অচেনা জাপানি যুবকের তত্ত্বে বদলে গেল পদার্থবিজ্ঞান
অচেনা জাপানি যুবকের তত্ত্বে বদলে গেল পদার্থবিজ্ঞান

যুবকটির নাম হিদেকি ওগাওয়া। এক অজ্ঞাত, অখ্যাত জাপানি যুবক। বয়স ২৮ বছর। পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক হিসেবে মাত্রই কর্মজীবন শুরু করেছেন। তখনো পিএইচডি শেষ হয়নি। তবু ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত হলো তাঁর লেখা প্রথম গবেষণা প্রবন্ধ। পদার্থবিদেরা সে সময় একটা সমস্যা নিয়ে ভীষণ হিমশিম খাচ্ছেন। সেই সমস্যার দারুণ এক সমাধান রয়েছে হিদেকির ওই প্রবন্ধে। কিন্তু কে এই হিদেকি? কী ছিল তাঁর লেখা প্রবন্ধে?

ইউরোপের অভিজাত ও ডাকসাইটে বিজ্ঞানীদের সামনে তাঁকে উটকোই বলা চলে। উড়ে এসে জুড়ে বসতে চাইছেন যেন। তাঁর কাছে পাওয়া সমাধানটা চমকপ্রদ হলেও ইউরোপের বিজ্ঞানীরা কিন্তু তেমন পাত্তা দিলেন না। তবে সমাধানের তথ্যপ্রমাণের জোরটা ক্রমেই এত বেশি হতে লাগল যে শেষ পর্যন্ত তা মেনে নিতে বাধ্য হন পদার্থবিদেরা। কী ছিল সেই সমাধান?

সেটি বুঝতে হলে ফিরতে হবে একটু পেছনে। ১৯৩০-এর দশকের গোড়ার দিকে পরমাণুর আরও সূক্ষ্ণ ও কার্যকর মডেল প্রণয়ন করেন কোয়ান্টাম তত্ত্বের অগ্রদূতেরা। এই মডেলে বলা হলো, পরমাণুর নিউক্লিয়াসে থাকে ধনাত্মক প্রোটন এবং চার্জহীন নিউট্রন কণা। আর তাদের কেন্দ্র করে ঘুরছে ইলেকট্রন। তবে এই ইলেকট্রন কোয়ান্টায়িত। অর্থাৎ এদের ভৌত মান যা, তা নয়; বরং হতে পারবে শুধু নির্দিষ্ট কিছু মানের। বিজ্ঞানীরা একমত যে মহাবিশ্বের সব পদার্থের ক্ষুদ্রতম একক বা ইট হলো প্রোটন, নিউট্রন ও ইলেকট্রন। অর্থাৎ এরা লেগোর টুকরার মতো। পরস্পরের সঙ্গে বিভিন্ন সজ্জায় টুকরাগুলো জোড়া লেগে ভিন্ন ভিন্ন পদার্থ বা বস্তু গড়ে তোলে এসব কণা।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কিন্তু এখানে তখনো ছোট্ট একটা গোঁজামিল ছিল। প্রোটন ধনাত্মক কণা। চুম্বকের মতোই বৈদ্যুতিকভাবে চার্জিত কণাগুলো একটা আরেকটাকে বিকর্ষণ করে। তাই একটা প্রোটন আরেকটা প্রোটনকে বিকর্ষণ করে। একইভাবে একটা ইলেকট্রন বিকর্ষণ করে আরেকটাকে। তাহলে নিউক্লিয়াসের মধ্যে অনেকগুলো প্রোটন একসঙ্গে গাদাগাদি করে থাকে কীভাবে? সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানে সেটা অসম্ভব।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিটা রেডিয়েশনের রহস্য

সবচেয়ে বড় সমস্যাটা বাধল নিউক্লিয়াস থেকে বেরিয়ে আসা বিটা রেডিয়েশন নিয়ে। তত দিনে জানা গেছে, এর মাধ্যমে একটা নিউট্রন ক্ষয় হয়ে একটা প্রোটন এবং একটা ইলেকট্রনে পরিণত হয়। এটি তখনো বিজ্ঞানীদের কাছে রহস্যময়। কারণ, এ ঘটনা সুস্পষ্ট পদার্থবিজ্ঞানের এক মৌলিক নিয়মের লঙ্ঘন। সেটি শক্তির সংরক্ষণশীলতা বা নিত্যতা নামে পরিচিত।

