আমার কন্যা একের পর এক প্রশ্ন করে মাথা খারাপ করে দেয়। চিচিঙ্গা কেন খেতেই হবে? কেন এটা পুষ্টিকর? এই পুষ্টি উপাদানগুলো কেন থাকে? ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ে কেন থাকে না? চায়ে কি পুষ্টি থাকে? কখনো কি ভেবেছেন, আমরা এত প্রশ্ন করি কেন? এটা কী? কেন হলো? এরপর কী হবে?—এই প্রশ্নগুলোই যেন মানুষের স্বভাব। কৌতূহল আমাদের এমন এক বৈশিষ্ট্য, যা আমাদের অন্য প্রাণীদের থেকে আলাদা করে। কিন্তু এই কৌতূহল আসলে কোথা থেকে আসে? কেনই-বা আমরা এত জানতে চাই?
কৌতূহলের সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ
বিজ্ঞানীরা কৌতূহলকে নির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারেননি। তবে সহজ ও সাধারণভাবে কৌতূহল হলো নতুন তথ্য জানার ও বোঝার তাগিদ। এটি এমন একটি মানসিক প্রবণতা, যা আমাদের জানার ইচ্ছা থেকে চালিত হয়। একটি শিশু যদি কৌতূহলী না হতো, তাহলে সে কিছুই শিখতে পারত না। শিশুরা নতুন জিনিসের প্রতি স্বাভাবিকভাবেই আকৃষ্ট হয়। তারা নতুন খেলনা, নতুন শব্দ, নতুন মুখ—সবকিছু নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। নতুন কিছু খোঁজার এই প্রবণতাকেই বলা হয় পারসেপচুয়াল কিউরিওসিটি। এটাই শেখার ভিত্তি তৈরি করে।
মানুষের ক্ষেত্রে কৌতূহল আরও এক ধাপে এগিয়ে যায়। একে বলা হয় এপিস্টেমিক কিউরিওসিটি। এটি শুধু নতুন কিছু দেখা নয়, বরং কেন হচ্ছে, কীভাবে কাজ করে, এর পেছনের ব্যাখ্যা কী—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার ইচ্ছাই হলো এপিস্টেমিক কিউরিওসিটি। এ ধরনের কৌতূহলই মানুষকে প্রযুক্তি আবিষ্কার, বিজ্ঞানের উন্নয়ন এবং নতুন নতুন ধারণা তৈরি করতে সাহায্য করেছে।
কৌতূহল কেন দরকার
প্রাচীন মানুষের জন্য কৌতূহল ছিল বেঁচে থাকার বড় হাতিয়ার। যেমন, নতুন খাবার কোথায় পাওয়া যাবে, কোন জায়গা নিরাপদ বা কীভাবে শিকার করা যায়—এসব জানার জন্য কৌতূহলই তাদের সাহায্য করেছিল। যারা বেশি কৌতূহলী ছিল, তারা নতুন কিছু আবিষ্কার করে টিকে থাকতে পেরেছে। এভাবেই কৌতূহল আমাদের পরিবর্তনের অংশ হয়ে গেছে।
মস্তিষ্ক কেন কৌতূহল পছন্দ করে
কৌতূহল শুধু মানসিক বিষয় নয়, এটি মস্তিষ্কের সঙ্গেও জড়িত। আমরা যখন নতুন কিছু জানতে চাই, তখন প্রথম ধাপে মস্তিষ্কে একধরনের অপূর্ণতার মতো অনুভূতি তৈরি হয়। মস্তিষ্ক ওই বিষয়টি জেনে তা সাময়িকভাবে পূর্ণতার অনুভূতির মাধ্যমে প্রতিস্থাপিত করতে চায়। তারপর শেখার অংশ সক্রিয় হয়। নতুন কিছু জানলে মস্তিষ্ক থেকে ডোপামিন নিঃসৃত হয়। এই কারণেই নতুন কিছু জানলে আমাদের ভালো লাগে এবং আমরা বারবার তা জানতে চাই।
কৌতূহল সব সময় নিরাপদ নয়
কৌতূহল আমাদের তথা মানবসভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে গেলেও কখনো কখনো এটি ঝুঁকির কারণও হতে পারে। নতুন কিছু চেষ্টা করতে গিয়ে ব্যর্থতা, ভুল বা বিপদও আসতে পারে। তবু এই ঝুঁকিই আমাদের শেখার ও উন্নতির অংশ।
কৌতূহলই মানুষকে মানুষ বানিয়েছে। এটাই আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায়, পৃথিবীকে আরও ভালোভাবে বুঝতে ও নতুন কিছু আবিষ্কার করতে সাহায্য করে। শেষ পর্যন্ত আমাদের ভেতরের সেই ছোট্ট প্রশ্নটাই—কী হবে যদি…—মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি।
সূত্র: লাইভ সায়েন্স
আরও পড়ুন: একটি মাত্র কোষ থেকে কীভাবে তৈরি হয় মস্তিষ্ক



