প্রথম আলো ট্রাস্টের ‘আলোর পাঠশালা’ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন
আলোর পাঠশালার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন

প্রথম আলো ট্রাস্ট পরিচালিত ‘আলোর পাঠশালা’ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করায় অংশীজন, শুভাকাঙ্ক্ষী ও পৃষ্ঠপোষকদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানানোর অনুষ্ঠান বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন

সংবাদমাধ্যমের বৈশ্বিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল নিউজ মিডিয়া অ্যাসোসিয়েশন (ইনমা) আয়োজিত ‘গ্লোবাল মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬’-এ ‘বেস্ট পাবলিক রিলেশনস অর কমিউনিটি সার্ভিস ক্যাম্পেইন (ন্যাশনাল ব্র্যান্ড)’ শ্রেণিতে আলোর পাঠশালার জন্য সম্মানজনক স্বীকৃতি অর্জন করে প্রথম আলো। ৭ মে জার্মানির বার্লিন শহরে এই আয়োজনে প্রথম আলো একটি তৃতীয় পুরস্কার এবং আরও একটি সম্মানজনক স্বীকৃতি পায়।

অনুষ্ঠানের বিবরণ

আয়োজনের শুরুতেই প্রথম আলো ট্রাস্টের চেয়ারপারসন ও বার্জার বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রূপালী চৌধুরী সবাইকে স্বাগত জানান। ইনমায় প্রথম আলো ট্রাস্ট পরিচালিত আলোর পাঠশালার সম্মানজনক স্বীকৃতি অর্জনের বিষয়টি তুলে ধরেন প্রথম আলোর মহাব্যবস্থাপক আজওয়াজ খান। তিনি জানান, গ্লোবাল মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬-এ ৪৬টি দেশের ২৭৪টি সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠান থেকে ৯৬০টি উদ্যোগ জমা পড়ে। সেখানে বেস্ট পাবলিক রিলেশনস অর কমিউনিটি সার্ভিস ক্যাম্পেইন (ন্যাশনাল ব্র্যান্ড) শ্রেণিতে আলোর পাঠশালার পাশাপাশি সম্মানজনক স্বীকৃতি পেয়েছে নিউজিল্যান্ডের স্টাফ গ্রুপ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এরপর পাওয়ার পয়েন্টে আলোর পাঠশালা ও প্রথম আলো ট্রাস্টের কার্যক্রমের বিস্তারিত তুলে ধরেন ট্রাস্টের সমন্বয়ক মাহবুবা সুলতানা। আলোর পাঠশালা কার্যক্রম চালু হয়েছিল ২০০৯ সালে। দেশের যেসব দুর্গম এলাকায় কোনো স্কুল নেই, এমন স্থানে স্কুল প্রতিষ্ঠা করে সেখানে ‘আলোর পাঠশালা’ নামে শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে সামিট গ্রুপ ও আঞ্জুমান-আজিজ ট্রাস্ট। এই আলোর পাঠশালা রয়েছে কুড়িগ্রামে একটি, রাজশাহীতে দুটি, ভোলায় একটি, নওগাঁয় একটি, টেকনাফে একটি, বান্দরবানে একটি ও লক্ষ্মীপুরে একটি। এই আটটি স্কুলে মোট ১ হাজার ৬৫০ শিক্ষার্থী বিনা মূল্যে পড়াশোনা করছে। গত ১৬ বছরে এসব স্কুল থেকে প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থী শিক্ষা গ্রহণ করেছে। এ ছাড়া দেড় হাজার জনকে কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

প্রথম আলো ট্রাস্টের কার্যক্রম

প্রথম আলো ট্রাস্ট সরকারি বিধিমোতাবেক নিবন্ধিত হয়ে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করে ২০০৯ সালে। তবে কাজের সূচনা হয়েছিল ২০০৫ সালে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার লাভের পর। তাঁর পুরস্কারের ৩৩ লাখ টাকা সমান তিনটি ভাগে অ্যাসিডদগ্ধ নারী, মাদকবিরোধী আন্দোলন ও নির্যাতিত সাংবাদিক সহায়তা তহবিলে প্রদান করে প্রথম আলোর সামাজিক কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথম আলোর কর্মীরাও তাঁদের বেতন থেকে অনুদান দিয়ে যুক্ত হন এই সামাজিক কার্যক্রমে। বর্তমানে ১০ জন ট্রাস্টির পরিচালনায় এই ট্রাস্টের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

