ডায়াসপোরা শব্দটি গ্রিক ভাষা থেকে এসেছে। 'ডায়া' অর্থ দূরে এবং 'স্পেইরেইন' অর্থ ছড়িয়ে পড়া। ব্যুৎপত্তিগতভাবে ফসলের বীজ ছড়িয়ে পড়া বোঝালেও, খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০ শতাব্দীর দিকে শব্দটির ভিন্ন ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। ইসরাইল থেকে নির্বাসিত ইহুদিদের প্রথম ডায়াসপোরা জনগোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সেই সময় আলেক্সান্দ্রিয়ার পণ্ডিতরা হিব্রু বাইবেল বা 'তোরাহ'র প্রথম পাঁচটি বই গ্রিক ভাষায় অনুবাদ করেন। এই অনুবাদে গৃহহীন ইহুদিদের জন্য 'ডায়াসপেইরেইন' ক্রিয়াপদ এবং 'ডায়াসপোরা' বিশেষ্যপদ ব্যবহার করা হয়। এই শব্দের মাধ্যমে ইহুদিদের জন্মভূমি থেকে ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি তাদের আধ্যাত্মিক ও মানসিক কষ্টও প্রকাশ পায়।
ঊনবিংশ শতকে, বিশেষ করে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, বিভিন্ন দেশ থেকে নানা কারণে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া জনগোষ্ঠী বোঝাতে ডায়াসপোরা শব্দটি ব্যবহার শুরু হয়। বর্তমানে সম্প্রসারিত অর্থে, শুধু বহিষ্কৃত নয়, জীবিকার জন্য স্বেচ্ছায় দেশান্তরী হয়ে বসতি স্থাপনকারীদেরও ডায়াসপোরা জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ভারতীয় ইতিহাসের অধ্যাপক ভিনয় লাল বহিষ্কৃতদের 'ডায়াসপোরা অফ লেবার' এবং স্বেচ্ছায় দেশত্যাগীদের 'ডায়াসপোরা অফ লংগিং' বলে অভিহিত করেন।
দক্ষিণ এশীয় ডায়াসপোরার তিনটি পর্যায়
দক্ষিণ এশীয় ডায়াসপোরাকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে মোটামুটি তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়।
উপনিবেশ-পূর্ব ডায়াসপোরা
সমুদ্রপথে বাণিজ্যের জন্য ভারতীয় বণিকেরা বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। একইভাবে অন্য দেশের বণিকেরা ভারতে আসে। একে 'ম্যারিটাইন ডায়াসপোরা'ও বলা যায়।
ঔপনিবেশিক ডায়াসপোরা বা মধ্যযুগীয় ডায়াসপোরা
ভারতীয় ডায়াসপোরা সাহিত্য ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কাল থেকে পাওয়া যায়। এ সময় এ অঞ্চলের মানুষ স্বেচ্ছায় বা বাধ্য হয়ে ভারত থেকে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে ক্যারিবীয় দ্বীপাঞ্চলে যায়। এই সময় বিশ্ব-শ্রমবাজারে দুটি বড় ঘটনা ঘটে: ১৮৩০ সালে বৈধ দাসপ্রথা নিষিদ্ধ হয় এবং পশ্চিমে শিল্পবিপ্লব ও পুঁজির বিকাশ শুরু হয়। বাণিজ্যনির্ভর দেশগুলোতে শহর তৈরি হতে থাকে। বিশ্বের সম্প্রসারিত শ্রমবাজারে শ্রমিকের শূন্যস্থান পূরণের জন্য ভারত থেকে শ্রমিক আমদানি করা হয়। এই সময় থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত কয়েক মিলিয়ন দক্ষিণ এশীয় শ্রমিক বিশ্বে, বিশেষ করে আফ্রিকার দ্বীপাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এদের অনেকে আর স্বাধীন ভারতে ফিরে আসেনি। এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে খ্যাতিমান ভারতীয় ডায়াসপোরা লেখক হলেন ভিএস নাইপল, যাঁর পূর্বপুরুষ ট্রিনিদাদে চলে যান।
