বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) কর্তৃপক্ষ তাঁর আজীবন ইমেরিটাস অধ্যাপকের পদ বাতিল এবং এ পদে প্রাপ্ত সম্মানী ফেরত দেওয়ার নির্দেশে গভীর হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ। তিনি এ পদক্ষেপকে ব্যক্তিগত ও সামাজিক অপমান বলে আখ্যা দিয়ে বলেন, জীবনের এই পর্যায়ে এসে এমন সিদ্ধান্ত তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে।
পাঁচ দশকের সেবা ও স্বীকৃতি
প্রায় পাঁচ দশক ধরে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে চিকিৎসা পেশায় সেবা দেওয়ার কথা উল্লেখ করে ডা. আব্দুল্লাহ বলেন, তিনি ১৪-১৫টি আন্তর্জাতিক ও একাডেমিক পুরস্কার, ইউজিসি পুরস্কার এবং দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদক পেয়েছেন। এছাড়া বিশ্বখ্যাত দুটি মেডিকেল বই—ডেভিডসন এবং কুমার অ্যান্ড ক্লার্কের আন্তর্জাতিক উপদেষ্টা বোর্ডেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।
পদ বাতিলের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন
বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি যে তাঁর নিয়োগ অবৈধ ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ডা. আব্দুল্লাহ বলেন, শুধু ‘অবৈধ’ বললেই হবে না, কর্তৃপক্ষকে তার কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে। তিনি বলেন, ‘আমার নিয়োগের সময় সব নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল। পাঁচটি ধাপে আমার যোগ্যতা, দক্ষতা ও অবদান যাচাইয়ের পর এই সম্মাননা দেওয়া হয়। যদি নিয়োগ সত্যিই অবৈধ হতো, তাহলে তৎকালীন প্রশাসন কখনোই আমাকে নিয়োগ দিত না।’
ব্যক্তিগত শত্রুতার সম্ভাবনা
এই সিদ্ধান্তে ব্যক্তিগত শত্রুতার প্রভাব থাকতে পারে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. আব্দুল্লাহ বলেন, তিনি নিশ্চিতভাবে বলতে পারেন না, তবে ব্যক্তিগত শত্রুতা বা বিরূপ মনোভাবের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। তিনি অভিযোগ করেন, বিশ্ববিদ্যালয় এই নিয়োগ বাতিলের কোনো নির্দিষ্ট যৌক্তিকতা উপস্থাপন করেনি।
বিশ্বে নজিরহীন সিদ্ধান্ত
ডা. আব্দুল্লাহ বলেন, ‘বাংলাদেশে বা বিশ্বের কোথাও কোনো আজীবন সম্মানজনক পদ বাতিলের নজির আছে বলে আমি জানি না। আমার কাছে পুরো সিদ্ধান্তটি অবিচার, অযৌক্তিক এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে হচ্ছে।’
সম্মানী ফেরতের নির্দেশ
ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে প্রাপ্ত সম্মানী ফেরত দেওয়ার নির্দেশ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। ‘আমি এই অর্থ চুরি, ডাকাতি বা জোর করে পাইনি। এটি বেতন নয়, সম্মানী। বিশ্ববিদ্যালয় যদি ফেরত চায়, আমি ফেরত দেব। কিন্তু এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা বাড়বে না, বরং কমবে’, বলেন তিনি।
সিদ্ধান্তকে ‘ক্ষুদ্রতা’ বলে অভিহিত
এই সিদ্ধান্তকে ‘মহানুভবতা নয়, বরং ক্ষুদ্রতার পরিচায়ক’ বলে মন্তব্য করে ডা. আব্দুল্লাহ বলেন, ‘তারা মনে করতে পারেন তাদের সিদ্ধান্তই একমাত্র সঠিক। কিন্তু অন্যদেরও বিচার করার ও বোঝার ক্ষমতা আছে।’
জনগণের ভালোবাসায় কৃতজ্ঞ
ডা. আব্দুল্লাহ বলেন, তিনি জনগণের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা পেয়ে কৃতজ্ঞ এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মানুষের সেবা করে যেতে চান। ‘আল্লাহর রহমতে আমি এখনো মানুষের ভালোবাসা ও সম্মান পাচ্ছি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমি মানবতার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করতে চাই’, বলেন তিনি।
আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দেওয়ার অভিযোগ
এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাঁকে নিজের পক্ষে বলার সুযোগ দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেন ডা. আব্দুল্লাহ। ‘আমাকে আগে থেকে জানানো হলে আমি আমার অবস্থান উপস্থাপনের সুযোগ পেতাম। তারপরও যদি তারা সন্তুষ্ট না হতো, তাহলে পরে সিদ্ধান্ত নিতে পারত। কিন্তু আমাকে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ না দিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইচ্ছামতো কাজ করা যায় না; আমারও বৈধ যুক্তি ও বক্তব্য থাকতে পারে।’
বিএমইউর সিন্ডিকেট সিদ্ধান্ত
এর আগে বিএমইউর রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. মো. মোস্তফা কামালের স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে বলা হয়, ২০২৪ সালের ২০ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯২তম সিন্ডিকেট বাজেট সভায় এজেন্ডার বাইরে ইমেরিটাস অধ্যাপক নিয়োগ অধ্যাদেশ সংশোধন করা হয় এবং তার ভিত্তিতে ডা. আব্দুল্লাহকে আজীবন ইমেরিটাস অধ্যাপক নিয়োগ দেওয়া হয়। আদেশে বলা হয়, এই নিয়োগ পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমালার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। পরবর্তীতে ৯৯তম সিন্ডিকেট সভা এই নিয়োগ বাতিল করে এবং ডা. আব্দুল্লাহকে এ পদে প্রাপ্ত সম্মানী ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেয়।



