কাঠ-কাগজের শহীদ মিনারে ভাষাশহীদদের শ্রদ্ধা জানালো কুড়িগ্রামের চরের শিক্ষার্থীরা
কাঠ-কাগজের শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানালো চরের শিক্ষার্থীরা

কাঠ-কাগজের শহীদ মিনারে ভাষাশহীদদের শ্রদ্ধা জানালো কুড়িগ্রামের চরের শিক্ষার্থীরা

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ঘোগাদহ ইউনিয়নের প্রথম আলো চরে অবস্থিত আলোর পাঠশালার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা একটি অনন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। স্থায়ী শহীদ মিনারের অভাব পূরণ করতে তারা পুরোনো কাঠ ও কাগজ দিয়ে নিজেরাই একটি অস্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ করে ভাষাশহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।

শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ

গতকাল শুক্রবার সকাল থেকেই বিদ্যালয়ের বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীরা পুরোনো কাঠ, কাগজ ও আঠা সংগ্রহ করে শহীদ মিনারের কাঠামো তৈরির কাজে হাত দিয়েছে। কেউ কর্কশিট কেটে বাংলা বর্ণমালা লিখেছে, আবার কেউ লাল-সবুজের গালিচা তৈরি করেছে সবুজ ঘাস ও রং মিশিয়ে। কাজ করতে করতে রাত হয়ে গেলে কয়েকজন শিক্ষার্থী বিদ্যালয়েই থেকে যায়, যা তাদের দায়িত্ববোধ ও উৎসাহের পরিচয় দেয়।

আজ শনিবার সকালে সূর্যোদয়ের পর খালি পায়ে প্রভাতফেরিতে অংশ নিয়ে শিক্ষার্থীরা শিমুল, পলাশ, গাঁদা ও জবা ফুল হাতে নিয়ে এই কাঠ-কাগজের শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে। বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকেও শ্রদ্ধা জানানো হয়, যা সম্প্রদায়ের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টাকে তুলে ধরে।

স্থায়ী শহীদ মিনারের আকাঙ্ক্ষা

বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের স্কুলে স্থায়ী শহীদ মিনার নেই। তাই পুরোনো কাঠ ও কাগজ দিয়ে নিজেরাই মিনার তৈরি করেছি। গতকাল সকাল থেকে কাজ করতে করতে রাত হয়ে গিয়েছিল। সকালে শিমুল আর গাঁদা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছি। আমাদের স্কুলে একটি স্থায়ী শহীদ মিনার হলে ভালো হতো।’ তার এই কথায় শিক্ষার্থীদের মৌলিক চাহিদা ও আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘নদীবেষ্টিত এই চরের শিশুরা টেলিভিশনে শহীদ মিনার দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছে। সেই অনুপ্রেরণায় তারা নিজেরাই অস্থায়ী মিনার তৈরি করেছে। চরের অনেক খেটে খাওয়া মানুষ ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস জানেন না। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকদের কাছেও ভাষাসংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরতে পেরে আমাদের ভালো লাগছে।’ দিবসটি উপলক্ষে আলোচনা সভা ও কবিতা পাঠের আয়োজনও করা হয়েছে, যা শিক্ষামূলক কার্যক্রমকে সম্প্রসারিত করেছে।

প্রতিবছরের ঐতিহ্য

প্রতিবছরই এই শিক্ষার্থীরা অনুরূপ অস্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করে থাকে। এই মিনারটি কেবল আলোর পাঠশালার জন্য নয়, বরং প্রথম আলো চর, চর রাউলিয়া ও রসুলপুর এলাকার মানুষদের জন্যও একটি কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করে, যেখানে সবাই একত্রিত হয়ে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

এই উদ্যোগটি শুধুমাত্র একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃজনশীলতা, দলগত কাজ ও জাতীয় ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসা গড়ে তুলছে। কুড়িগ্রামের এই প্রত্যন্ত চর এলাকায় শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ভাষা আন্দোলনের চেতনা বাঁচিয়ে রাখতে এই প্রচেষ্টা একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।