গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের জগতে এমি নোয়েদার এক বিস্ময়কর নাম। তাঁর বিখ্যাত নোয়েদারস থিওরেম বা নোয়েদারের উপপাদ্য আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম বড় ভিত্তি। সহজ কথায় বলতে গেলে উপপাদ্যটি প্রমাণ করে, মহাবিশ্বের যেকোনো সিস্টেমের প্রতিটি ধারাবাহিক প্রতিসাম্যের জন্য একটি সংরক্ষিত রাশি থাকে।
শব্দগুলো একটু খটমটে লাগতে পারে। আরেকটু সহজ করা যাক। ধরুন, আপনি একটি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা আজ করলেন, আবার কাল করলেন। সময়ের পরিবর্তনে ফলাফলের কোনো পরিবর্তন হলো না। এটিই সময়ের প্রতিসাম্য। নোয়েদারের সূত্র বলছে, এই প্রতিসাম্যের কারণেই মহাবিশ্বে শক্তি সংরক্ষিত থাকে। আবার স্থান পরিবর্তনের কারণে যদি ফলাফলের পরিবর্তন না হয়, তাহলে ভরবেগ সংরক্ষিত থাকে।
নোয়েদারের উপপাদ্যের পেছনের ধারণা
ব্যাপারটা আসলে কীভাবে কাজ করে? নোয়েদারের এই ভাবনাটা বুঝতে হলে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের একেবারে গভীরে ডুব দিতে হবে। স্কুলে পদার্থবিজ্ঞান ক্লাসে কোনো সমস্যা সমাধানের সময় বলের সমীকরণ ব্যবহার করা হয়। সেটা হতে পারে সূর্যের চারদিকে কোনো গ্রহের কক্ষপথ বের করা কিংবা ঢিল ছোড়ার পর তার গতিপথ নির্ণয় করা। এই সমীকরণ সমাধান করলে জানা যায়, সময়ের সঙ্গে বস্তুর অবস্থান কীভাবে বদলাবে। অর্থাৎ, কোনো নির্দিষ্ট সময়ে বস্তুটি কোথায় থাকবে, তা আগেই হিসাব করে বলা যায়।
কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠলে পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা এসব সমস্যা সমাধানের জন্য অন্য একটি পদ্ধতি শেখেন। সেখানে বলের বদলে শক্তির হিসাব করা হয়। দুটি পদ্ধতিই দিন শেষে একই ফল দেয়। তবে শক্তির হিসাবটা অনেক বেশি বাস্তবসম্মত এবং যেকোনো জায়গায় সহজে খাটানো যায়। এ কারণেই নোয়েদারের উপপাদ্য প্রমাণ করতে এই পদ্ধতিটি ব্যবহার করা হয়।
সর্বনিম্ন ক্রিয়ার নীতি
শক্তির এই পদ্ধতিটি বলের হিসাবের চেয়ে একটু বেশি বিমূর্ত। গতির সমীকরণ বের করার জন্য এখানে ক্যালকুলাসের কিছু প্রাথমিক জ্ঞান থাকা লাগে। তবে এর পেছনের মূল ধারণাটা একদম পানির মতো সহজ। যখন কোনো কিছু এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় যায়—যেমন বাতাসে উড়ে যাওয়া একটি বল মাটিতে পড়ছে—তখন সেটি এমন পথ বেছে নেয় যেখানে সবচেয়ে কম খাটনি হয়। পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় এই খাটনি বা প্রচেষ্টাকেই বলা হয় অ্যাকশন বা ক্রিয়া।
এই ধারণার শুরু হয়েছিল ফার্মার নীতি থেকে। গণিতবিদ পিয়েরে ফার্মা দেখিয়েছিলেন, আলো কোনো গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য সবসময় সবচেয়ে কম সময় লাগে, এমন পথ বেছে নেয়। মহাবিশ্বের অন্য সব সিস্টেমও ঠিক এই নিয়মটাই মেনে চলে। এই নীতিটা ধরে নিয়ে সামান্য কিছু হিসাব-নিকাশ করলেই গতির সমীকরণ বের করা যায়। যেমন সূর্যের চারদিকে গ্রহের ঘোরাঘুরির পথ।
ল্যাগরেঞ্জিয়ান ও অ্যাকশন
ছুড়ে দেওয়া একটি বলের মতো কোনো গতিশীল সিস্টেমকে পুরোপুরি বুঝতে হলে, প্রতি মুহূর্তে তার অবস্থান এবং বেগ আপনার জানা থাকতে হবে। এতগুলো তথ্য একসঙ্গে মাথায় রাখা বেশ ঝামেলার। কারণ, এসব তথ্যকে ছয় মাত্রার একটি ভেক্টর দিয়ে প্রকাশ করা হয়। অবস্থানের জন্য তিনটি স্থানাঙ্ক এবং বেগের জন্য আরও তিনটি। এগুলো প্রতি মুহূর্তে বদলাতে থাকে।
এই ঝামেলা এড়াতে পদার্থবিজ্ঞানীরা একটি স্কেলার রাশি ব্যবহার করেন, যার ভেতরে এই সব তথ্য লুকিয়ে থাকে। এর নাম ল্যাগরেঞ্জিয়ান। ল্যাগরেঞ্জিয়ান একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে সিস্টেমের মোট গতিশক্তি ও বিভবশক্তির বিয়োগফল। আর অ্যাকশন, মানে নির্দিষ্ট সময়ে কোনো সিস্টেমকে এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় নিতে যে খাটুনি লাগে তা সরাসরি এই ল্যাগরেঞ্জিয়ানের সঙ্গে যুক্ত। সোজা কথায়, প্রতিটি মুহূর্তের ল্যাগরেঞ্জিয়ানের সময়ের সাপেক্ষে সমাকলন বা ইন্টিগ্রেশন হলো অ্যাকশন।
