ববোধের ঘাটতি। অনেকেই উপলব্ধি করতে পারে না যে, একটি পোস্ট কেবল বন্ধুমহলে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা মুহূর্তেই বৈশ্বিক পরিসরে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ব্যক্তিগত রাগ, ক্ষোভ বা নিছক মজা করতে গিয়ে তারা অজান্তেই নিজেদের প্রতিষ্ঠানকে বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

আবেগপ্রবণতার প্রভাব

শিক্ষার্থীদের মানসিকতার বিষয়টিও এখানে গভীরভাবে বিবেচ্য। বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৬৫-৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী আবেগপ্রবণ হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় মন্তব্য করে, কিন্তু তার সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে আগে ভাবে না। একই সঙ্গে প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী মনে করে, অনলাইনের মন্তব্য বাস্তব জীবনে তেমন প্রভাব ফেলে না, যা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। বাস্তবে একটি কটূক্তি বা তুচ্ছতাচ্ছিল্যপূর্ণ মন্তব্যও অন্য একজন সহপাঠীর মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে মানসিক ট্রমা, আত্মসম্মানবোধের অবক্ষয়, এমনকি চরম পর্যায়ে আত্মঘাতী চিন্তার উদ্ভবও ঘটতে পারে। এমন ঘটনাও অস্বাভাবিক নয়, যেখানে অনলাইন অপমান বা হয়রানির কারণে কোনো শিক্ষার্থী ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। তাই সহমর্মিতা, সংযম ও দায়িত্বশীলতার অভাব কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতিই ডেকে আনে না; এটি পুরো বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে।

নেতিবাচক মানসিকতা থেকে সরে আসা

এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নেতিবাচক মানসিকতা থেকে সরে আসা। একটি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি সম্মিলিত পরিবার। সেখানে মতপার্থক্য, সমস্যা বা অসন্তোষ থাকতেই পারে, কিন্তু তার সমাধান হওয়া উচিত পারস্পরিক সংলাপ ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে। কোনো অভিযোগ বা ক্ষোভ থাকলে তা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ না করে সংশ্লিষ্ট বিভাগ, শিক্ষক বা প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করাই দায়িত্বশীলতার পরিচয়। কারণ, আবেগের বশে দেওয়া একটি পোস্ট হয়তো সাময়িক স্বস্তি দেয়, কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হতে পারে ভয়াবহ- ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উভয় ক্ষেত্রেই।

সোশ্যাল মিডিয়ার ইতিবাচক ব্যবহার

তবে সোশ্যাল মিডিয়ার ইতিবাচক ব্যবহারও কম নয়। একই প্ল্যাটফর্মে দেশের অনেক শিক্ষার্থী তাদের গবেষণা, উদ্ভাবন, সামাজিক উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক সাফল্য তুলে ধরছে- যা বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছে। একটি ভালো উদ্যোগ, একটি অনুপ্রেরণামূলক গল্প বা একটি সৃজনশীল কাজ, সেটিও ভাইরাল হতে পারে, এবং সেটিই হতে পারে প্রতিষ্ঠানের গর্ব।

কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব

এই প্রেক্ষাপটে কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রথমত, শিক্ষার্থীদের জন্য ‘ডিজিটাল লিটারেসি’ ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের নৈতিকতা বিষয়ে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ চালু করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, অনলাইন ও অফলাইন—দুই ক্ষেত্রেই আচরণবিধি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। তৃতীয়ত, ইতিবাচক কনটেন্ট তৈরিতে শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করা এবং ভালো উদ্যোগগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রচার করা প্রয়োজন। চতুর্থত, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা জোরদার করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা আবেগপ্রবণ হয়ে কোনো ক্ষতিকর পোস্ট বা আচরণ না করে। পঞ্চমত, একটি দায়িত্বশীল ডিজিটাল সংস্কৃতি গড়ে তুলতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রশাসনের সমন্বিত ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে।

উপসংহার

সবশেষে বলা যায়, আজকের পৃথিবীতে একটি ক্লিকই যথেষ্ট—সুনাম গড়তে ও আবার তা ধ্বংস করতে। সোশ্যাল মিডিয়া এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি পরিচয় নির্মাণের শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম। তাই শিক্ষার্থীদের বুঝতে হবে, তারা শুধু নিজেদের প্রতিনিধিত্ব করছে না, তারা একটি প্রতিষ্ঠানের মুখপাত্র। তাদের প্রতিটি পোস্ট, প্রতিটি মন্তব্য, প্রতিটি শেয়ার, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গল্প বলে। এখনই সময় সচেতন হওয়ার। ইতিবাচক মনোভাব, দায়িত্বশীল আচরণ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধই পারে একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিতে। কারণ, ডিজিটাল দুনিয়ায় রেখে যাওয়া প্রতিটি চিহ্নই ভবিষ্যতের দরজা খুলতে পারে অথবা চিরতরে বন্ধ করে দিতে পারে।

লেখক: প্রশিক্ষক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, জনসংযোগ ও ব্র্যান্ড বিশেষজ্ঞ