উপনিবেশ-উত্তর ডায়াসপোরা বা আধুনিক ডায়াসপোরা
১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার পর এই অঞ্চলের ডায়াসপোরা নতুন মাত্রা পায়। বৃহৎ পরিসরে ইউরোপীয়-এশীয় এবং আমেরিকীয়-এশীয় ডায়াসপোরা জনগোষ্ঠী সৃষ্টি হয়। শিক্ষিত ভারতীয় জনগোষ্ঠী বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এবং শ্রমবাজারের পাশাপাশি শিক্ষিত বা একাডেমিক ডায়াসপোরার সৃষ্টি হয়। এই সময় দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ঘটনা হলো ভারতের স্বাধীনতা ও ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্তি। এ পর্যায়ে খ্যাতিমান ডায়াসপোরা লেখক সালমান রুশদি, যিনি মাত্র তেরো বছর বয়সে ১৯৬১ সালে ইংল্যান্ডে চলে যান।
ডায়াসপোরা: ব্যক্তি ও গোষ্ঠী
ডায়াসপোরা একজন ব্যক্তি বা একটি গোষ্ঠীও হতে পারে। 'শেম' উপন্যাসে সালমান রুশদি বলেন, যখন এককভাবে কেউ নিজের দেশ ছেড়ে আসে, তাকে 'পাড়ি জমানো' বলা হয়। যখন পুরো একটি জাতি তা করে, তাকে 'বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া' বলে। পাড়ি জমানো লোক বা বিচ্ছিন্ন দেশের সবচেয়ে ভালো দিক হলো তাদের আশাবাদ। পুরোনো ফটোগ্রাফে এই লোকদের চোখের দিকে তাকালে ঝাপসা সেপিয়া রঙের মধ্যেও আশা চকচক করে। আর সবচেয়ে খারাপ দিক হলো তাদের শূন্য বাক্স-প্যাটরা, বিশেষ করে অদৃশ্য স্যুটকেসগুলো। আমরা শুধু জমি ছেড়ে আসিনি, উড়ে গেছি ইতিহাস, স্মৃতি ও সময় ছেড়ে।
ডায়াসপোরা লেখার সুবিধা ও অসুবিধা
স্বদেশ থেকে দূরে অবস্থান করে লেখার যেমন সুবিধা আছে, তেমনি অসুবিধাও। স্বদেশে ডায়াসপোরা লেখককে নির্ভরযোগ্য ভাষ্যকার হিসেবে ধরা হয় না এবং ইতিহাস-বিকৃতির অভিযোগ ওঠে। তবে সুবিধা হলো তাদের স্বজাতির কাছে জবাবদিহি করতে হয় না এবং জাতীয়তাবাদী চেতনার কাছে কোনো দায় থাকে না। ফলে তারা পিতৃমাতৃভূমির শাসকগোষ্ঠীর বিপক্ষে অকপটে লিখতে পারেন। রুশদি মনে করেন, দূর থেকেই স্বদেশ নিয়ে নির্মোহভাবে লেখা সম্ভব এবং প্রকৃত ইতিহাস আবেগ থেকে নয়, ঐতিহাসিক বিচ্ছিন্নতা থেকে আসে। ইশিগুরো বলেন, জাপান সম্পর্কে তার জানাশুনার ঘাটতি ও দায়িত্ববোধের অভাব তাকে গৃহহীন লেখক হিসেবে ভাবতে বাধ্য করেছে। তিনি বিশুদ্ধ ইংরেজ বা জাপানি নন, তাই কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা সমাজ নিয়ে লেখার দায়িত্ব তার নেই।
অনেক ক্ষেত্রে ডায়াসপোরা লেখক নিজের ঐতিহাসিক ভিত্তির উপর বর্তমানকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেন। 'মিডনাইটস চিলড্রেন' উপন্যাস লেখার প্রেক্ষাপটে রুশদি 'ইমাজিনারি হোমল্যান্ডস'-এ বলেন, বম্বে শহরটি বিদেশিদের তৈরি। দূরে থেকে একই অভিধা তাকেও দেওয়া যায় এবং তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে তারও একটি শহর ও ইতিহাস আছে, যা তিনি ফের অধিগ্রহণ করতে পারেন। দেশান্তরিত বা অভিবাসী লেখকদের প্রায়ই কিছু হারানোর বোধ হয় এবং কিছু ফিরে পাওয়ার ইচ্ছা থাকে, কিন্তু সেগুলো মূল্যহীন হওয়ার ঝুঁকি থাকে। পেছন ফিরে তাকালে আরো গভীর অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়, কারণ আমরা সশরীরে ভারতে নেই, তাই ঠিক যে জিনিস হারিয়েছি তা আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। আমরা তৈরি করি কাহিনি, সত্যিকারের শহর নয়, বরং কল্পনায় স্বদেশ, অনেকগুলো মনগড়া ভারত।
স্মৃতির অনির্ভরযোগ্যতা
ইশিগুরো বলেন, 'স্মৃতি খুব অনির্ভরযোগ্য।' নাইপলও তাঁর 'এ ওয়ে ইন দ্য ওয়ার্ল্ড' উপন্যাসে একই কথা বলেন: 'আমরা (ডায়াসপোরা জনগোষ্ঠী) বংশানুক্রমে যা ধারণ করি, সবকিছু বুঝে করি না, ফলে কখনো নিজেদের কাছে অপরিচিত মনে হয়।' রুশদি বারবার তাঁর কল্পিত ও নির্মিত বাস্তবতার মধ্যে ফিরে যান। মানুষের বিদ্যমান বাস্তবতার চেয়ে তিনি সম্ভাব্য বাস্তবতার আখ্যান তুলে ধরেন। ঐতিহাসিক পটভূমিতে জাদু-বাস্তবতার মিশেল এবং ভারতীয় উপমহাদেশ, পূর্ব ও পশ্চিমের অসংখ্য সংযোগ, বিচ্ছিন্নতা ও অভিপ্রয়াণ তাঁর লেখনীর বৈশিষ্ট্য।
রুশদির বহুজাতিক পরিচয় ও সাহিত্য
বহুজাতিক পরিচয় রুশদির ব্যক্তিজীবনে নানাভাবে ছাপ ফেলেছে। তাঁর প্রবন্ধ-উপন্যাসের কেন্দ্র কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ড নয়, বরং গোটা বিশ্ব। 'মিডনাইট চিলড্রেন', 'শেম' এবং 'দ্য স্যাটানিক ভার্সেস'—এই তিনটি উপন্যাস তিনটি দেশ নিয়ে, যার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিসংযোগ আছে: ইংল্যান্ড (যেখানে তিনি থাকেন), ভারত (যেখানে তাঁর জন্ম) এবং পাকিস্তান (যেখানে তাঁর আত্মীয়স্বজন আছে)।
ভারত বিভাগের বছরে বম্বেতে তাঁর জন্ম। তিনি ইংল্যান্ডের 'রাগবি' পাবলিক স্কুলে ভর্তি হন, কিন্তু বর্ণবাদের শিকার হন। স্কুলের দেয়ালে এক সহপাঠী লিখে রাখে: 'WOGs go back home'। পরে তিনি পাকিস্তানে ফিরে যান এবং কিছুদিন পাকিস্তান টেলিভিশনে কাজ করেন, কিন্তু সংকীর্ণমনা সমাজে কাজ করতে না পেরে আবার ইংল্যান্ডে চলে আসেন। 'শেম' উপন্যাসে তিনি এই তৃদেশিয় জীবন নিয়ে বলেন: 'আমি ছেড়ে এসেছি একটা দেশ, আর এখন দুটো দেশে নবাগত। আমাদের অর্থাৎ মহাজিরদের নিয়ে এত রাগের কারণ হলো আমরা মাধ্যাকর্ষণ বলকে জয় করেছি। আমরা এমন একটা কাজ করে দেখিয়েছি যা চিরকাল মানুষের স্বপ্ন—আমরা উড়তে পেরেছি।'