ব্যাপারটা আবিষ্কার করেছিলেন বিজ্ঞানী রাদারফোর্ড। এ প্রক্রিয়ায় অস্থিতিশীল নিউক্লিয়াস ক্ষয় হয়ে হালকা নিউক্লিয়াসে পরিণত হয়। আর বেরিয়ে আসে ইলেকট্রনের একটা স্রোত। আইনস্টাইনের বিখ্যাত সমীকরণ E=mc2 ব্যবহার করে খুব সহজেই বিটা রেডিয়েশন (বা ক্ষয়) প্রক্রিয়ায় অস্থিতিশীল নিউক্লিয়াসের মোট শক্তি এবং সেটা ক্ষয় হওয়ার পর রূপান্তরিত হালকা নিউক্লিয়াসের শক্তি নির্ণয় করা যায়। তাতে একটা গরমিল রয়ে যায়। শক্তির সংরক্ষণশীলতা অনুসারে, এই দুই নিউক্লিয়াসের শক্তির পার্থক্য হওয়া উচিত বেরিয়ে আসা ইলেকট্রনের মোট শক্তির সমান। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না। দেখা গেল, বিটা রেডিয়েশন প্রক্রিয়ায় শুরুর নিউক্লিয়াস ও পরের নিউক্লিয়াসের শক্তির পার্থক্য বেরিয়ে আসা ইলেকট্রনের মোট শক্তির সমান হচ্ছে না। তার মানে কি শক্তির সংরক্ষণশীলতা লঙ্ঘিত হচ্ছে? পদার্থবিজ্ঞানীদের জন্য ব্যাপারটা ভয়াবহ। কারণ, পদার্থবিজ্ঞান এত দিন যে মৌলিক ভিতের ওপর বেড়ে উঠেছে, এর মাধ্যমে সেই ভিতটাই তো নড়বড়ে হয়ে যায়। তাতে তো আর পায়ের নিচে মাটি থাকে না!

পাউলি ও ফার্মির অবদান

না, শেষ পর্যন্ত পদার্থবিদদের সাধের ভিতটা টিকে গেল। সেটা টিকিয়ে রাখতে দুঃসাহসী এক প্রস্তাব দিলেন ইতালিয়ান বিজ্ঞানী এনরিকো ফার্মি। অবশ্য প্রস্তাবটা প্রথম দিয়েছিলেন অস্ট্রিয়ান পদার্থবিদ উলফগ্যাং পাউলি। তবে তখনো নিউট্রন কণা আবিষ্কৃত হয়নি। তাই বিটা রেডিয়েশন–সংক্রান্ত তাঁর প্রস্তাবটা ছিল অসম্পূর্ণ। কয়েক বছর পর পাউলির বিটা ক্ষয়ের ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে পরিপূর্ণ এক তত্ত্ব হাজির করেন ফার্মি। এতে তিনি নতুন একধরনের বলের কথা প্রস্তাব করেন; দুর্বল নিউক্লিয়ার বল।

পাউলি অনুমান করেছিলেন, ঋণাত্মক চার্জের ইলেকট্রন ছাড়া পরমাণুতে সম্ভবত আরেকটি কণাও আছে, যার কোনো চার্জ নেই, ভরও নগণ্য। এই কণাই হয়তো বিটা ক্ষয় প্রক্রিয়ায় পরমাণু থেকে বেরিয়ে আসে। ফার্মির ব্যাখ্যায় এই কণার কথা বলা হয়েছিল। কণাটির নাম তিনি দেন নিউট্রিনো। নিউক্লিয়াসের প্রোটন ও নিউট্রিনোর মধ্যে একটা নতুন ধরনের দুর্বল মিথস্ক্রিয়ার কথা বলেন তিনি। এর কারণেই ইলেকট্রনের সঙ্গে নিউট্রিনো কণারও নিঃসরণ হয়। আর ক্ষয়ের আগের ও পরের নিউক্লিয়াসের শক্তির যে তফাত, ঠিক প্রয়োজনীয় সেই পরিমাণ শক্তি নিয়ে বেরিয়ে আসে ইলেকট্রন ও নিউট্রিনো। এর মাধ্যমে শক্তির সংরক্ষণশীলতার নিয়মটা বাঁচিয়ে দেন তিনি।

