ভাষার স্বপ্ন নিয়ে ইংরেজি উচ্চশিক্ষায় লাইলুন্নাহারের পিএইচডি যাত্রা
ভাষার স্বপ্ন নিয়ে ইংরেজি উচ্চশিক্ষায় লাইলুন্নাহারের পিএইচডি

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস বোস্টনের অ্যাপ্লায়েড লিঙ্গুইস্টিকস প্রোগ্রামে পিএইচডি করছেন লাইলুন্নাহার। ক্যাম্পাস সেন্টারের দোতলায় বসে কাজ করছেন তিনি। সামনে ফাইনাল পরীক্ষা। তাই দিনরাত এক করে ল্যাপটপের সামনে বসে থাকতে হচ্ছে। তাঁর এবারের কোর্স পেপারটি খুব কাছের একটি বিষয় নিয়ে। কেননা, তিনি বিষয় হিসেবে নিয়েছেন ‘বাংলাদেশে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার নীতিমালা’। একটু বড় পরিসরে, আবার খুব কাছ থেকে—দুভাবেই দেখার চেষ্টা করছেন তিনি।

লেখাপড়ার পথচলা

কাজ করতে করতে মাঝেমধ্যেই তাঁর চোখ চলে যায় জানালার দিকে। সামনে বিশাল আটলান্টিক মহাসাগর। দূরদূরান্তের জাহাজ কিংবা আকাশে উড়ে যাওয়া বিমানের দিকে তাকালে তাঁর মনে পড়ে যায়, একদিন তিনি নিজেও ৮ হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে এখানে এসেছিলেন। এখন পিএইচডি করছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস বোস্টনের অ্যাপ্লায়েড লিঙ্গুইস্টিকস প্রোগ্রামে।

লাইলুন্নাহারের জন্ম মানিকগঞ্জ শহরে। তিনি বড় হয়েছেন একটি সাধারণ পরিবেশে, পড়াশোনা করেছেন সরকারি স্কুলে। ছোটবেলায় যখন প্রথম ইংরেজি শেখা শুরু করেন, তখন তাঁর মনে নানা প্রশ্ন জাগত। কেন হলো? কীভাবে হলো? অর্থটা কী? তবে সব প্রশ্ন ক্লাসে করা যেত না। আবার কিছু প্রশ্ন কীভাবে যে করবেন, বুঝে উঠতে পারতেন না। অনেক সময় কিছু বিষয় বুঝলেও মনে হতো কোথাও একটা ঘাটতি রয়ে গেল। সেই সময় ঘাটতিটা ধরতে না পারলেও বড় হতে হতে তিনি উপলব্ধি করেছেন, একটি দ্বিতীয় বা বিদেশি ভাষা শেখার প্রক্রিয়া যতটা মনে হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

চ্যালেঞ্জ ও সাফল্য

হাজার মাইল পেরিয়ে এখানে আসার যাত্রা কোনোভাবেই সহজ ছিল না। নানা সময়ে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন তিনি, বহু বাধা এসেছে, কখনো কখনো ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু থেমে থাকেননি। প্রতিটি সুযোগ থেকে নতুন করে শেখার চেষ্টা করেছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

লিঙ্গুইস্টিকসে তাঁর হাতেখড়ি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ থেকে। পড়াশোনার পাশাপাশি ছাত্রজীবন থেকেই বিভিন্ন কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। সব অভিজ্ঞতাই তাঁকে শিখিয়েছে। দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় দুই বছর শিক্ষকতা করেছেন তিনি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে পেপার প্রেজেন্ট করেছেন। অংশ নিয়েছেন বহু প্রশিক্ষণ ও কর্মশালায়।

বৃত্তি ও উচ্চশিক্ষা

অনেক পরিশ্রমের পর ২০২২ সালে পূর্ণবৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বল স্টেট ইউনিভার্সিটিতে টিইএসওএল (টিচিং ইংলিশ টু স্পিকার্স অব আদার ল্যাঙ্গুয়েজেস) ও লিঙ্গুইস্টিকসে মাস্টার্স করতে আসেন তিনি। পরে ২০২৫ সালে আবারও পূর্ণ অর্থায়নসহ বোস্টনে এসে পিএইচডি শুরু করেন। তাঁর সৌভাগ্য, এমন একজন মানুষকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়েছেন, যিনি নিজেও একজন পিএইচডি গবেষক। ঘরে হোক বা বাইরে, সব সময় সবচেয়ে ভালো বন্ধু হয়ে পাশে থাকেন তিনি। তবে শৈশব থেকে এই পর্যন্ত সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর মা-বাবা।

ইংরেজি শিক্ষার বাস্তবতা

ইংরেজি ভাষা বাংলাদেশে ক্লাস ওয়ান থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়ানো হয়। তবু প্রায়ই ছেলেমেয়েদের মধ্যে এই ভাষা ব্যবহার করায় একধরনের সংকোচ, একধরনের ভীতি কাজ করে। এর একটি বড় কারণ হলো আমাদের দেশে এখনো বেশির ভাগ সময় ভাষা শেখাকে শুধু ব্যাকরণ শেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়। শিক্ষাদানের পদ্ধতিটাও ‘শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক’ নয়। নানা বৈষম্য আছে। দেশের সব জায়গায় সমানভাবে পেশাদার ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম, প্রশিক্ষণ, বা রিসোর্সের সুযোগ নেই।

পরিবর্তনের সম্ভাবনা

জটিলতা, বৈষম্য, সীমাবদ্ধতা আছে ঠিক; তবু লাইলুন্নাহার বিশ্বাস করেন, একজন শিক্ষকই পারেন এ ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে। এ কারণেই শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে তাঁর আগ্রহ ‘স্ক্যাফোল্ডেড টিচিং’ বা ধাপে ধাপে সহায়তা দিয়ে শেখানোর প্রতি। তিনি প্রতিনিয়ত সিলেবাস, পড়ার উপকরণ, শেখার পদ্ধতি এমনভাবে সাজান, যেন প্রত্যেক শিক্ষার্থী শেখার ও অংশগ্রহণের সমান সুযোগ পায়। শিক্ষার্থীর আর্থসামাজিক ও মানসিক অবস্থানও তাঁর কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

ভবিষ্যৎ স্বপ্ন

লাইলুন্নাহার স্বপ্ন দেখেন, একদিন এ দেশের শিক্ষার্থীরা ‘ইনক্লুসিভ ক্লাসরুম’ পাবে, যেখানে বহুভাষিকতাকে সম্পদ হিসেবে দেখা হবে। প্রত্যেক শিক্ষার্থী তাঁর মাতৃভাষা, সংস্কৃতি, পরিচয় ও জীবন অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে ইংরেজি শেখার সুযোগ পাবে।