মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির ঠিক কেন্দ্রেই লুকিয়ে আছে এক ভয়ংকর দানব—এক সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল। এর নাম স্যাজিটেরিয়াস এ*। এর ভর পৃথিবীর চেয়ে এক ট্রিলিয়ন বা এক লাখ কোটি গুণ বেশি। অথচ এই বিপুল ভরকে চেপেচুপে এমন এক ছোট্ট জায়গায় আটকে রাখা হয়েছে, যা চওড়ায় পৃথিবীর মাত্র দুই হাজার গুণ বড়। সহজ কথায়, একটা বিশাল হিমালয় পর্বতকে যদি একটি ছোট মার্বেলের ভেতর ঢুকিয়ে ফেলা হয়, ঠিক তেমন একটা ব্যাপার!
পঞ্চাশ বছরের রহস্য
প্রায় ৫০ বছর ধরে এই ব্ল্যাকহোল নিয়ে বিজ্ঞানীদের মনে একটা বড় খটকা ছিল। তাত্ত্বিকভাবে বিজ্ঞানীদের হিসাব বলছিল, এ ধরনের সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলগুলো থেকে মহাকাশে সব সময় একধরনের গরম বাতাস ছড়িয়ে পড়ার কথা। কিন্তু এই ব্ল্যাকহোল থেকে এমন কোনো বাতাসের দেখা পাওয়া যাচ্ছিল না। ব্যাপারটা এমন, যেন জানা যায় মাথার ওপর একটি ফ্যান ঘুরছে; কিন্তু কোনো বাতাস পাওয়া যায় না!
তবে এবার সেই দীর্ঘ রহস্যের জট খুলেছে। বিখ্যাত অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটারস-এ প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণায় বলা হয়েছে, বিজ্ঞানীরা অবশেষে আমাদের ব্ল্যাকহোল থেকে বেরিয়ে আসা সেই গরম বাতাসের সন্ধান পেয়েছেন!
গবেষণার বিবরণ
যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক এলেনা মুরচিকোভা ও মার্ক গোর্স্কির নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানী এই অসাধারণ কাজ করেছেন। এলেনা বলেন, 'আমরা আগে কখনো ব্ল্যাকহোল থেকে বের হওয়া এমন বাতাস দেখিনি। আমরা সাধারণত ব্ল্যাকহোলের ধ্বংসাত্মক আচরণ দেখতেই অভ্যস্ত। কিন্তু ব্ল্যাকহোলটি চুপচাপ বসে থেকে কোনো সহিংসতা ছাড়াই চারপাশের অঞ্চলে এভাবে শক্তি ছড়িয়ে দিচ্ছে—এটা দেখতে দারুণ কিউট!'
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এত দিন এই বাতাস দেখা যায়নি কেন? কারণটা খুব সোজা। শীতের সকালে ঘন কুয়াশার মধ্যে দাঁড়িয়ে অনেক দূরের কোনো হেডলাইট দেখার চেষ্টা করলে যেমন ঝাপসা দেখা যায়, তেমনি আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রের ব্ল্যাকহোলটিকে দেখতে হলে বিজ্ঞানীদের পুরো গ্যালাক্সির সমতল বরাবর তাকাতে হয়। আর এই পথে রয়েছে প্রচুর গ্যাস, ধুলোবালি ও আয়নিত কণা। এগুলোর ঘন পর্দা ভেদ করে ভেতরে কী হচ্ছে, তা দেখা খুবই কঠিন।
বিজ্ঞানীরা চিলিতে বসানো শক্তিশালী রেডিও টেলিস্কোপ 'আলমা' দিয়ে টানা পাঁচ বছর তথ্য সংগ্রহ করেছেন। এরপর ব্ল্যাকহোলের চারপাশের উজ্জ্বল রেডিও আলো যখন তাঁরা বিশেষ প্রক্রিয়ায় ফিল্টার করে সরিয়ে ফেললেন, তখন গ্যাসের ভেতরে লুকিয়ে থাকা চমৎকার এক দৃশ্য ফুটে উঠল! তাঁরা দেখলেন, সেখানে প্রায় তিন আলোকবর্ষ লম্বা বিশাল একটা মোচাকৃতির গর্ত তৈরি হয়েছে। নাসার চন্দ্র এক্স-রে অবজারভেটরির তথ্যেও ঠিক একই রকম ফাঁকা জায়গার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এ গর্তটাই হলো সেই ব্ল্যাকহোল থেকে বেরিয়ে আসা গরম বাতাসের রাস্তা!
