কুবির ৭৬% শিক্ষার্থীর আবাসন নেই, সংকট চরমে
কুবির ৭৬% শিক্ষার্থীর আবাসন নেই, সংকট চরমে

কুবির ৭৬ শতাংশ শিক্ষার্থীর আবাসন সুবিধা নেই

লালমাই পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে ওঠা দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) প্রকট আকার ধারণ করেছে আবাসন সংকট। প্রতিষ্ঠার দুই দশক পেরিয়ে গেলেও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ার তুলনায় বাড়েনি আবাসিক সুবিধা। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৭৬ শতাংশ শিক্ষার্থী হল সুবিধার বাইরে থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

পরিসংখ্যানে আবাসন সংকট

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯টি বিভাগে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৬ হাজার ৪৮৪ জন। বিপরীতে আবাসন সুবিধা রয়েছে মাত্র ১ হাজার ২৩৯টি সিটের, যা মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ১৯ দশমিক ১১ শতাংশ। তবে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী অবস্থানের কারণে বর্তমানে বিভিন্ন হলে থাকছেন প্রায় ১ হাজার ৫৫৪ জন শিক্ষার্থী, যা মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ২৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ।

হলভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, কাজী নজরুল ইসলাম হলে ১৮০টি সিটের বিপরীতে ২১০ জন, বিজয় ২৪ হলে ৪৬০টি সিটের বিপরীতে ৫২০ জন, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হলে ১৪৬টি সিটের বিপরীতে ১৭০ জন, নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী হলে ১৯৭টি সিটের বিপরীতে ২৯৬ জন এবং সুনীতি-শান্তি হলে ২৫৬টি সিটের বিপরীতে ৩৬৬ জন শিক্ষার্থী অবস্থান করছেন। অতিরিক্ত শিক্ষার্থী থাকায় প্রায় সব হলেই ডাবলিংসহ নানা সংকটে থাকতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গণরুম ব্যবস্থা বিলুপ্ত করলেও হলগুলোতে সিট সংকট এখনো কাটেনি। পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধার অভাবে অনেক শিক্ষার্থীকে একটি সিটে দুজন করে ‘ডাবলিং’ অবস্থায় থাকতে হচ্ছে। ফলে হলে অবস্থানরত শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা, থাকা-খাওয়া ও স্বাভাবিক জীবনযাপনে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি ও উদ্বেগ

তথ্য অনুযায়ী, মোট ৬ হাজার ৪৮৪ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে আবাসিক হলে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন মাত্র ১ হাজার ৫৫৪ জন। ফলে প্রায় ৪ হাজার ৯৩০ জন শিক্ষার্থী কোনো ধরনের আবাসন সুবিধার আওতায় নেই। অর্থাৎ প্রতি চারজন শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় তিনজনকেই শহর কিংবা আশপাশের এলাকায় মেস বা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে হচ্ছে।

আবাসন সংকটের কারণে শিক্ষার্থীদের বাড়তি ভোগান্তির পাশাপাশি বাড়ছে আর্থিক চাপও। বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, যাতায়াত ও পড়াশোনার পরিবেশ নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ।

তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মাহমুদ সাকিব বলেন, শহরে থেকে ক্যাম্পাসে যাওয়া-আসা অনেক কষ্টের। পরিবহণ সংকটের কারণে প্রায়ই দুর্ভোগে পড়তে হয়।

বিজয় ২৪ হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মো. রাকিব হাসান বলেন, হলে থাকলেও স্বস্তিতে থাকার সুযোগ খুব কম। একটি রুমে নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে বেশি শিক্ষার্থী থাকায় পড়াশোনার পরিবেশ ব্যাহত হয়। ব্যক্তিগত জায়গাও পাওয়া যায় না। তারপরও ক্যাম্পাসের ভেতরে থাকতে পারছি বলেই কিছুটা সুবিধা হয়।

প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী সাইয়্যেদা নাফিজা নাফিল বলেন, মেয়েদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হলে থাকলে সেটি তুলনামূলকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব। কিন্তু মেয়েদের হলের সংখ্যা কম হওয়ায় অনেক ছাত্রীকে বাইরে থাকতে হচ্ছে। এছাড়া হলে মিল সিস্টেম থাকায় খাবারের দিক থেকেও কিছু সুবিধা পাওয়া যায়।

বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী সাদিয়া ইসলাম বলেন, আসনের তুলনায় শিক্ষার্থী বেশি থাকায় অনেক সময় ডাবলিং করে থাকতে হয়। এতে ব্যক্তিগত সমস্যার সৃষ্টি হলেও ক্যাম্পাসের ভেতরে থাকায় ক্লাস ও বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নিতে সুবিধা হয়। তবে শিক্ষার্থীদের জন্য আরও আবাসন সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন।

অর্থনীতি বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সালমা আক্তার বলেন, পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধা না থাকায় অনেক ছাত্রীকে বাইরে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে হচ্ছে। এতে খরচ যেমন বাড়ছে, তেমনি নিরাপত্তা ও পড়াশোনার পরিবেশ নিয়েও দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়।

নতুন ক্যাম্পাসে সমাধানের আশা

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন ২০০ একরের নতুন ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের জন্য ১০ তলাবিশিষ্ট চারটি আবাসিক হল নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। নতুন হলগুলোর কাজ সম্পন্ন হলে আরও ৪ হাজার ২০৬টি আসন বৃদ্ধি পাবে বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করতে আরও ২৪১ কোটি টাকা প্রয়োজন বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, ইউজিসির অর্থ ছাড়ে জটিলতার কারণে নতুন ক্যাম্পাসের কাজ ধীরগতিতে এগোচ্ছে।

কাজী নজরুল ইসলাম হলের প্রভোস্ট ও ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. হারুন বলেন, বর্তমান আবাসন সংকট নতুন ক্যাম্পাস চালু হলে অনেকটাই কমে যাবে। সেখানে পর্যাপ্ত সিটের ব্যবস্থা থাকবে। আপাতত কিছুটা সংকট লাঘবের জন্য অতিরিক্ত শিক্ষার্থীকে হলে রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে বড় পরিসরে আবাসিক হল নির্মাণের বিকল্প নেই।

নারী শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট প্রসঙ্গে নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী হলের প্রভোস্ট ড. সুমাইয়া আফরিন সানি বলেন, আমাদের হলে ১৮০টি সিট থাকলেও বর্তমানে প্রায় ২৯৬ জন শিক্ষার্থী অবস্থান করছেন। ফলে অনেক সিটে ডাবলিং করে থাকতে হচ্ছে। একজন শিক্ষক হিসেবে আমি চাই, শিক্ষার্থীদের জন্য শতভাগ আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক।

এ বিষয়ে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাসুদা কামাল বলেন, আমাদের নতুন ক্যাম্পাসের কাজ প্রায় শেষের দিকে। আমাদের যে আবাসন সংকট, নতুন ক্যাম্পাসের কাজ শেষ হলেই সেগুলো পূরণ হয়ে আসবে।