সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার ও ইউটিউব খুললেই ক্যানসারের কারণ নিয়ে কথা বলা ইনফ্লুয়েন্সার এবং স্বঘোষিত সুস্থতা-বিশেষজ্ঞদের অসংখ্য ভিডিও চোখে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে মনে হতে পারে, আপনার রান্নাঘরে পুষ্টিকর খাবারের চেয়ে ক্যানসারের মতো প্রাণঘাতী রোগের কারণ হিসেবে চিহ্নিত উপাদানের সংখ্যাই যেন বেশি।
চিনির ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। গত কয়েক বছরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চিনিকে মানবস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অনেকের কাছে এটি শুধু খাদ্যতালিকার একটি ক্ষতিকর উপাদানই নয়, বরং ক্যানসারসহ প্রায় সব রোগের উৎস বলেও বিবেচিত হচ্ছে।
ডা. বর্তিকা বিষ্ণাণীর ব্যাখ্যা
এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে গুরগাঁওভিত্তিক কনসালট্যান্ট সার্জিক্যাল অনকোলজিস্ট ডা. বর্তিকা বিষ্ণাণীর চিনি বিষয়ক ধারণার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে ডা. বর্তিকা বিষ্ণাণী সম্প্রতি প্রকাশিত এক ভিডিওতে চিনি সরাসরি ক্যানসার সৃষ্টি করে—এমন প্রচলিত ধারণাকে ভ্রান্ত বলে ব্যাখ্যা করেছেন।
ডা. বর্তিকা এক সাক্ষাৎকারের কথা উল্লেখ করে বলেন, এক সাক্ষাৎকারে একজন নারী দাবি করেন যে চিনি ক্যানসার সৃষ্টি করে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি একজন ক্যানসার বিশেষজ্ঞ এবং বৈজ্ঞানিকভাবে এমন কোনও প্রমাণ নেই যে আমি যদি চকলেট, কেক বা পেস্ট্রি খাই, তাহলে ভবিষ্যতে আমার ক্যানসার হবে।” এভাবেই তিনি প্রচলিত এই ধারণাকে ভ্রান্ত বলে ব্যাখ্যা করেন।
সামাজিক মাধ্যমের স্বঘোষিত বিশেষজ্ঞদের বিরুদ্ধে সতর্কতা
তিনি আরও উল্লেখ করেন, তার এই বক্তব্য শুনে কেউ কেউ বিস্মিত হবেন, আবার কেউ ভিডিওটির নিচে নেতিবাচক মন্তব্য করবেন। কারণ ইনস্টাগ্রামে অসংখ্য ভিডিওতে দাবি করা হয় যে চিনি ক্যানসারের কারণ। কিন্তু মানবদেহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো দাবির ভিত্তিতে কাজ করে না। তাই ইনস্টাগ্রামের বিভিন্ন স্বঘোষিত স্বাস্থ্যগুরুর কথা অনুসরণ না করে মানুষের উচিত বৈজ্ঞানিক গবেষণার ওপর ভিত্তি করে উত্তর খোঁজা।
পিইটি স্ক্যানের ভুল ব্যাখ্যা
ডা. বিষ্ণাণী বেশ কয়েকটি পিইটি স্ক্যানের ছবি শেয়ার করে বলেন, স্বঘোষিত স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অনেক সময় দাবি করেন যে রিপোর্টে যেসব অংশ হাইলাইটেড দেখা যায়, সেগুলো নাকি ক্যানসার কোষ, কারণ সেগুলো ‘চিনি’ গ্রহণ করেছে। তবে অনকোলজিস্ট ব্যাখ্যা করেন, এ ধরনের স্ক্যানে শুধু ক্যানসার কোষই নয়, মস্তিষ্ক, কিডনি ও অন্ত্রসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গও হাইলাইটেড দেখা যায়।
ডা. বর্তিকা প্রশ্ন করেন, “প্রতিটি জীবন্ত কোষ সক্রিয়ভাবে বিভাজিত হচ্ছে, আর তারা শক্তির জন্য চিনি ব্যবহার করে। যদি আপনি চিনি গ্রহণ না করেন, তাহলে আপনার অঙ্গগুলো শক্তি কোথা থেকে পাবে?” তিনি আরও যোগ করেন, “আপনার গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর শক্তি জোগাতে শরীর তখন অন্য টিস্যু, যেমন পেশি, ব্যবহার করতে শুরু করবে।”
ক্যানসার কোষ ও চিনির সম্পর্ক
বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ক্যানসার কোষ দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে বেশি শক্তি ব্যবহার করে। তবে এর মানে এই নয় যে উপোস বা না খেলে সেগুলো ধ্বংস হয়ে যাবে। বরং এটি স্বাস্থ্যের জন্য আরও ক্ষতিকর হতে পারে।
তিনি বলেন, “যেকোনো কিছুর অতিরিক্ততা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর—তা চিনি হোক, স্থূলতা হোক কিংবা কোনও বিপাকজনিত রোগ। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, বিপাকজনিত রোগ ভবিষ্যতে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। সবকিছুই নির্ভর করে জীবনযাপনের ওপর।”
ডা. বর্তিকা বলেন, “আমি বলছি না যে প্রতিদিন মিষ্টি, পেস্ট্রি বা রস মালাই খেতে হবে। তবে যখন মানুষ ফল, সম্পূর্ণ শস্য ও ঘরোয়া খাবার খাওয়া বন্ধ করে দেয়, তখন তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে।”



