দুর্ঘটনায় ডান হাত হারিয়েও দাখিল পরীক্ষা দিচ্ছে মাদ্রাসাছাত্র রেজভী
ভোলার লালমোহনের এক মাদ্রাসা শিক্ষার্থী ইকবাল হাসান রেজভীর জীবন এক দুর্ঘটনায় আমূল বদলে গিয়েছিল। বিদ্যুতের তার স্পর্শে তার ডান হাত কেটে ফেলতে হলেও, সে পিছু হটেনি। বরং অদম্য ইচ্ছাশক্তির বলে বাঁ হাতে লেখা রপ্ত করে এবার দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে রেজভী, যা তার সংগ্রামী চেতনার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
দুর্ঘটনার বেদনাদায়ক অধ্যায়
করোনা মহামারীর সময়, যখন রেজভী ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ত, তখন একদিন বন্ধুদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলতে যায় লালমোহন লাঙ্গলখালী আব্দুল ওহাব মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠে। খেলার বলটি পাশের জেলা পরিষদের মার্কেটের ছাদে চলে গেলে, তা আনতে গিয়ে ঘটে বিপত্তি। ছাদে থাকা বিদ্যুতের লাইনের তারের সঙ্গে অসতর্কতাবশত তার ডান হাত লেগে যায়, ফলে সে বিদ্যুতায়িত হয়ে গুরুতর আহত হয়। পরে ঢাকায় চিকিৎসা নেওয়ার সময় তার ডান হাত কেটে ফেলতে বাধ্য হয় চিকিৎসকরা।
অর্থনৈতিক সংকট ও পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম
রেজভীর পরিবার অর্থনৈতিকভাবে সংকটাপন্ন। তার বাবা মো. ইউসুফ একটি কোম্পানির খাদ্যপণ্য লালমোহন বাজারে দোকানে দোকানে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করেন, যা থেকে অল্প বেতনে সংসার চলে। দুর্ঘটনার পর চিকিৎসার খরচ মেটাতে বন্ধুরা এগিয়ে আসে, এবং সুস্থ হয়ে রেজভী লালমোহন ইসলামিক মডেল মাদ্রাসায় ভর্তি হয়। সেখান থেকেই সে বাঁ হাতে লেখা শুরু করে, যা শুরুতে কঠিন হলেও ধীরে ধীরে রপ্ত করে নেয়।
দাখিল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ
মঙ্গলবার সারাদেশে একযোগে এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। রেজভীও লালমোহন ইসলামিক মডেল মাদ্রাসার পক্ষ থেকে সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ কেন্দ্রের ১০২ নম্বর কক্ষে কুরআন মাজিদ বিষয়ের পরীক্ষায় অংশ নেয়। প্রতিষ্ঠানের ২৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে সে একমাত্র ব্যক্তি, যে বাঁ হাতে পরীক্ষার খাতায় পরিচ্ছন্নভাবে লিখছে। রেজভী জানায়, "আল্লাহর রহমতে ডান হাতের মতোই শক্তি পাই বাঁ হাতে। কুরআন মাজিদ পরীক্ষাও সুন্দরভাবে লিখতে পেরেছি।"
প্রশাসনিক সহানুভূতির আহ্বান
রেজভীর প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অধ্যাপক এমএ জাহের বলেন, "ছাত্রটি অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া করছে। ওর পরীক্ষা নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসনের ও হল সচিবের সহানুভূতিশীল হওয়া উচিত।" অন্যদিকে, পরীক্ষা কেন্দ্রের সচিব অধ্যক্ষ মাওলানা মোশাররফ হোসাইন জানান, "শিক্ষার্থী বাঁ হাতে লিখতে পারছে। তার কোনো সমস্যা হচ্ছে না। যদি কোনো সমস্যা হয়, বিধি অনুযায়ী আমরা দেখব।"
রেজভীর এই সংগ্রাম শুধু একটি ব্যক্তিগত সাফল্যই নয়, বরং তা শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। তার অদম্য মনোবল প্রমাণ করে, প্রতিকূলতা কখনোই সফলতার পথে বাধা হতে পারে না, যদি থাকে দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায়।