রুশদির প্রথম উপন্যাস 'গ্রিমাস' (১৯৭৯) স্বদেশ ছেড়ে ভিনদেশে পাড়ি জমানো লোকজনের গল্প। নায়ক ভারতীয় মার্কিন ফ্ল্যাপিং ঈগল তার হারানো বোনকে খুঁজতে ভূমধ্যসাগরের এক দ্বীপে যায়। বোন বন্দি ইউরোপীয় জাদুকর গ্রিমাসের হাতে। ফ্ল্যাপিং ঈগল স্বদেশি ভাষা-রীতিনীতি ত্যাগ করে দ্বীপের ভাষা ও সংস্কৃতি গ্রহণ করে। পরস্পরবিরোধী আদর্শিক জীবনযাপন করতে করতে প্রথাগত আদর্শের উপর থেকে তার ভরসা উঠে যায়।
এর পরের উপন্যাস 'মিডনাইট চিলড্রেন' (১৯৮১) রুশদির অন্যতম সেরা কাজ। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র সালিম সিনাইয়ের জন্ম ভারত বিভাজনের মুহূর্তে। ভারতের ঔপনিবেশ-পূর্ব ও উত্তরকাল জড়িয়ে যায় সালিমের জীবনের সঙ্গে। জন্মদাতা পিতা উইলিয়াম মেথোল্ড ভারত স্বাধীন হওয়ার পর ব্রিটেনে ফিরে যান। মা ভারতীয় বনিতা। জন্মের সময় সালিমের আত্মপরিচয় বদলে যায় এবং সে হয়ে ওঠে আমিনা ও আহমেদ সিনাইয়ের পুত্র। এই ছদ্মবেশী মিশ্র রক্ত ও বর্ণের মানুষের মধ্য দিয়ে সমগ্র ভারতের চেহারা ফুটে ওঠে। কিন্তু ভারতের চেহারা কি একটি? সালিমের শেষ পর্যন্ত উপলব্ধি হয়—যতজন ভারতীয়, ততটা ভারতের চেহারা।
'দ্য স্যাটানিক ভার্সেস' উপন্যাসে রুশদি ঔপনিবেশিক শক্তির কেন্দ্রগত ধারণা ভেঙে দেন এবং ইউরোপীয় উপন্যাসের কাঠামো ভেঙে নতুনভাবে আইডেনটিটি পলিটিক্স দাঁড় করান। উপন্যাসে সালদীন চামচার বাসনা ছিল সম্পূর্ণ ইংলিশম্যান হয়ে ওঠার। রুশদি দেখান যে ইউরোপ বা আমেরিকা কেন্দ্র এবং ভারত বা আফ্রিকা প্রান্ত—এই ধারণা সঠিক নয়। লন্ডন আসলে বহু জাতিগোষ্ঠীর সম্মিলন কেন্দ্র, বহিরাগতদের শহর। বিশুদ্ধ ইংরেজ বলে সেখানে কিছু টিকছে না। ইংরেজ পামেলা সালাদীনের মধ্য দিয়ে ভারতীয় ঐতিহ্যের দিকে ঝুঁকে পড়ে, অন্যদিকে সালাদীন পামেলার মধ্য দিয়ে ভারতীয় ঐতিহ্য থেকে বের হতে চায়। এভাবে পরিচয় বদলের কেন্দ্র হয়ে ওঠে ইউরোপ।
রুশদি 'মিডনাইট চিলড্রেন', 'শেম' ও 'স্যাটানিক ভার্সেস' দিয়ে যে বৃত্ত শুরু করেছিলেন, তার সমাপ্তি টানেন 'দ্য মুরস লাস্ট সাই' (১৯৯৬) উপন্যাসে। এই উপন্যাসের কথক মোরেস জোগোয়বি গোয়ার বাসিন্দা। তার শরীরে খ্রিষ্টান ও ইহুদি রক্ত আছে এবং পর্তুগিজ-ইংরেজ সহবাসে সে জারজ সন্তান। ভারতে জন্ম হলেও সে ভারতীয় নয়, আবার জারজ হওয়ায় নিজেকে ইংরেজ বা পর্তুগিজ দাবি করতে পারে না। রুশদির ইতিহাস-জিজ্ঞাসা এখান থেকেই শুরু হয়। তাকে আমরা এমন এক ভাসমান পৃথিবীর কথক হিসেবে দেখি, যার প্রতি জাতীয়তাবাদী কোনো দায় নেই, দায় আছে সত্যের। সেই সত্য আবার সামষ্টিক নয়, বরং তাঁর নিজের সত্য বা ইতিহাসের সম্ভাব্য সত্য।



