সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের স্নাতক ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রটি কয়েক দিন ধরে ভাইরাল হয়েছে। অসংখ্য মানুষ সেটি শেয়ার করছেন এবং কেউ বিস্ময়, কেউ প্রশংসা প্রকাশ করছেন। কেউ কেউ বলছেন, ‘পরীক্ষার প্রশ্নও এত সুন্দর হতে পারে!’
প্রশ্নপত্রে কী আছে?
প্রশ্নপত্রে শিক্ষার্থীদের জানতে চাওয়া হয়েছে—‘সাহিত্যে পড়া বা সিনেমায় দেখা সবচেয়ে শক্তিশালী নারী চরিত্র’, ‘তোমার ছোটবেলার ইচ্ছেগুলো, থমকে যাওয়াগুলো’, ‘ঈশ্বরকে যদি পাঁচটি প্রশ্ন করার সুযোগ পেতে...’, ‘যে বইটি তোমার প্রিয়জনকে উপহার দিতে চাও’, ‘প্রিয় সাহিত্যিকের উদ্দেশে লেখা তোমার খোলা চিঠি’, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সুখের কথা, ভয়ের কথা’।
বাংলাদেশের বাস্তবতা
বাংলাদেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় সাফল্য নির্ভর করে কে বেশি তথ্য মুখস্থ করেছে তার ওপর। প্রশ্নে থাকে কোন সালে কী ঘটেছে, কোন লেখকের কোন গ্রন্থ, কোন সংজ্ঞার ঠিক কোন শব্দটি ব্যবহার করতে হবে। শিক্ষার্থীর চিন্তা নয়, তার স্মৃতিশক্তিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষাদর্শনের পার্থক্য
এটি বাংলাদেশ বনাম ভারত নয়, বরং দুই ধরনের শিক্ষাদর্শনের পার্থক্য। একটি শিক্ষাদর্শন বিশ্বাস করে, একজন শিক্ষার্থীর স্মৃতিশক্তিই তার সবচেয়ে বড় যোগ্যতা। অন্যটি বিশ্বাস করে, একজন শিক্ষার্থীর চিন্তার ক্ষমতাই তার সবচেয়ে বড় সম্পদ।
লেখক মো. আব্বাসের মতে, ‘আগামী দিনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দ্বিতীয় পথটিই বেছে নিতে হবে। কারণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে তথ্যের অভাব নেই। বরং সবচেয়ে মূল্যবান হয়ে উঠছে নতুনভাবে ভাবতে পারা, নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে পারা এবং সৃজনশীলভাবে নিজেকে প্রকাশ করার ক্ষমতা।’
ভবিষ্যতের চিন্তক তৈরি
বিশ্ববিদ্যালয় শুধু তথ্য শেখার জায়গা নয়, প্রশ্ন করতে শেখার জায়গা। যাদবপুরের প্রশ্নপত্রটি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে যে পরীক্ষাও সুন্দর হতে পারে। প্রশ্নও সাহিত্য হতে পারে। একটি প্রশ্নপত্র একজন তরুণকে লিখতে, ভাবতে ও নিজের ভেতরের মানুষটির সঙ্গে কথা বলতে উৎসাহিত করতে পারে।
লেখক বলেন, ‘আমরা প্রায়ই বলি, বিশ্ববিদ্যালয় ভবিষ্যতের নাগরিক তৈরি করে। আমি একটু বদলে বলতে চাই, বিশ্ববিদ্যালয় ভবিষ্যতের চিন্তক তৈরি করে। আর একজন চিন্তকের জন্ম শুরু হয় একটি ভালো প্রশ্ন থেকে।’
উপসংহার
শিক্ষা শুধু উত্তর জানার নাম নয়। শিক্ষা হলো এমন প্রশ্নের সামনে দাঁড়ানো, যার উত্তর খুঁজতে গিয়ে একজন মানুষ নিজেকেও নতুন করে আবিষ্কার করে। হয়তো এ কারণেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রশ্নপত্র এত মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। এটি আমাদের আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে একটি প্রশ্ন করেছে—আমরা কি এখনো এমন শিক্ষা চাই, যেখানে মুখস্থ করা মানুষ বেশি দরকার, নাকি এমন শিক্ষা চাই, যেখানে ভাবতে জানা মানুষ বেশি দরকার?