এ বিষয়ে একটা পেপার বিখ্যাত নেচার জার্নালে পাঠান ফার্মি। কিন্তু তাঁর প্রস্তাবটা এত দুঃসাহসী ছিল যে নেচার জার্নাল কর্তৃপক্ষ বিশ্বাস করে উঠতে পারেনি। তাই সেগুলো ছাপাতেও রাজি হয়নি। অনেক পরে অবশ্য এই সিদ্ধান্তকে নিজেদের বড় ভুল বলে উল্লেখ করেন জার্নালটির সম্পাদক। ১৯৩৩ ও ১৯৩৪ সালে ইতালিয়ান জার্নাল লা রিসারকা সায়েন্টিফিকা, ইল ন্যুভু সিমেন্তো এবং জার্মান জার্নাল জেইশিফট ফুর ফিজিক-এ পেপারগুলো প্রকাশ করেন ফার্মি। তিনি এসব পেপারে বিটা ক্ষয়ের ব্যাখ্যার রূপরেখা পেশ করেন।

ফার্মির তত্ত্বটা পদার্থবিদদের মনে ধরল। কিন্তু নিউট্রিনো কণা কেউই কখনো দেখেনি। কণাটার অস্তিত্ব যদি সত্যিই থাকে, তাহলে মৌলিক কণাদের মধ্যে এর অবস্থান কোথায়? আবার এ সমস্যার সমাধান কখনো হলেও আরেকটা সমস্যা রয়েই যায়। পরমাণুর নিউক্লিয়াসে প্রোটন ও নিউট্রন কণাদের একত্রে ধরে রাখার জন্য দুর্বল বল যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। তাহলে সে রকম শক্তিশালী বল কোথায়? কাজেই পরমাণুর সুদৃঢ় গাঁথুনির জন্য আরও পরিপূর্ণ মডেল দরকার। কোথায় পাব তারে?

ঠিক এ সময় দারুণ এক সমাধান দিয়ে পদার্থবিদদের তাক লাগিয়ে দেন ওই অজ্ঞাত-অখ্যাত হিদেকি ওগাওয়া।

হিদেকি ইউকাওয়ার জীবন

হিদেকির জন্ম জাপানের টোকিওতে, ১৯০৭ সালের ২৩ জানুয়ারি। বেড়ে উঠেছেন কিয়োটো শহরে। তিনি ছিলেন পরিবারের সাত সন্তানের মধ্যে তৃতীয়। ছোটবেলায় অন্য সন্তানদের মধ্যে হিদেকিকে মোটেও মেধাবী বলে মনে করেননি তাঁর বাবা। তবে হিদেকির মেধার আঁচ পান তাঁর স্কুলের প্রিন্সিপাল। একবার একটা উপপাদ্যকে প্রচলিত নিয়মের বাইরে ভিন্নভাবে প্রমাণ করেন হিদেকি। তাঁর এই গাণিতিক দক্ষতায় মুগ্ধ হন প্রিন্সিপাল। হিদেকির মধ্যে ভালো সম্ভাবনা দেখতে পান তিনি। শিক্ষকের উৎসাহে বড় হয়ে গণিতবিদ হওয়ার স্বপ্ন দেখেন হিদেকি।

ছেলের ওপর হতাশ হয়ে তাঁর বাবা যখন তাঁকে টেকনিক্যাল স্কুলে ভর্তি করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন এগিয়ে আসেন ওই প্রিন্সিপাল। তিনি হিদেকিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর পরামর্শ দেন। এমনকি প্রয়োজনে তাঁকে দত্তক নেওয়ার প্রস্তাবও দেন। শেষমেশ নমনীয় হন হিদেকির বাবা। ১৯২৯ সালে কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন হিদেকি। এ সময় তিনি তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে কণাপদার্থবিজ্ঞানে।