বাতাস বের হওয়ার প্রক্রিয়া
ব্ল্যাকহোল তো সবকিছু নিজের ভেতরে টেনে নেয়, তাহলে সেখান থেকে বাতাস আবার বাইরে বেরিয়ে আসছে কীভাবে? ব্যাপারটা বোঝার জন্য একটি মজার উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরুন, বৃষ্টির দিনে ছাতা মাথায় হাঁটছেন। হঠাৎ ছাতাটা বন্ধ করে যদি খুব জোরে ঘোরাতে থাকেন, তাহলে কী হবে? ছাতার গায়ে লেগে থাকা বৃষ্টির পানি তীব্র বেগে ছিটকে চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে, তাই না? ব্ল্যাকহোলের ক্ষেত্রেও ঠিক এমন ঘটনাই ঘটে।
মহাকাশের গ্যাস ও ধুলোবালি যখন স্যাজিটেরিয়াস এ* মহাকর্ষীয় টানের কাছে চলে আসে, তখন এগুলো ব্ল্যাকহোলটিকে কেন্দ্র করে ঘুরতে শুরু করে। তারা যত কাছে আসে, তাদের ঘোরার গতি তত বেড়ে যায়। একপর্যায়ে এই গ্যাসমেঘ প্রায় আলোর গতির কাছাকাছি বেগে ঘুরতে থাকে। প্রচণ্ড বেগে ঘোরার কারণে গ্যাসের এই মেঘ চ্যাপ্টা হয়ে একটা বিশাল থালার রূপ নেয়, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে অ্যাক্রিশন ডিস্ক। এই জ্বলন্ত থালার ভেতরের অংশ ধীরে ধীরে ব্ল্যাকহোলের পেটে চলে যায়।
কিন্তু সব গ্যাসই ব্ল্যাকহোলের ভেতরে পড়ে যায় না। ব্ল্যাকহোলের খুব কাছের গ্যাসে প্রচণ্ড বিকিরণ চাপ তৈরি হয়। এই চাপের কারণে বেশ কিছু অতি-উত্তপ্ত গ্যাস ভেতরের দিকে না ঢুকে তীব্র বেগে বাইরের দিকে ছিটকে বেরিয়ে আসে। এটাই হলো সেই ব্ল্যাকহোলের গরম বাতাস! এলেনা মুরচিকোভা জানিয়েছেন, ব্ল্যাকহোল যে পরিমাণ গ্যাস গিলে খায়, তার চেয়ে বেশি পরিমাণ গ্যাস বাইরে ছিটকে বেরিয়ে আসে। যখন সেখানে কোনো শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র থাকে, তখন এই মোচাকৃতির বাতাসটা সরু হয়ে যায়, যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন জেট।
আবিষ্কারের গুরুত্ব
এই আবিষ্কার জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে দারুণ উচ্ছ্বাস তৈরি করেছে। এত দিন আমাদের সবচেয়ে কাছের এবং সবচেয়ে বেশি তথ্য জানা এই সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলটিই বিজ্ঞানীদের তাত্ত্বিক হিসাবের সঙ্গে মিলছিল না। বাতাস না থাকার বিষয়টি তাঁদের জন্য খুব অস্বস্তিকর ছিল। এখন সেই ৫০ বছরের পুরোনো অস্বস্তি কাটল। প্রমাণিত হলো, আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রে থাকা দানবটাও মাঝেমধ্যে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে!
সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান



