মস্তিষ্কের গোপন স্পেসবার: অচেনা ভাষা কেন একাকার শোনায়, বিজ্ঞানীরা জানালেন
মস্তিষ্কের স্পেসবার: অচেনা ভাষা কেন একাকার শোনায়

মস্তিষ্কের গোপন স্পেসবার: অচেনা ভাষা কেন একাকার শোনায়

আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, একটি অচেনা ভাষা শুনলে কেন মনে হয় শব্দগুলো একটানা গরগর করে চলছে, যেন কোনো বিরতি নেই? অথচ বাংলা বা ইংরেজির মতো পরিচিত ভাষায় আমরা সহজেই আলাদা শব্দ শুনতে পাই। বিজ্ঞানীরা এখন বলছেন, এই পার্থক্যের পেছনে রয়েছে আমাদের মস্তিষ্কের এক বিস্ময়কর প্রক্রিয়া, যা একটি গোপন স্পেসবার হিসেবে কাজ করে।

হাই-গামা তরঙ্গ: মস্তিষ্কের অদৃশ্য বিভাজক

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান ফ্রান্সিসকোর স্নায়ুবিজ্ঞানী এডওয়ার্ড চ্যাং এবং তাঁর দল একটি যুগান্তকারী গবেষণা পরিচালনা করেছেন। এই গবেষণা, যা বিশ্বখ্যাত নিউরন ও নেচার জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে, প্রকাশ করে যে মস্তিষ্কে বিদ্যমান হাই-গামা তরঙ্গ শব্দের মধ্যে সীমানা তৈরি করে। এই তরঙ্গগুলো অত্যন্ত দ্রুতগতিতে, সেকেন্ডে প্রায় ৭০ থেকে ১৫০ বার ওঠানামা করে, এবং যখন আমরা কোনো পরিচিত ভাষার শব্দ শুনি, তখন সেই শব্দ শেষ হওয়ার মাত্র ১০০ মিলি-সেকেন্ড পর এই তরঙ্গে একটি উল্লেখযোগ্য পতন ঘটে।

এই পতনটিই মস্তিষ্কের জন্য স্পেসবারের মতো কাজ করে, যা নির্দেশ করে যে একটি শব্দ শেষ হয়েছে এবং নতুনটি শুরু হবে। এডওয়ার্ড চ্যাং ব্যাখ্যা করেন, এই সংকেতটি কেবলমাত্র সেই ব্যক্তির মস্তিষ্কেই সক্রিয় হয়, যারা ওই ভাষায় পারদর্শী। অচেনা ভাষার ক্ষেত্রে এই হাই-গামা তরঙ্গ সঠিকভাবে ওঠানামা করে না, ফলে শব্দগুলো একাকার হয়ে যায় এবং আমরা সেগুলোকে বিরতিহীন বলে অনুভব করি।

ভাষা শেখা: মস্তিষ্কের সংকেত চেনার প্রশিক্ষণ

গবেষকরা ইংরেজি, স্প্যানিশ এবং মান্দারিন ভাষাভাষী ব্যক্তিদের উপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখেছেন, মাতৃভাষায় কথা শোনার সময় মস্তিষ্ক এই হাই-গামা সংকেত নির্ভুলভাবে উৎপন্ন করে। তবে, যখন একই ব্যক্তিকে একটি অচেনা ভাষা শোনানো হয়, তখন এই প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয়। মজার বিষয় হলো, যারা দ্বিভাষী বা একাধিক ভাষায় দক্ষ, তাদের মস্তিষ্ক উভয় ভাষাতেই এই তরঙ্গ সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

এটি নির্দেশ করে যে ভাষা শেখা আসলে মস্তিষ্ককে এই গোপন সংকেত চিনতে এবং ব্যবহার করতে শেখানো। একজন ব্যক্তি যত বেশি একটি ভাষায় দক্ষ হয়, তার মস্তিষ্কের এই সিগন্যাল তত বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই আবিষ্কার পুরোনো ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে, যা মনে করত মস্তিষ্ক ধাপে ধাপে শব্দ প্রক্রিয়া করে: প্রথমে শব্দ, তারপর অর্থ। বরং, চ্যাংয়ের গবেষণা প্রস্তাব করে যে এই প্রক্রিয়াগুলো একই সাথে ঘটে, মস্তিষ্ক শব্দের আওয়াজ প্রক্রিয়া করার সময়ই তা চিনে নেয়।

বিজ্ঞানী সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া এবং ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা

ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির স্নায়ুবিজ্ঞানী এভলিনা ফেডোরেঙ্কো এই গবেষণার প্রশংসা করেন, কিন্তু তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন: মস্তিষ্ক কি শব্দের অর্থ বোঝার কারণে এই বিভাজন করে, নাকি বারবার শুনে শব্দের প্যাটার্ন মুখস্থ করে? তিনি উদাহরণ দেন যে সিনেমায় সাবটাইটেল অন করলে অস্পষ্ট কথাগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যা নির্দেশ করে যে অর্থ জানা থাকলে শব্দ শোনা সহজ হয়।

এই গবেষণা ভাষা প্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, যা কেবল বিজ্ঞানীদের জন্য নয়, সাধারণ মানুষের জন্যও আকর্ষণীয়। এটি ব্যাখ্যা করে কেন আমরা অচেনা ভাষায় কথা বলাকে একটানা মনে করি, এবং কীভাবে আমাদের মস্তিষ্ক প্রতি মুহূর্তে লাখো হিসাব কষে পরিচিত ভাষাকে বুঝতে সাহায্য করে। ভবিষ্যতে, এই জ্ঞান ভাষা শিক্ষা এবং স্নায়ুবিক রোগের চিকিৎসায় প্রয়োগ হতে পারে, যা মানব মস্তিষ্কের জটিলতা আরও গভীরভাবে বুঝতে সহায়তা করবে।