তিন বছর পর হিদেকি বিয়ে করেন সুমি ইউকাওয়াকে। ফলে জাপানি রীতি অনুযায়ী তাঁর পদবি বদলে যায়। হিদেকি ওগাওয়া থেকে হিদেকি ইউকাওয়াতে পরিণত হন তিনি। ১৯৩৩ সালে ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক হওয়ার প্রস্তাব পান। দ্রুতই সাড়া দেন এতে। কারণ, এতে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করতে পারবেন বলে মনে করেছিলেন তিনি। দুই বছর পর, মানে ১৯৩৫ সালে নিজের জীবনের সেরা কাজটি করেন হিদেকি। এ সময় পদার্থবিজ্ঞানের সেকালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং সমস্যাটা নিয়ে কাজ করছেন কোয়ান্টাম তত্ত্বের কজন দিকপাল। এঁদের মধ্যে রয়েছেন পাউলি, হাইজেনবার্গ, ফার্মিসহ অনেকে। সমস্যাটা অচিরেই বুঝতে পারেন হিদেকি।

শক্তিশালী পারমাণবিক বলের তত্ত্ব

পরমাণুর নিউক্লিয়াসে প্রোটন আর নিউট্রন কীভাবে গাদাগাদি হয়ে একত্রে থাকে, সেটা কেউ বুঝতে পারছেন না। প্রোটনের চার্জ ধনাত্মক। নিউক্লিয়াসের মধ্যে আরেকটা ধনাত্মক প্রোটনের সঙ্গে থাকলে স্বাভাবিক ধর্ম অনুযায়ী, তাদের মধ্যে বৈদ্যুতিক বিকর্ষণ ঘটার কথা। চুম্বকের একই মেরু যেমন পরস্পরকে বিকর্ষণ করে, অনেকটা সে রকম। তা–ই যদি হয়, তাহলে পরমাণুর নিউক্লিয়াস গঠিত হওয়ার কথা নয়; কিন্তু পরমাণু যে বহাল তবিয়তে টিকে আছে, তার চাক্ষুষ প্রমাণ আমি-আপনি, চারপাশের বস্তুজগৎ, পৃথিবী, মহাবিশ্বসহ সবকিছু। তাহলে রহস্যটা কী?

রহস্যটা নিয়ে গবেষণা চালিয়ে একটা তত্ত্ব প্রস্তাব করলেন হিদেকি। তাঁর তত্ত্বমতে, পরমাণুর নিউক্লিয়াসে নতুন ধরনের শক্তিশালী একটা মিথস্ক্রিয়া ঘটে। একে তিনি বললেন, শক্তিশালী পারমাণবিক বল বা স্ট্রং নিউক্লিয়ার ফোর্স। তাঁর হিসাবে, নিউক্লিয়াসের ভেতর এই বলের শক্তি বিকর্ষণধর্মী বৈদ্যুতিক বলের চেয়ে ১০০ গুণ বেশি। কিন্তু নিউক্লিয়াসের বাইরে এই বল দুর্বল। তাই তেমন গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রভাব দেখা যায় না।

এই শক্তিশালী বলের চরিত্র হিসাব কষে গাণিতিকভাবে দেখান হিদেকি। সে জন্য ব্যবহার করেন বিশেষ আপেক্ষিকতা ও কোয়ান্টাম তত্ত্বের সূত্রগুলো। এখানেই শেষ নয়। আরও এক ধাপ এগিয়ে তিনি অনুমান করেন, শক্তিশালী বলের জন্য কোনো বলবাহী কণা থাকতে পারে। অর্থাৎ বলবাহী কণাটি কাজ করে বাহক হিসেবে। প্রোটন ও নিউট্রনের মধ্যে বল বহন করে। ফোটন যেমন বিদ্যুৎ–চুম্বকীয় বলের বাহক, সে রকম। আবার সেই বিশেষ কণার চরিত্র কেমন হবে, তা–ও হিসাব করে বের করেন তিনি। কোয়ান্টাম তত্ত্ব এবং আপেক্ষিকতা সমীকরণের সমন্বয়ে কণাটির সম্ভাব্য ভরও নির্ণয় করেন। তিনি অনুমান করলেন, কণাটির ভর প্রোটনের চেয়ে কম, কিন্তু ইলেকট্রনের চেয়ে প্রায় ৩০০ গুণ বেশি। মানে প্রোটন ও ইলেকট্রনের মাঝামাঝি একটা ভর। পরে কণাটির নামকরণ করা হলো মেসন (Meson)। গ্রিক শব্দ ‘মেসো’ (meso) অর্থ ‘মাঝারি’। ভর প্রোটন ও ইলেকট্রনের মাঝামাঝি বলেই এমন নাম।

