কেরানীগঞ্জ মাদ্রাসা বিস্ফোরণে মন্দিরে হামলার পরিকল্পনা, তদন্তে অগ্রগতি নেই
মাদ্রাসা বিস্ফোরণে মন্দিরে হামলার পরিকল্পনা, তদন্তে অগ্রগতি নেই

কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদে একটি মাদ্রাসায় বিস্ফোরণের চার মাস পর তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, জঙ্গিরা দেশজুড়ে মন্দিরে সমন্বিত হামলার পরিকল্পনা করেছিল। মাদ্রাসায় তৈরি বিস্ফোরক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার কথা ছিল। একাধিক গ্রেপ্তার ও জিজ্ঞাসাবাদ সত্ত্বেও তদন্তে তেমন অগ্রগতি হয়নি।

পরিকল্পনা ও উদ্দেশ্য

মামলার নথি অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে সন্দেহভাজনরা জানিয়েছে, তারা বিভিন্ন জেলার মন্দিরে একযোগে হামলার পরিকল্পনা করেছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করা এবং দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের আস্থা নষ্ট করা। তদন্তকারীরা বলছেন, দলটি সাধারণ মুসল্লিদের জিহাদি বক্তব্য ও ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিজেদের নেটওয়ার্কে টানার চেষ্টা করছিল।

গ্রেপ্তার ও জড়িত গোষ্ঠী

গ্রেপ্তারকৃতরা নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশের (জেএমজেবি) সমর্থক। এটি জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) একটি বিভক্ত গ্রুপ। কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা অন্যান্য জঙ্গি গোষ্ঠীকে অস্ত্র ও বিস্ফোরক সরবরাহ করত এবং দেশজুড়ে নাশকতা পরিচালনা করত।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কেরানীগঞ্জ বিস্ফোরণ

গত ২৬ ডিসেম্বর উম্মুল কুরা আন্তর্জাতিক মাদ্রাসায় বিস্ফোরণ ঘটে। এতে দুটি কক্ষ ও একটি সিএনজি গ্যারেজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কয়েকদিন পর আরেকটি বিস্ফোরণে একজন আহত হন। দেশজুড়ে অভিযান চালিয়ে ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যার মধ্যে বিস্ফোরক প্রস্তুতকারক ও জঙ্গি নেতা শেখ আল আমিনও রয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিট (এটিইউ) সাতজনকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বারবার গ্রেপ্তার ও জামিন

তদন্তকারীরা বলছেন, আল আমিনসহ কয়েকজন সন্দেহভাজন আগেও পাঁচ থেকে সাতবার গ্রেপ্তার হয়েছিল, কিন্তু জামিনে বেরিয়ে আবার জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ে। আল আমিনের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা, নরসিংদী ও বাগেরহাটে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সাতটি মামলা রয়েছে।

তদন্তে ধীরগতি

বিস্ফোরণস্থল থেকে সংগ্রহ করা প্রমাণ সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে, কিন্তু রিপোর্ট এখনও আসেনি। তদন্তকারীরা বলছেন, ফরেনসিক রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত মামলার প্রতিবেদন দেওয়া সম্ভব নয়। এটিইউর মিডিয়া ও সচেতনতা শাখার পুলিশ সুপার মাহফুজুল আলম বলেন, 'ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে, তবে এখনও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই।'

মাদ্রাসার আড়ালে জঙ্গি তৎপরতা

তদন্তকারীরা মনে করছেন, মাদ্রাসাটি জঙ্গি প্রশিক্ষণ ও বোমা তৈরির আড়াল হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ২০২২ সালের ১ এপ্রিল মুফতি হারুন নামে এক ব্যক্তি বাড়িটি মাসিক ১০ হাজার টাকায় ভাড়া নেন। এরপর মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। স্থানীয়রা ছাত্রদের পড়তে দেখে কিছু সন্দেহ করেনি। বাড়ির মালিক পরিবার এখন ভাড়া পাচ্ছে না এবং বাড়ি ফেরত পেতে পুলিশের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে।

জেএমজেবির বিবর্তন

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, জেএমজেবি মূলত জেএমবির একটি উপসংগঠন ছিল, যার নেতৃত্বে ছিলেন সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই। পরে সদস্যরা 'নতুন জেএমবি' নামে পুনরায় সংগঠিত হয় এবং আইএসের মতাদর্শ গ্রহণ করে। তদন্তকারীরা মনে করছেন, কেরানীগঞ্জের সেলটি এই নেটওয়ার্কের অংশ ছিল।

উদ্বেগ ও বিশ্লেষণ

বারবার গ্রেপ্তার হওয়া সত্ত্বেও জঙ্গি নেটওয়ার্ক ভাঙতে না পারায় বিশ্লেষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নজরদারি ও পুনরাবৃত্ত অপরাধীদের পর্যবেক্ষণ জোরদার করা প্রয়োজন। মন্দিরে হামলার পরিকল্পনার তথ্য ধর্মীয় সহিংসতার আশঙ্কা বাড়িয়েছে। বর্তমানে মাদ্রাসাটি সিল করা আছে, সন্দেহভাজনরা বিচারের অপেক্ষায় এবং তদন্তকারীরা ফরেনসিক রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছেন।