ব্যাবিলনীয় জ্যোতির্বিদ্যা: মাটির ফলকে আকাশের ভাষা
ব্যাবিলনীয় জ্যোতির্বিদ্যা: মাটির ফলকে আকাশের ভাষা

প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগের কথা। মেসোপটেমিয়া—বর্তমান ইরাক অঞ্চলের এক শান্ত রাত। দজলা ও ফোরাত নদীর মাঝের উর্বর ভূখণ্ডে এক উঁচু মন্দিরচূড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন এক তরুণ পণ্ডিত। তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ আকাশের নক্ষত্ররাজির দিকে। টেলিস্কোপ নেই, কম্পিউটার নেই, নেই আধুনিক মানমন্দিরের যন্ত্রপাতি। তবু তাঁর হাতে থাকা কাদামাটির ফলকে লিপিবদ্ধ হচ্ছে চাঁদ, সূর্য ও গ্রহদের গতিপথের সূক্ষ্ম হিসাব। সেই তরুণ পণ্ডিত হয়তো জানতেন না, তাঁর সেই মাটির ফলকে লেখা সংখ্যাগুলো হাজার বছর পর মানবসভ্যতার বৈজ্ঞানিক ইতিহাসে অমূল্য সম্পদ হয়ে উঠবে।

আকাশের ভাষা যখন মাটির ফলকে

ব্যাবিলনীয় সভ্যতায় আকাশ শুধু সৌন্দর্যের বিষয় ছিল না; ছিল সময়, কৃষি, ধর্মীয় আচার ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের পথনির্দেশক। তারা বিশ্বাস করত, আকাশের ঘটনাবলির মধ্যে ভবিষ্যতের সংকেত লুকিয়ে আছে। কিন্তু সেই বিশ্বাসের আড়ালে ছিল বিস্ময়কর পর্যবেক্ষণশক্তি ও নিয়মতান্ত্রিক গণনা। তাদের সংরক্ষিত বহু কাদার ফলকের মধ্যে ‘এনিউমা আনু এনলিল’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এতে চন্দ্রগ্রহণ, সূর্যগ্রহণ, গ্রহের উদয়-অস্ত, ঋতু পরিবর্তনসহ নানা আকাশীয় ঘটনার বিস্তারিত নথি পাওয়া যায়। আজকের বিজ্ঞানীরাও এসব তথ্য দেখে বিস্মিত হন। কারণ, এত প্রাচীন যুগে এত ধারাবাহিক তথ্য সংগ্রহ বিরল ঘটনা।

ব্যাবিলনীয় সংখ্যা পদ্ধতি

দীর্ঘদিন মনে করা হতো, আকাশে গ্রহের গতিপথ ব্যাখ্যায় উন্নত জ্যামিতিক পদ্ধতির সূচনা হয়েছিল অনেক পরে, ইউরোপে। কিন্তু আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যাবিলনীয় জ্যোতির্বিদেরা বৃহস্পতি গ্রহের অবস্থান নির্ণয়ে এমন কিছু পদ্ধতি ব্যবহার করতেন, যেখানে সময় ও গতির সম্পর্ককে জ্যামিতিক আকারে বোঝানো হয়েছে। বিশেষত তারা একটি ট্রাপিজয়েড (সমান্তর চতুর্ভুজসদৃশ ক্ষেত্র) ব্যবহার করে বৃহস্পতির গতির হিসাব করত। এটি আধুনিক গণিতের area under a graph ধারণার সঙ্গে বিস্ময়কর মিল রাখে। যদিও এটি পূর্ণাঙ্গ ক্যালকুলাস নয়, তবু বলা যায়, গাণিতিক চিন্তার ইতিহাসে এটি ছিল অত্যন্ত অগ্রসর পদক্ষেপ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্লিম্পটন ৩২২: সংখ্যার রহস্যময় ফলক

বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত ব্যাবিলনীয় ফলকগুলোর একটি হলো Plimpton 322। বর্তমানে এটি যুক্তরাষ্ট্রে সংরক্ষিত। এ ফলকে এমন সব সংখ্যা রয়েছে, যা আধুনিক গণিতবিদদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে বহুদিন ধরে। অনেক গবেষকের মতে, এতে এমন সংখ্যার তালিকা আছে যা পিথাগোরাসের উপপাদ্যের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। আবার কেউ কেউ মনে করেন, এটি ত্রিভুজসম্পর্কিত সমস্যার ব্যবহারিক সারণি। কিছু গবেষক একে প্রাচীন ত্রিকোণমিতিক চিন্তার পূর্বসূরি বলেও মনে করেন। অর্থাৎ ব্যাবিলনীয়রা যে ত্রিভুজ, অনুপাত ও জ্যামিতিক সম্পর্ক নিয়ে গভীরভাবে কাজ করেছিল, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

কেন ৩৬০ ডিগ্রি? কেন ৬০ মিনিট?