১৯৩৫ সালে শক্তিশালী পারমাণবিক বলের নতুন মডেল এবং নতুন কণা সম্পর্কে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করলেন হিদেকি। সেটা লেখা হয়েছিল বেশ স্পষ্টভাবে। সেটাই তাঁর প্রথম গবেষণাপত্র। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, সেটা যেন কারও নজরই কাড়ল না। একরকম অবহেলায় পড়ে রইল জার্নালের পাতায়। সম্ভবত এর কারণ, বিজ্ঞান সমাজে হিদেকিকে উটকো ভেবেছিলেন অন্য বিজ্ঞানীরা। কোথাকার কোন অচেনা জাপানি যুবক এমন জটিল সমস্যার সমাধান দিতে পারবে, সে কথা কেউ বিশ্বাসই করতে পারেননি। অনেকটা যেন হাতি-ঘোড়া গেল তল, ভেড়া বলে কত জলের মতো ব্যাপার। তাই তাঁর তত্ত্বটার দিকেও তেমন নজর দেয়নি কেউ। তবে তত্ত্ব আর ভবিষ্যদ্বাণী ঠিক থাকলে অখ্যাত-অজ্ঞাত কারও গবেষণাও শেষ পর্যন্ত বৃথা যায় না। বিজ্ঞানের ইতিহাসে তার প্রমাণ ভূরি ভূরি। হিদেকির মডেলটাও একসময় আলোচনার ঝড় তুলল বিজ্ঞানীদের ভেতর। তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী করা মেসন নামের নতুন কণাটি খোঁজার পরিকল্পনাও করলেন অনেকে। এই অগ্নিপরীক্ষায় পাস করতে পারলেই জাতে উঠবেন হিদেকি ও তাঁর পরমাণু মডেল।

মেসন কণার ভর প্রোটনের চেয়ে কম হলেও তা যথেষ্ট ভারী। কারণ, ইলেকট্রনের চেয়ে মেসন প্রায় ৩০০ গুণ ভারী। আইনস্টাইনের E=mc2 সূত্র অনুসারে, বেশি ভর বেশি শক্তির সমতুল্য। গবেষণাগারে এ রকম ভারী কণা তৈরি করতে অনেক শক্তি দরকার। সেটা সে যুগের জন্য বেশ কঠিন ও সময়সাপেক্ষ ছিল। কাজেই বাকি থাকে আর একটিমাত্র বিকল্প। প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় উচ্চশক্তিতে উৎপন্ন কণাদের মধ্যে তা খোঁজার চেষ্টা করে দেখা। সেখানেই হয়তো মিলতে পারে সঠিক উত্তর। সেখানেই নির্ধারিত হবে হিদেকি ও তাঁর মডেলের ভাগ্য।

মহাজাগতিক রশ্মির আবিষ্কার

হিদেকির প্রবন্ধ প্রকাশিত হওয়ার প্রায় ২৩ বছর আগের কথা। ১৯১২ সাল। অস্ট্রিয়ান পদার্থবিদ ভিক্টর হেস ফ্রান্সিস জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রোমাঞ্চকর একটা আবিষ্কার করেন। উচ্চশক্তির বিকিরণ শনাক্ত করার জন্য তিনি খুব সংবেদনশীল একটা ডিটেক্টর তৈরি করেন। এরপর বেলুনে চেপে রওনা দেন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে। পরীক্ষায় দেখতে পান, শুরুতে উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিকিরণের মাত্রা কমে। কিন্তু ভূপৃষ্ঠ থেকে পাঁচ কিলোমিটার ওপরে ঝট করে বিকিরণের মাত্রা বেড়ে যায় ব্যাপকভাবে। তিনি নিশ্চিত হলেন, এ বিকিরণ অবশ্যই পৃথিবী থেকে আসছে না। তাহলে আসছে কোথা থেকে?

এটা বোঝার জন্য সূর্যগ্রহণের সময়ও বেলুনে চেপে আকাশে ওঠেন ভিক্টর হেস ফ্রান্সিস। ইলেকট্রোস্কোপ বিকিরণ মাপেন। হিসাবমতো, সূর্যগ্রহণের সময় সূর্য থেকে আসা বিকিরণ চাঁদে বাধা পাওয়ার কথা। কাজেই এর উৎস যদি সূর্য হয়ে থাকে, তাহলে বিকিরণের মাত্রা কম হওয়ার কথা। কিন্তু বিকিরণের মাত্রা মেপে বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেলেন হেস। পরিমাপে বিকিরণের তীব্রতার কোনো হেরফের পাওয়া গেল না। কাজেই এ বিকিরণ অবশ্যই সূর্য থেকে আসছে না। তাহলে আসছে কোথা থেকে?

যৌক্তিকভাবে হেস সিদ্ধান্তে এলেন, এসব বিকিরণ যদি সূর্য থেকে না এসে থাকে, তাহলে অবশ্যই বাইরের গভীর মহাকাশ থেকে আসছে। এই মহাজাগতিক রশ্মির রহস্যের সমাধান না হলেও আরও বিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে গবেষণায় আগ্রহী হন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মার্কিন বিজ্ঞানী রবার্ট মিলিকান। তিনিও একই ফলাফল পেলেন। মিলিকানই এই বিকিরণের নামকরণ করেন ‘কসমিক রে’, বাংলায় আমরা যাকে বলি ‘মহাজাগতিক বিকিরণ’ বা ‘মহাজাগতিক রশ্মি’।

হিদেকির প্রস্তাবিত মেসন কণা তৈরির জন্য এই রশ্মিতে যথেষ্ট শক্তি আছে। মহাকাশ থেকে সজোরে ছুটে আসা মহাজাগতিক রশ্মি যখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে ধাক্কা খায়, তখন মেসন কণা তৈরি হতে পারে। এর কারণটা আইনস্টাইনের বিখ্যাত ভর-শক্তির সমীকরণ থেকে ততদিনে জানা হয়ে গেছে—শক্তি রূপান্তরিত হয়ে বস্তুতে পরিণত হতে পারে। কাজেই উচ্চশক্তির মহাজাগতিক রশ্মি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে মেসন কণার মতো নতুন বস্তুতে রূপান্তরিত হতে পারে, তা বিজ্ঞানীরা জানেন, বোঝেন।

ক্যালটেকে মিলিকানের অধীনে পোস্টডক্টরাল গবেষক দলে তখন ছিলেন কার্ল ডেভিড অ্যান্ডারসন নামের এক তরুণ। মিলিকানের পরামর্শে তখন মহাজাগতিক রশ্মি নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছেন অ্যান্ডারসন। উপপারমাণবিক কণা শনাক্ত করতে ব্যবহার করা হতো ক্লাউড চেম্বার। এ ধরনের একটা ডিটেক্টরের কিছুটা উন্নত সংস্করণ বানিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। এতে একটা পাত্রে থাকত পানির বাষ্প ও গ্যাসের মিশ্রণ। উচ্চশক্তির কোনো কণার সঙ্গে এই পাত্রের গ্যাস মিশ্রণের সংঘর্ষ ঘটলে কণাটির গতিপথে একটা ঘনীভূত পানির ফোঁটা দেখা যায়। অ্যান্ডারসনের ক্লাউড চেম্বারে কণার গতিপথের তুলনামূলক ভালো ছবি তোলা যেত। শুধু তা–ই নয়, চার্জিত কণাটির গতিপথ একটা চুম্বকের কারণে কতটুকু বেঁকে যায়, তা–ও নির্ণয় করা যেত। অ্যান্ডারসন দেখতে পান, মহাজাগতিক কণা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে আঘাত করলে একই সঙ্গে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক কণার ফোয়ারার সৃষ্টি হয়। ১৯৩২ সালে তাঁর তোলা একটা ছবিতে একটা অপ্রত্যাশিত ব্যাপার দেখা গেল। ঋণাত্মক চার্জের ইলেকট্রনের সমান ভরের একটা কণা, কিন্তু ঋণাত্মক চার্জ হিসেবে কণাটির যেদিকে যাওয়ার কথা, ওটার গতিপথ তার উল্টো দিকে। এর সোজা মানে হলো, ইলেকট্রনের সমান ভরের ওই কণার চার্জ ধনাত্মক।

