রাজশাহীর পবা উপজেলার ভুগরইল খ্রিষ্টানপাড়া গ্রামে শিশুপ্রভাত বিদ্যানিকেতন স্কুলে বাচ্চারা শ্রেণিকক্ষে ঢোকে, আর মায়েরা বসেন সেলাইয়ের কাজ নিয়ে। ১৫-২০ জন নারী একসঙ্গে কাঁথায় নকশা তোলেন আর গল্প করেন। তাঁরা সাঁওতালি বা মাহালি ভাষায় কথা বলেন। এই কাঁথা সেলাইয়ের আয় থেকেই চলে বিদ্যালয়টি।
নারী ও শিশুকল্যাণ সংস্থার উদ্যোগ
সুমী মুর্মু নামের এক নারীর উদ্যোগে স্থানীয় নারীদের নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে 'নারী ও শিশুকল্যাণ সংস্থা'। বাইরের কোনো তহবিল নেই; নারীদের হাতের কাজের আয় দিয়েই সংস্থার ব্যয় মেটানো হয়। ২০২১ সালে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। সংস্থার তৈরি নকশিকাঁথা ৮০০ টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। মাসে গড়ে ১৫০টি কাঁথা বিক্রি হয়। কয়েরদাঁড়া খ্রিষ্টানপাড়ায় নিজ বাড়ির আঙিনায় ও বাইরে 'প্রকৃতি কালেকশন' নামে দুটি বিক্রয়কেন্দ্র গড়ে তুলেছেন সুমী মুর্মু। এই কাজে এখন ১৭২ নারী যুক্ত। কেউ কাঁথা সেলাই করেন, কেউ ব্লক প্রিন্টের কাজ করেন, কেউ কাঁথা পরিষ্কার ও ইস্তিরি করেন। বিক্রয়কেন্দ্রে ছয়জন নারী বিক্রয়কর্মী রয়েছেন। কাজের দক্ষতা অনুযায়ী তাঁরা মাসে সাড়ে ৩ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করেন।
সুমী মুর্মুর সংগ্রামী জীবন
সুমী মুর্মুর বাবা আলবেট মুর্মু রাজশাহী সেনানিবাসের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ছিলেন। তিনি ছেলেমেয়েদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করার স্বপ্ন দেখতেন; কিন্তু বেতনে সংসার খরচ মেটানোই দায় ছিল। মাকে মাঠের কাজে যেতে হতো। সুমীরা পাঁচ ভাই-বোন মায়ের কাছেই হাতেখড়ি নিয়েছিলেন। অভাবের কারণে প্রাইভেট টিউটরদের বেতন দিতে পারতেন না। ১৯৯৬ সালে সুমি ক্যান্টনমেন্ট স্কুলে ভর্তি পরীক্ষায় পাস করে ভর্তি হন। ২০০৬ সালে এসএসসি পাস করেন। ভর্তি হন রাজশাহী নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজে।
এসএসসি পরীক্ষার পর পরিবারের চাপে বিয়ে করতে হয়। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার আগেই মা হন। শ্বশুরবাড়ির লোকজন চাইতেন না পড়াশোনা চালিয়ে যান; কিন্তু সুমী শিশুসন্তানকে ঘুম পাড়িয়ে বই নিয়ে বসেন। এভাবে এইচএসসি পাস করেন। এরপর রাজশাহী কলেজ থেকে ২০১৩ সালে স্নাতক (পাস কোর্স) ও ২০১৫ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। পরে বিএড ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মার্কেটিং বিভাগের এমবিএ করেন।
চাকরি ছেড়ে উদ্যোক্তা
লেখাপড়া শেষে সুমী মুর্মু একটি বেসরকারি ব্যাংকের মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ হিসেবে যোগদান করেন। বছর দুই চাকরি করেন; কিন্তু নিজ সম্প্রদায়ের নারীদের জীবনছবি তাঁর চোখে ভাসতে থাকে। দুই বছরের মাথায় চাকরি থেকে ইস্তফা দেন। সঞ্চিত অর্থ নিয়ে নিজ সম্প্রদায়ের জীবনমান উন্নয়নের জন্য আত্মকর্মসংস্থানের কথা ভাবেন। যুব উন্নয়ন থেকে সেলাইয়ের প্রশিক্ষণ নেন। নিজের বাসায় নকশিকাঁথা তৈরি শুরু করেন। তারপর নিজ সম্প্রদায়ের মাঠে খাটা নারীদের হাতে কাজ তুলে দেন।
সুমী মুর্মুর মতে, এটি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষের অশিক্ষা, মাদকাসক্তি, নারী নির্যাতন ও বাল্যবিবাহের চিরচেনা সংকট থেকে বের হয়ে আসার একটি উদ্যোগ। তাঁর ভাষায়, 'ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মায়েরা সকালে উঠে মাঠের কাজে বের হয়ে যান। বিকেলে এসে পরিবারের কাজ করেন। তারা বাচ্চাদের কোনো সময় দিতে পারেন না। বাচ্চারা নিজেদের মতো ধুলামাটি মেখে বড় হয়ে বাবা-মায়ের পেশায় যোগ দেয়। তাদের জীবনে কোনো পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে না।'
কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হওয়া নারীদের এখন আর মাঠে যেতে হয় না। তাঁরা বাচ্চাদের পড়াশোনায় সময় দেন। পরিবারে বাড়তি আয়ও জোগান দিচ্ছেন। কয়েরদাঁড়া খ্রিষ্টানপাড়া মহল্লার অ্যামেলি বাষ্কী (২৫) কাঁথা সেলাই করেন। তিনি বলেন, 'আমার আগে সংসারে অনেক অভাব ছিল। জ্বর এলে নিজের ইচ্ছায় একটা বড়ি (ওষুধ) কিনতে পারতাম না। এখন সুমি দিদির এখানে কাজ করে অনেক ভালো আছি। বাচ্চার পড়ালেখার খরচ দিতে পারি। সময় দিতে পারি। একই সঙ্গে মাসে ছয় থেকে আট হাজার টাকা রোজগার করতে পারছি।'
ভুগরইল গ্রামের সুমি বিশ্বাস (৩৭) বলেন, 'আমি আগে মাঠে কাজ করতাম। সুমি দি আমাকে সেলাইয়ের প্রোগ্রাম দিয়েছে। এই প্রোগ্রামে কাজ করি। ছেলেপেলেদের লেখাপড়া শিখাচ্ছি। খরচ দিতে পারি। নিজেও যেটা মনে ধরে কিনতে পারি। মাসে প্রায় আট হাজার টাকা আয় হয়।' একই গ্রামে মারীয়া বিশ্বাস (৩৬) নতুন এসেছেন। তিনি জানান, মাসে সাড়ে তিন থেকে চার হাজার টাকা আয় করেন।
৩০০ ধরনের নকশা
সংস্থার সদস্যরা জানান, আগে তাঁরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা বাহারি ফুল ও নকশা ফুটিয়ে তুলতেন নকশিকাঁথায়। এখন অনলাইনে অনেক নকশা পাওয়া যায়। তারা সেখান থেকে ৩০০ ধরনের নকশার কাঁথা তৈরি করছেন। ফলে কাঁথায় আরও বেশি নতুনত্ব এসেছে। বর্তমানে নকশিকাঁথায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে পদ্ম, শাপলা, গোলাপ কিংবা জুঁই। অনেক কাঁথার মাঝে থাকে বড় একটি পদ্মফুলের নকশা, চারদিকে ছড়িয়ে থাকে লতা-পাতা আর ছোট ছোট ফুল। ফুলের পাশাপাশি জ্যামিতিক নকশারও বিশেষ উপস্থিতি রয়েছে। প্রাণী ও পাখির নকশারও চল রয়েছে, যেমন ময়ূরের পেখম, মাছের চলন কিংবা পাখির যুগল চিত্র।
বিদ্যালয়ের যাত্রা
কাঁথা সেলাইয়ের কাজ শুরুর পর সুমী লক্ষ্য করেন, তাঁর সেলাইয়ের কাজের সঙ্গে নগরের কয়েরদাঁড়া খ্রিষ্টানপাড়া ও পবা উপজেলার ভুগরইল গ্রামের মেয়েরা বেশি জড়িত। ভুগরইল গ্রামে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। গ্রামের গির্জার পাশে মিশন থেকে একটি বেসরকারি সংস্থা স্কুল চালাচ্ছিল। প্রকল্প শেষে তারা বিদ্যালয় ফেলে চলে গেছে। তারপর থেকে এলাকার শিশুদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। সুমী তখন ফাদারের কাছে এই বিদ্যালয় চালানোর প্রস্তাব করেন। প্রতিমাসে ঘরভাড়া দিতে হয় ১ হাজার টাকা। শিক্ষক কর্মচারী পাঁচজন। চারজন শিক্ষক ও একজন আয়া। শিক্ষকদের তিন হাজার ও আয়াকে মাসে দুই হাজার টাকা করে বেতন দিতে হয়। সব ব্যয় সংস্থা থেকে মেটানো হয়।
সুমি ২০২২ সালে সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে 'নারী ও শিশুকল্যাণ সংস্থা'র নিবন্ধন নেন। সেখানে সংস্থার কাজের পরিধি হিসেবে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য বিদ্যালয় পরিচালনার কথাও বলা হয়। অধিদপ্তর থেকে শর্ত দেওয়া হয়—বিদ্যালয়ে শুধু নিজের সম্প্রদায় নয়, সব সম্প্রদায়ের শিশুদের পড়ার সুযোগ দিতে হবে। তিনি সেই শর্তেই কাজ শুরু করেন।
একইভাবে উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামে মিশনের আরেকটি পরিত্যক্ত বিদ্যালয়ে সুমি একইভাবে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করেছেন। প্লে থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত সব সম্প্রদায়ের শিশুরা পড়াশোনা করছে। ভুগরইল গির্জার ফাদার লিটন কস্তা বলেন, পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের শিশুদের লেখাপড়া চালিয়ে নেওয়ার জন্য তারা নামমাত্র ভাড়ায় বিদ্যালয় ভবনটি ব্যবহার করতে দিয়েছেন।
বিদ্যালয়ে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বাচ্চাদের সঙ্গে একই বেঞ্চে বসে পড়ছেন আবদুস সামি, আলভী, রাফি, আক্তার হোসনা, অনিষা ভূঁইয়া, শ্রী মাহির। ভুগরইল গ্রামের অভিভাবক মুক্তি বিশ্বাসের ছেলে বর্ষণ বিশ্বাস নার্সারিতে পড়ে। তিনি বলেন, 'অনেক দূরে স্কুল। এই স্কুল না থাকলে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা হতো না।'