আমরা বৃত্তকে ৩৬০ ডিগ্রিতে ভাগ করি কেন? এক ঘণ্টায় ৬০ মিনিটই বা কেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ব্যাবিলনীয়দের ষাটভিত্তিক সংখ্যা পদ্ধতিতে (Sexagesimal System)। তারা গণনায় ৬০-কে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করত। ৬০ সংখ্যাটি বহু সংখ্যায় বিভাজ্য হওয়ায় ভগ্নাংশ ও পরিমাপে এটি ছিল অত্যন্ত সুবিধাজনক। এ পদ্ধতির প্রভাব আজও টিকে আছে—১ ঘণ্টা = ৬০ মিনিট, ১ মিনিট = ৬০ সেকেন্ড, পূর্ণ বৃত্ত = ৩৬০ ডিগ্রি। অর্থাৎ আমাদের ঘড়ির কাঁটা ও জ্যামিতির ভাষায় আজও বেঁচে আছে ব্যাবিলনীয় মেধা।

গ্রহণের পুনরাবৃত্তি ও সারোস চক্র

সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণ যে নির্দিষ্ট সময় পরপর ফিরে আসে, তা প্রাচীন জ্যোতির্বিদদের কাছে ছিল বিস্ময়কর বিষয়। ব্যাবিলনীয়রা দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এমন এক পুনরাবৃত্তিমূলক চক্র শনাক্ত করেছিল, যা পরে Saros Cycle নামে পরিচিত হয়। প্রায় ১৮ বছর ১১ দিন পর অনুরূপ গ্রহণের ঘটনা ফিরে আসে, এ ধারণা জ্যোতির্বিদ্যার ইতিহাসে এক অসাধারণ অর্জন।

রাশিচক্র ও আকাশ মানচিত্র

আজকের ১২ রাশিভিত্তিক zodiac পদ্ধতির প্রাচীন রূপও ব্যাবিলনীয়দের কাছেই পাওয়া যায়। তারা আকাশপথকে কয়েকটি নির্দিষ্ট অংশে ভাগ করে নক্ষত্রপুঞ্জের অবস্থান বোঝার সুবিধা তৈরি করেছিল। যদিও পরবর্তী সময়ে গ্রিক ও অন্যান্য সভ্যতা এ পদ্ধতিকে আরও বিস্তৃত ও জনপ্রিয় করে তোলে; তবু এর শিকড় খুঁজতে গেলে ব্যাবিলনের নাম এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

জ্ঞানযাত্রার সেতুবন্ধন

ব্যাবিলনীয় জ্যোতির্বিদ্যার প্রভাব পরে গ্রিক পণ্ডিতদের গবেষণায় পৌঁছায়। সেখান থেকে মধ্যযুগের আরব-মুসলিম জ্যোতির্বিদেরা তাকে আরও উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যান। পরবর্তীকালে ইউরোপীয় নবজাগরণেও এসব জ্ঞানের দীর্ঘ প্রতিধ্বনি শোনা যায়। অর্থাৎ আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যা এক দিনে জন্ম নেয়নি; এটি বহু সভ্যতার সম্মিলিত উত্তরাধিকার। সেই ধারাবাহিকতার এক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ ছিল ব্যাবিলন।

মহাকাশের প্রথম নথিকারক

ব্যাবিলনীয় জ্যোতির্বিদেরা হয়তো মহাকাশযান বানাননি, দুরবিনও আবিষ্কার করেননি। কিন্তু তাঁরা আকাশকে নিয়মের চোখে দেখতে শিখেছিলেন। তাঁরা প্রশ্ন করেছিলেন, হিসাব করেছিলেন, নথি রেখেছিলেন। আর বিজ্ঞানের সূচনা তো সেখানেই, যখন মানুষ বিস্ময়কে ভয় না পেয়ে, বুঝতে চায়। আজ আমরা স্যাটেলাইট পাঠাই, গ্রহের ছবি তুলি, দূর নক্ষত্রের সংকেত ধরি। কিন্তু এ দীর্ঘ যাত্রার আদিপর্বে দাঁড়িয়ে ছিলেন কিছু নীরব মানুষ—মাটির ফলক হাতে, আকাশের দিকে তাকিয়ে।

একনজরে ব্যাবিলনীয়দের ৫টি অবিস্মরণীয় অবদান

  • এক. ৬০-ভিত্তিক সংখ্যাপদ্ধতি: সময় ও কোণ পরিমাপের আধুনিক ব্যবস্থার ভিত্তি।
  • দুই. গ্রহণ পূর্বাভাসের ধারা: দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সারোস চক্র শনাক্তকরণ।
  • তিন. ধারাবাহিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক নথি: চাঁদ, সূর্য ও গ্রহের গতিবিধির নিয়মিত রেকর্ড।
  • চার. জ্যামিতিক গণনার প্রয়োগ: গ্রহের গতি বিশ্লেষণে উন্নত গণনাপদ্ধতির ব্যবহার।
  • পাঁচ. রাশিচক্রের প্রাচীন কাঠামো: আকাশপথকে ভাগ করে নক্ষত্রের অবস্থান নির্ধারণের পদ্ধতি।