সেটাই ছিল প্রথম কোনো প্রতিকণা বা পজিট্রন পর্যবেক্ষণ। এ কণার কথা আগেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন পল ডিরাক। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য ১৯৩৬ সালে ভিক্টর ফ্রান্সিস হেসের সঙ্গে যৌথভাবে নোবেল পান অ্যান্ডারসন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ৩১ বছর। একই বয়সে ১৯৩৩ সালে নোবেল পান পল ডিরাকও; রিলেটিভিস্টিক কোয়ান্টাম তত্ত্ব প্রণয়ন এবং পজিট্রন কণার অস্তিত্ব অনুমানের জন্য।

অবশ্য অ্যান্ডারসনের বানানো ক্লাউড চেম্বার আরও কিছু চমক দেখানোর অপেক্ষায় ছিল। ১৯৩৬ সালে অ্যান্ডারসন ও তাঁর গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থী সেথ নেড্ডারমেয়ার ক্লাউড চেম্বারে আরেকটা অদ্ভুত কণার গতিপথ খেয়াল করেন। তাঁদের হিসাব–নিকাশে দেখা গেল, কণাটি ইলেকট্রনের চেয়ে প্রায় ২০৭ গুণ ভারী। চার্জ ঋণাত্মক। এক বছর আগে হিদেকি ইউকাওয়া শক্তিশালী পারমাণবিক বলের জন্য যে মেসন কণার কথা অনুমান করেছিলেন, প্রায় তার কাছাকাছি। ব্যাপারটা জানতে পেরে অচিরেই নেচার জার্নালে একটা নোট পাঠালেন হিদেকি। নোটে উল্লেখ করলেন, এই কণা তাঁর প্রস্তাবিত মেসন কণা হতে পারে। কিন্তু তাঁর চিঠিটা প্রত্যাখ্যান করলেন নেচার জার্নালের সম্পাদক। তাতে হাল ছাড়লেন না হিদেকি। প্রসিডিং অব দ্য ফিজিকো-ম্যাথামেটিক্যাল সোসাইটি অব জাপান জার্নালে ১৯৩৭ সালে নোটটি প্রকাশ করেন তিনি।

শুধু অ্যান্ডারসনই নন, আরও অনেক গবেষকই প্রায় একই সময় একই ভরের কণা শনাক্ত করতে শুরু করেছিলেন। ফলে হুট করেই হিদেকি ও তাঁর পরমাণুর শক্তিশালী বলের মডেলটা অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে শুরু করল। আসলে সেটা তাঁর প্রাপ্যই ছিল। কিন্তু কিছু অসংগতি ছিল এখানে। যে কণা শনাক্ত বা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল, তার ভরের সঙ্গে হিদেকির মেসন কণার ভরের কিছুটা তফাত ছিল। শুধু তা–ই নয়, প্রায় দশ বছর পর জানা গেল আরেকটি বাজে ব্যাপার। ১৯৪৬ সালে পরীক্ষায় ধরা পড়ল, ওই কণা নিউট্রন বা প্রোটনের সঙ্গে জোরালোভাবে মিথস্ক্রিয়া করে না। কাজেই সেটা কোনোভাবেই হিদেকির অনুমিত মেসন কণা হতে পারে না।