পদার্থবিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন, একটি ভৌত সিস্টেমের নিখুঁত গতিপথ সবসময় সবচেয়ে ছোট পথটির সঙ্গে মিলে যায়। ক্যালকুলাস করার সময় আপনি নিশ্চয়ই শিখেছেন, কীভাবে একটি নির্দিষ্ট সীমার ভেতরে কোনো ফাংশনের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বিন্দু বের করতে হয়। এই বিন্দুগুলোকে বলা হয় এক্সট্রিমা। আপনি এগুলো বের করেন গ্রাফ এঁকে, ফাংশনটিকে ডিফারেনশিয়েট বা অন্তরীকরণ করে সেটির মান শূন্য ধরে। কিন্তু এখানে অ্যাকশন কোনো সাধারণ ফাংশন নয়। এটি বিশেষ ধরনের একটি ফাংশন, যাকে বলা হয় ফাংশনাল। সাধারণ ফাংশন ও ফাংশনালের মধ্যে বেশ পার্থক্য আছে।
অ্যাকশন মূলত সময়ের সাপেক্ষে ল্যাগরেঞ্জিয়ানকে ইন্টিগ্রেট বা যোগ করে। আর ল্যাগরেঞ্জিয়ান নিজেই আবার বস্তুর অবস্থান ও বেগের মতো সময়ের ওপর নির্ভরশীল ফাংশনগুলো নিয়ে তৈরি। তাই অ্যাকশনের সর্বোচ্চ বা সর্বনিম্ন বিন্দু বের করতে হলে একটু সাবধানে এগোতে হয়। এর একটি উপায় হলো ক্যালকুলাস অব ভ্যারিয়েশনস। নিয়মটা সাধারণ ফাংশনের মতোই। সিস্টেমটি যেসব সম্ভাব্য পথে চলতে পারে, সেগুলোতে সামান্য অদলবদল করে দেখতে হয় কোথায় অ্যাকশনের মান সবচেয়ে কম বদলায়। এভাবেই আমরা সেই সমীকরণগুলো পেয়ে যাই, যা সিস্টেমের গতির সমীকরণ নির্দেশ করে। যেমন, গ্রহের কক্ষপথ।
প্রতিসাম্য ও সংরক্ষিত রাশি
তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান ও ক্যালকুলাসের এত কঠিন তত্ত্ব শোনার পর আপনার মনে হতেই পারে, নোয়েদারের উপপাদ্যের সঙ্গে এসবের কী সম্পর্ক! সম্পর্কটা হলো, এই ল্যাগরেঞ্জিয়ান ব্যবহার করেই আমরা যেকোনো সিস্টেমের সেই ধারাবাহিক প্রতিসাম্য বের করতে পারি। ধরুন, ল্যাগরেঞ্জিয়ানের চলকগুলোতে আপনি একটি প্রতিসাম্য রূপান্তর ঘটালেন, কিন্তু সিস্টেমের মূল অবস্থায় কোনো পরিবর্তন হলো না। তার মানে আপনি একটি প্রতিসাম্য খুঁজে পেয়েছেন।
উদাহরণ দিলে বিষয়টা পরিষ্কার হবে। ধরুন, দুটি গোলক x অক্ষ ধরে একে অপরের দিকে এগিয়ে এসে ধাক্কা খেল। এখানে ল্যাগরেঞ্জিয়ান শুধু তাদের দূরত্বের ওপর নির্ভর করে। অর্থাৎ, s1 - s2 = q। এখানে q হলো সাধারণ দূরত্ব, s1 প্রথম গোলকের অবস্থান এবং s2 দ্বিতীয় গোলকের অবস্থান। এখন আপনি যদি দুটি গোলকের অবস্থানকেই সমান দূরত্বে সরিয়ে দেন (ধরি α পরিমাণ), ল্যাগরেঞ্জিয়ানের কোনো পরিবর্তন হবে না। কারণ (s1 + α) - (s2 + α) = q। অর্থাৎ, স্থান পরিবর্তনের পরও সিস্টেমটি প্রতিসম থাকছে।
নোয়েদার আসলে এটাই খুঁজেছিলেন। সময় বা অবস্থানের মতো কোনো চলককে যখন α প্যারামিটার দিয়ে পরিবর্তন করা হয়, তখন ল্যাগরেঞ্জিয়ান কীভাবে বদলায়। ল্যাগরেঞ্জিয়ানকে α-এর সাপেক্ষে ডিফারেনশিয়েট করলেই এই পরিবর্তনের হিসাবটা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায়। যদি α-এর কারণে হওয়া পরিবর্তনটি একটি প্রতিসাম্য হয়, তবে ল্যাগরেঞ্জিয়ানের (L) কোনো পরিবর্তন হবে না। আর পরিবর্তন না হওয়া মানে, এর অন্তরজের মান শূন্য।
ল্যাগরেঞ্জিয়ানের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে সামান্য কিছু হিসাব-নিকাশ করলেই α-এর সাপেক্ষে L-এর অন্তরজের (∂L/∂α) একটি নতুন রাশি Q-এর সময়ের সাপেক্ষে অন্তরজে (dQ/dt) পরিণত হয়। যেহেতু এর মানও শূন্য, তার মানে দাঁড়ায় নতুন রাশি Q সময়ের সঙ্গে বদলায় না। অর্থাৎ, এটি একটি সংরক্ষিত রাশি!
এভাবেই নোয়েদারের উপপাদ্য প্রতিটি প্রতিসাম্যের জন্য একটি সংরক্ষিত রাশি এনে দেয়, আর সেই রাশিটি কীভাবে মাপতে হবে, তার সূত্রটাও শিখিয়ে দেয়। সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান



