জলবায়ু পরিবর্তন, অজানা মহামারি কিংবা পারমাণবিক যুদ্ধের হুমকির খবর প্রায়ই শোনা যায়। খবরের কাগজ বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঢুকলেই মনে হয়, পৃথিবীর আয়ু হয়তো আর বেশি দিন নেই। কিন্তু বিজ্ঞানীরা যখন হিমবাহ গলে যাওয়া বা ওজোন স্তরের ফুটো নিয়ে চিন্তিত, তখন একদল গণিতবিদ সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দিক থেকে মানুষের বিলুপ্তির হিসাব কষছেন। তাঁদের এই হিসাব কোনো জীবাশ্ম বা তাপমাত্রার ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং নিছক পরিসংখ্যান ও সম্ভাবনার অঙ্কের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সেই গাণিতিক হিসাব থেকে অদ্ভুত এক উপসংহার বেরিয়ে এসেছে—এই পৃথিবীতে মানবজাতি সর্বোচ্চ ১৭ হাজার ১০০ বছর টিকে থাকবে! এই ভবিষ্যদ্বাণী মিলে যাওয়ার সম্ভাবনা ৯৫ শতাংশ বলে দাবি করা হচ্ছে।
ডুমসডে আর্গুমেন্ট: কীভাবে এই সংখ্যা বের হলো?
এই তত্ত্বের নাম ডুমসডে আর্গুমেন্ট। ১৯৮৩ সালে অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট ব্র্যান্ডন কার্টার এই ধারণার জন্ম দেন। এর মূল ভিত্তি হলো কোপারনিকান প্রিন্সিপল। ষোড়শ শতাব্দীতে নিকোলাস কোপারনিকাস প্রথম প্রমাণ করেছিলেন, পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়। মহাবিশ্বের বিশালত্বের কাছে আমাদের কোনো বিশেষ জায়গা নেই। ঠিক একই যুক্তি ডুমসডে আর্গুমেন্টে ব্যবহার করা হয়েছে। সময়ের বিশাল টাইমলাইনে মানুষ হিসেবে আমাদের বর্তমান অবস্থান মোটেও বিশেষ কিছু নয়, বরং একেবারেই র্যান্ডম।
ধরুন, অতীত থেকে শুরু করে ভবিষ্যৎ পর্যন্ত এই পৃথিবীতে মোট যত মানুষ জন্ম নেবে, তাদের সবাইকে একটা সরলরেখায় দাঁড় করানো হলো। আপনি বা আমি সেই রেখার ঠিক কোথায় আছি? যেহেতু আমরা বিশেষ কেউ নই, তাই এই রেখার ঠিক মাঝামাঝি কিংবা যেকোনো জায়গায় আমাদের থাকার সম্ভাবনা সমান।
উদাহরণ দিয়ে বোঝা
ধরুন, আপনার সামনে একই রকম দুটি বাক্স রাখা আছে। একটি বাক্সে ১ থেকে ১০ পর্যন্ত নম্বর লেখা ১০টি পিংপং বল আছে। অন্য বাক্সে আছে ১ থেকে ১ লাখ পর্যন্ত নম্বর লেখা এক লাখ বল। কিন্তু আপনি জানেন না কোন বাক্সে কয়টি বল আছে। এবার আপনাকে না দেখে যেকোনো একটি বাক্স থেকে একটি বল তুলতে বলা হলো। আপনি বল তুলে দেখলেন সেটিতে ‘৪’ লেখা। এবার বলুন তো, বলটি কোন বাক্স থেকে আসার সম্ভাবনা বেশি? নিশ্চয়ই বলবেন, যেটিতে ১০টি বল আছে সেটি থেকে! কারণ ছোট বাক্স থেকে ‘৪’ ওঠার সম্ভাবনা ১০ ভাগের ১ ভাগ। আর এক লাখ বলের বাক্স থেকে ‘৪’ ওঠার সম্ভাবনা ১ লাখ ভাগের ১ ভাগ, যা প্রায় অসম্ভব!
আমাদের মানবজাতির ক্ষেত্রেও অঙ্কটা ঠিক এ রকমই। পৃথিবীতে এযাবৎকাল প্রায় ১১ হাজার ৭০০ কোটি (১১৭ বিলিয়ন) মানুষ জন্ম নিয়েছে। অর্থাৎ আপনি বা আমি হলাম এই পৃথিবীর ১১ হাজার ৭০০ কোটি নম্বর বল (পড়ুন মানুষ)। এখন মানবজাতি যদি ভবিষ্যতে পুরো গ্যালাক্সিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন মানুষ জন্ম দেয় (লাখের বলের বাক্স), তবে আমাদের নম্বর এত শুরুতে পড়ার সম্ভাবনা খুবই কম। বরং মানবজাতি যদি আর কয়েক হাজার বছর পর বিলুপ্ত হয়ে যায় (ছোট বাক্স), তবে আমাদের নম্বরটি ১১৭ বিলিয়নে হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি!
গাণিতিক সীমা: সর্বোচ্চ ২.৩৪ ট্রিলিয়ন মানুষ
গণিতবিদেরা বলছেন, ওই সরলরেখায় ধরে নিন আমরা মোট মানবজাতির প্রথম ৫ শতাংশের মধ্যে পড়ি না। এর সম্ভাবনা ৯৫ ভাগ। এই যুক্তিতে অঙ্ক কষলে দেখা যায়, পৃথিবীতে এযাবৎকাল পর্যন্ত জন্ম নেওয়া মোট মানুষের (১১৭ বিলিয়ন) ২০ গুণের চেয়ে কম মানুষ ভবিষ্যতে জন্ম নেবে। অর্থাৎ, পৃথিবীতে অতীত থেকে ভবিষ্যৎ পর্যন্ত জন্ম নেওয়া মানুষের সর্বোচ্চ সংখ্যা হতে পারে ১১৭ বিলিয়নের ২০ গুণ, অর্থাৎ ২.৩৪ ট্রিলিয়ন! এর বেশি মানুষ পৃথিবীতে আসা গাণিতিকভাবে প্রায় অসম্পূর্ণ।
এবার বর্তমানের সঙ্গে হিসাবটা মেলানো যাক। গত ৪০ বছর ধরে পৃথিবীতে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১৩ কোটি শিশুর জন্ম হচ্ছে। যদিও জন্মের হার কমছে, তবু মোট জনসংখ্যা বাড়ছে। যদি ধরে নিই এই ১৩ কোটি জন্মের হার আগামী দিনগুলোতেও একই থাকবে, তবে ওই সর্বোচ্চ সীমায় (২.৩৪ ট্রিলিয়ন) পৌঁছাতে মানবজাতির সময় লাগবে আর মাত্র ১৭ হাজার ১০০ বছর! জন্মের হার কমলে-বাড়লে এই সংখ্যাটা একটু এদিক-ওদিক হতে পারে, কিন্তু মূল হিসাবটা ওই ১৭ হাজারের আশপাশেই থাকবে।
বিজ্ঞানীদের সমালোচনা ও বিকল্প মত
তাহলে কি ১৭ হাজার বছর পর সত্যিই সব শেষ হয়ে যাবে? আসলে বিজ্ঞান মানেই যুক্তি ও তর্কের খেলা। তাই ডুমসডে আর্গুমেন্টের এই হিসাব অনেক বিজ্ঞানীই সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। তাঁদের যুক্তি হলো, আমরা যদি শুধু মানুষের কথা না ভেবে পৃথিবীর বুকে জন্ম নেওয়া প্রথম ব্যাকটেরিয়া থেকে শুরু করে সব জীবের কথা একসঙ্গে ধরি, তবে এই হিসাবটা একদম উল্টে যাবে এবং পৃথিবীর ধ্বংস আরও কোটি কোটি বছর পিছিয়ে যাবে।
আবার আরেকদল বিজ্ঞানীর দাবি, মানুষ তো সবেমাত্র এই বিলুপ্তির অঙ্ক কষার মতো বুদ্ধিমান হয়েছে! বুদ্ধির এই সীমানা পার হওয়ার কারণেই হয়তো আমরা কেবল ভাবতে শুরু করেছি। তার মানে, আমরা হয়তো মানব সভ্যতার একেবারে শুরুর দিকেই আছি। যদি তাই হয়, তবে কোপারনিকান প্রিন্সিপল এখানে খাটবে না এবং আমাদের ভবিষ্যৎ এখনো অনেক লম্বা!
১৭ হাজার বছর পর সত্যি সত্যিই পৃথিবী টিকবে কি না, তা নিশ্চিতভাবেই আমরা কেউ দেখে যেতে পারব না, অন্তত যারা এই লেখাটি পড়ছেন। কিন্তু গণিতের এই পরিসংখ্যান আমাদের অন্তত এটুকু বলে, মহাকালের বিশাল ক্যানভাসে আমাদের অস্তিত্ব ঠিক কতটা ক্ষুদ্র এবং ক্ষণস্থায়ী!