এদিকে তত দিনে প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে উচ্চশক্তির কণা অনুসন্ধানে নতুন পদ্ধতির প্রয়োগ করতে শুরু করেছেন বিজ্ঞানীরা। এ রকমই একটা ডিটেক্টর বসানো হয়েছিল ভিয়েনার রেডিয়াম ইনস্টিটিউটে। সেখানে কর্মরত তরুণ বিজ্ঞানী মেরিয়েটা ব্লাও এমন একটা ডিটেক্টর ব্যবহার করছিলেন, যেটা দিয়ে ফটোগ্রাফিক ফিল্মে সরাসরি কণার গতিপথ রেকর্ড করা যায়।

ভারতেও দেবেন্দ্র মোহন বোস ও বিভা চৌধুরী ফটোগ্রাফিক পদ্ধতি ব্যবহার করে বায়ুমণ্ডলের কণা শনাক্ত করার নতুন একটা পদ্ধতি ডিজাইন করেছিলেন। ১৯৪০ সালের গোড়ার দিকে এ বিষয়ে নেচার জার্নালে চারটি পেপার প্রকাশ করেন তাঁরা। এই দুই ভারতীয় বিজ্ঞানী এমন একটা কণা শনাক্ত করার কথা জানান, যেটা হিদেকির অনুমিত মেসন কণা হতে পারে। কিন্তু তত দিনে ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আড়ালে প্রায় সবকিছু চাপা পড়ে গেছে। এ গুরুত্বপূর্ণ খবরও বাদ গেল না। আবার যুদ্ধের কারণে এ গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু উপকরণও সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে দাঁড়াল। তাতে গবেষণায়ও ভাটা পড়ল। তাই হিদেকির মেসন রহস্যই থেকে যায় আরও কিছুদিন।

সেই বিশ্বযুদ্ধ শেষে, ব্রিটিশ পদার্থবিদ সিসিল পোয়েল আর তাঁর সহকর্মীরা শেষ পর্যন্ত সমাধান করেন এ রহস্যের। ১৯৪৭ সালে বেশ কিছু পর্যবেক্ষণে তাঁরা দেখতে পান, মাঝারি ভরের দুই ধরনের কণা রয়েছে। এর মধ্যে একটার কথা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন হিদেকি। অন্যটি হালকা ভরের লেপটন কণা। পরে এর নাম দেওয়া হয় মিউয়ন। এই কণা শনাক্ত করা হয়েছিল ভূপৃষ্ঠের কাছে। হিদেকির অনুমান করা কণাটিকে এখন বলা হয় পাই মেসন বা পায়ন। এটি পাওয়া যায় বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে। এভাবেই ইউরোপ-আমেরিকার বিজ্ঞানী সমাজে স্বীকৃতি পান হিদেকি। এর দুই বছর পর, ১৯৪৯ সালে প্রথম জাপানি হিসেবে নোবেল পুরস্কার পান তিনি। আরও দুই বছর পর নোবেল পান সিসিল পোয়েল। ফটোগ্রাফিক পদ্ধতির উন্নয়ন এবং পায়ন কণা আবিষ্কারের স্বীকৃতি ছিল এ পুরস্কার।

হিদেকির শক্তিশালী পারমাণবিক বলের মডেল থেকে ভবিষ্যদ্বাণী করা পাই মেসন বা পায়ন কণা আবিষ্কারকে একটা বড় ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে পরের দশকে আরও গবেষণার সূত্রে মেসন থিওরিকে আর মৌলিক হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। বরং কণাপদার্থের জন্য এখন সর্বেসর্বা হলো স্ট্যান্ডার্ড মডেল। তবে হিদেকির মেসন বিনিময়ের ধারণাটি এখনো ব্যবহৃত হয় পদার্থবিজ্ঞানে।

সূত্র: ক্লুস টু দ্য কসমস/ সোহিনি ঘোষ; অ্যাটম: জার্নি অ্যাক্রস দ্য সাবঅ্যাটমিক কসমস/ আইজ্যাক আসিমভ; দ্য গ্রেট আননোন/ মার্কাস দ্যু স্যাটই; উইকিপিডিয়া