অদম্য মেধাবী শিক্ষাবৃত্তি

ট্রাস্টের কার্যক্রমের মধ্যে ২০০৭ সাল থেকে চলছে দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের ‘অদম্য মেধাবী’ শিক্ষাবৃত্তি প্রদান। এতে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১ হাজার ৪৮৬ জন বৃত্তি পেয়েছেন। এর মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংকের সহায়তা পেয়েছে ১ হাজার ১৫৩ জন। ব্র্যাক ব্যাংক প্রতিবছর ৫০ জনকে বৃত্তি দিয়ে থাকে। ‘অপরাজেয়ে তারা’ নামে ব্র্যাক ব্যাংক ২০২২ সাল থেকে ৫০ জন নারী শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দিচ্ছে। এ ছাড়া অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির সহায়তায় অদম্য মেধাবী বৃত্তি পেয়েছেন ৩৩৪ জন। বর্তমানে ২৬৯ শিক্ষার্থীর বৃত্তি চলমান। তারা উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন। অদম্য মেধাবী বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেকেই জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তাঁদের কেউ চিকিৎসক, কেউ বিসিএস কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিদেশে উচ্চতর গবেষণাসহ বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত রয়েছেন।

অদ্বিতীয়া শিক্ষাবৃত্তি

‘অদ্বিতীয়া শিক্ষাবৃত্তি’ নামে আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারে প্রথম কন্যাসন্তানের উচ্চশিক্ষার জন্য এই বৃত্তি দেওয়া হচ্ছে ২০১২ সাল থেকে। প্রতিবছর ১০ জন করে এই বৃত্তি পেয়ে শিক্ষার্থীরা এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব উইমেনে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন। তাঁদের মধ্যে সিনথিয়া খন্দকার প্যারিসের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। প্রিয়তা তালুকদার বৃত্তি নিয়ে জার্মানিতে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর করছেন। কেউ কেউ পিএইচডি করছেন।

মাদকবিরোধী ও অন্যান্য কার্যক্রম

প্রথম আলো ট্রাস্টের মাদকবিরোধী কার্যক্রম শুরু হয়েছিল ২০০৩ সাল থেকে। এতে রয়েছে মাদকবিরোধী অনলাইন পরামর্শসহায়তা, মাদকবিরোধী কনসার্ট, প্রতি মাসে পরামর্শসহায়তা, প্রতি মাসে টেলিফোনে পরামর্শ, স্কুলভিত্তিক মাদকবিরোধী আয়োজন ইত্যাদি। ট্রাস্ট অ্যাসিডদগ্ধ নারীদের জন্য সহায়তা দিচ্ছে ২০০০ সাল থেকে। এ পর্যন্ত ৪৮৫ জনকে বিভিন্ন সহায়তা দেওয়া হয়েছে। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর ২০১৩ সালে গঠন করা হয়েছিল ‘মেরিল-প্রথম আলো সহায়তা তহবিল’। এই তহবিল থেকে উদ্ধার, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও শিক্ষাসহায়তা দেওয়া হয়। বর্তমানে ২০টি পরিবারের শিশুরা শিক্ষাসহায়তা পাচ্ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রাণসহায়তা দেওয়ার কার্যক্রম চলমান।

