স্কুলে আলাদা ওয়াশব্লক না থাকায় শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অস্বস্তি
স্কুলে আলাদা ওয়াশব্লক না থাকায় শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি

রাজধানীর মগবাজারের নয়াটোলা এলাকায় অবস্থিত লায়ন্স মডেল স্কুলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করানো হয়। প্রায় দেড় শ শিক্ষার্থী ও ছয়জন শিক্ষক নিয়ে পরিচালিত বিদ্যালয়টিতে ছেলে ও মেয়েদের জন্য আলাদা ‘ওয়াশব্লক’ নেই। একই ওয়াশব্লকে থাকা শৌচাগার ব্যবহার করতে হয় সবাইকে।

বিদ্যালয়ের বর্তমান অবস্থা

গত সোমবার দুপুরে বিদ্যালয়টিতে গিয়ে দেখা যায়, চারতলা ভবনের দোতলা পর্যন্ত বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। নিচতলায় রয়েছে একটি ওয়াশব্লক। সেটি পরিচ্ছন্ন থাকলেও ছেলে ও মেয়েদের জন্য পৃথক নয়। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কাজী শাহ আলম প্রথম আলোকে বলেন, আলাদা ওয়াশব্লক না থাকলেও মৌখিকভাবে ছেলে ও মেয়েদের জন্য পৃথক শৌচাগার নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।

১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা বিভাগের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এ বিদ্যালয় এমপিওভুক্ত নয়। শিক্ষকদের বেতন-ভাতা মূলত শিক্ষার্থীদের বেতনের ওপর নির্ভরশীল। তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত মাসিক বেতন ৩০০ টাকা এবং চতুর্থ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ৪০০ টাকা।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সার্বিক চিত্র

আলাদা ওয়াশব্লক না থাকার সমস্যাটি শুধু এই বিদ্যালয়ের নয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন শাখার সাম্প্রতিক পরিদর্শনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একই চিত্র উঠে এসেছে।

মাউশির পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন শাখা গত ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত ৭৪০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে। তাদের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ৫২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছেলে ও মেয়েদের জন্য পৃথক ওয়াশব্লক নেই। আবার ১৪৬টিতে প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত পৃথক ওয়াশব্লক আছে আর ১৩১টি প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত ওয়াশব্লক থাকলেও সেগুলো অপরিষ্কার।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পৃথক ওয়াশব্লকবিহীন ৫২টি প্রতিষ্ঠানের তালিকা মাউশি মহাপরিচালকের কাছে পাঠিয়েছে পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন শাখা। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ময়মনসিংহ অঞ্চলে ১৩টি, রাজশাহীতে ১০, বরিশালে ৬, চট্টগ্রাম ও খুলনায় ৫টি করে, ঢাকা ও রংপুরে ৪টি করে, কুমিল্লায় ৩টি এবং সিলেটে ২টি।

ছাত্রীদের ওপর প্রভাব

শিক্ষাবিদ ও স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যালয়ে পৃথক ওয়াশব্লক না থাকলে তা শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকিই তৈরি করে না; বরং শিক্ষার্থীদের গোপনীয়তা, স্বাচ্ছন্দ্য ও নিয়মিত উপস্থিতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে ছাত্রীরা মারাত্মক অস্বস্তির মধ্যে পড়ে। প্রসঙ্গত, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ছাত্রদের চেয়ে ছাত্রীদের ভর্তির হার বেশি।

পৃথক ও পরিচ্ছন্ন ওয়াশব্লকের প্রয়োজনীয়তার একটি বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরেন শিক্ষা ক্যাডারের এক নারী কর্মকর্তা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর দুই সন্তান ঢাকার একটি নামকরা বিদ্যালয়ে পড়ত। বাসা থেকে নিয়মিত খাবার ও পানি দেওয়া হলেও তারা অনেক সময় সেগুলো খাওয়া এড়িয়ে যেত। কারণ, স্কুলের অপরিচ্ছন্ন শৌচাগার ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে, এ আশঙ্কায় তারা খাওয়াদাওয়া কমিয়ে দিত।

পরিদর্শনের বিস্তারিত তথ্য

মাউশির আওতাধীন মাধ্যমিক স্তরের মোট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ২০ হাজার ২৫৮টি। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তিন মাস অন্তর ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেমের (ডিএমএস) আওতায় এসব প্রতিষ্ঠানের পরিবীক্ষণ করা হয়। বছরের প্রথম ত্রৈমাসিক মনিটরিং অনুযায়ী, গত জানুয়ারি থেকে মার্চ সময়ে ৭৪০টি প্রতিষ্ঠানে মোট ১ হাজার ৩৮৭ বার (একই প্রতিষ্ঠান একাধিকবারসহ) মনিটর করা হয়।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, ৯৪৮টি পরিদর্শনে শিক্ষার্থীদের পরিচ্ছন্নতাচর্চা সন্তোষজনক ছিল। তবে ১১৬টি পরিদর্শনে তা দৃশ্যমান ছিল না। আবার ১৬৯টি পরিদর্শনে প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাখার উদ্যোগও চোখে পড়েনি।

পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা রয়েছে। তবে ১৫০টি পরিদর্শনে পানি থাকলেও তা যথাযথ নয়। ৬২টিতে পানির ব্যবস্থা ছিল অপর্যাপ্ত। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে নিজস্ব খেলার মাঠ থাকলেও ১৩৮টিতে মাঠের পরিবর্তে নির্দিষ্ট খোলা ফ্লোর ব্যবহার করা হয়। আর ১৮টি প্রতিষ্ঠানে নিজস্ব মাঠ কিংবা পাশের কোনো উন্মুক্ত স্থান ব্যবহারেরও সুযোগ নেই।

রুটিন অনুযায়ী ক্লাস পরিচালনায় ঘাটতি

মনিটরিং প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ৯৭৪টি পরিদর্শনে নির্ধারিত সময়ে শিক্ষকেরা শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। তবে ৮০টি পরিদর্শনে এ নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি। সব বিষয়ের ক্লাস সমান গুরুত্ব দিয়ে পরিচালিত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে ৬৬৫টি পরিদর্শনে। বিপরীতে ৩৮৯টি পরিদর্শনে এ বিষয়ে নেতিবাচক তথ্য উঠে এসেছে।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনো উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে ছাত্রীদের জন্য পৃথক ও পরিচ্ছন্ন ওয়াশব্লক নিশ্চিত করা এখন শুধু অবকাঠামোগত নয়, শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

মাউশির পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন শাখার পরিচালক অধ্যাপক টিপু সুলতান প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের কাজ হলো মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ করে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানো। মনিটরিংয়ে পৃথক ওয়াশব্লকসহ অন্যান্য বিষয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে, বাস্তবচিত্র আরও বেশি খারাপ। শুধু প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের সচেতন করে এ সমস্যার সমাধান হবে না। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ওয়াশরুমের রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে আলাদা আর্থিক বরাদ্দ প্রয়োজন।

এ বিষয়ে মাউশির মহাপরিচালক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল প্রথম আলোকে বলেন, পৃথক শৌচাগার না থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে পাঠানো হবে, যাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার কিশোরীদের স্বাস্থ্য ও হাইজিন বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই নতুন প্রকল্প গ্রহণের সময় মেয়েদের জন্য উপযুক্ত ও নিরাপদ স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।