অংশীজনদের বক্তব্য

আলোচনায় অংশ নিয়ে সামিট পাওয়ার লিমিটেড ও অয়েল অ্যান্ড শিপিং কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) মনিরুল ইসলাম আকন্দ বলেন, আলোর পাঠশালা কার্যক্রম প্রকৃতই দেশের দুর্গম প্রান্তিক এলাকায় শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে। এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি খুবই আনন্দের। সামিট গ্রুপের মালিক পক্ষ সব সময়ই জনকল্যাণকর কাজের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাদের সার্বিক সহায়তা অব্যাহত থাকবে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইডিএলসির চেয়ারম্যান কাজী মাহমুদ সাত্তার বলেন, আইডিএলসি সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জনকল্যাণ কাজে আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে। প্রথম আলো ট্রাস্টকে সহায়তা দিতে পেরে তারা আনন্দিত। এখন আইডিএলসির পক্ষ থেকে প্রতিবছর প্রথম আলো ট্রাস্টকে ১০ শিক্ষার্থীর জন্য বৃত্তি দেওয়া হচ্ছে। বৃত্তির সংখ্যা বাড়িয়ে ১৫ জনকে দেওয়া হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

আইডিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জামাল উদ্দিন বলেন, আইডিএলসি আরও বেশি জনকল্যাণমূলক কাজ করতে উদ্যোগ নিয়েছে। এ জন্য তাদের সিএসআর তহবিলের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রথম আলো ট্রাস্ট ছাড়াও প্রথম আলোর অন্যান্য কাজেও সহায়তা দেবে।

ব্র্যাক ব্যাংকের হেড অব ইন্টারনাল কমিউনিকেশন অ্যান্ড সিএসআর শফিকুর রহমান ভুইয়া বলেন, ব্র্যাক ব্যাংক নারী শিক্ষার প্রসারে সহায়তা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। প্রথম আলো ট্রাস্টের নারী শিক্ষার্থীদের জন্য ‘অপরাজেয় তারা’ নামে যে ৫০টি বৃত্তি দেওয়া হয়, তা বাড়িয়ে ১০০টি করার ইচ্ছা রয়েছে।

প্রথম আলো ট্রাস্টের চেয়ারম্যান রূপালী চৌধুরী বলেন, আলোর পাঠশালার জন্য এই আন্তর্জাতিক সম্মান অর্জন অনেক অনুপ্রেরণাদায়ক। ছোট আকারে ট্রাস্টের কাজ শুরু হলেও ক্রমেই এর পরিধি বেড়েছে। ট্রাস্টের কার্যক্রম আরও বাড়ানোর আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। তিনি বলেন, এখনো দেশের অনেক এলাকায় শিক্ষার আলো পৌঁছেনি, এটা খুবই দুঃখজনক। প্রতিটি জেলায় এমন দুর্গম এলাকায় আলোর পাঠশালা করার ইচ্ছা তাদের রয়েছে। তিনি ভালো কাজের জন্য সহায়তা দিতে এগিয়ে আসার জন্য সামর্থ্যবানদের প্রতি আহ্বান জানান।

প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ও ট্রাস্টের সদস্য আনিসুল হক বলেন, সমাজ ও মানুষের ওপর বিনিয়োগ হলো সব থেকে বড় বিনিয়োগ। দুর্গম এলাকায় প্রথম আলো ট্রাস্ট শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে দেওয়ার যে কাজ করছে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেই আলোকিত করবে।

প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান সবাইকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, প্রথম আলো সাংবাদিকতার পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে মানুষ ও সমাজের কল্যাণে সরাসরি বিভিন্ন ধরনের কাজ করে থাকে। এসব কাজে অনেক সহৃদয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান অর্থসহ অনেক রকম সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। এই ধরনের কাজ অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সামিট মেঘনাঘাট ১ ও ২ এর এমডি ও সিইও মো. রিয়াজ উদ্দিন, সামিট বিবিয়ানা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের এমডি ও সিইও এস এম নূর উদ্দিন, সামিট করপোরেশন লিমিটেডের হেড অব পাবলিক রিলেশন অ্যান্ড মিডিয়া মোহসেনা হাসান, পাবলিক রিলেশন অ্যান্ড মিডিয়ার সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার ফয়সাল আল আমিন ও অমিত হাসান মন্ডল, ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসির সিএসআর প্রোগ্রামস কমিউনিকেশন কর্মকর্তা হান্না আনব্রীন প্রমুখ।