২২০০ বছর আগে লাঠি আর ছায়া দিয়ে কীভাবে মাপা হলো পৃথিবীর পরিধি
লাঠি ও ছায়া দিয়ে পৃথিবীর পরিধি মাপার গল্প

আজ থেকে প্রায় ২২০০ বছর আগের কথা। তখন আধুনিক বিজ্ঞানের জয়গান ছিল না, ছিল না কোনো কৃত্রিম উপগ্রহ কিংবা নিখুঁত জিপিএস ব্যবস্থা। সেই যুগে মানুষের সম্বল ছিল শুধু প্রখর পর্যবেক্ষণক্ষমতা এবং যুক্তিনির্ভর মস্তিষ্ক। আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরির তৎকালীন প্রধান গ্রন্থাগারিক ইরাটোস্থেনিস ছিলেন তেমনই এক অনন্য ধীশক্তির অধিকারী। তাঁর সামনে তখন বিরাট এক চ্যালেঞ্জ—এই বিশাল পৃথিবীর আকার আসলে কত বড়? বেশিরভাগ পণ্ডিত তখন জানতেন পৃথিবী গোলাকার, কিন্তু সেই গোলকের প্রকৃত পরিধি কত, তা ছিল এক অমীমাংসিত রহস্য।

সায়েন শহরের অদ্ভুত ঘটনা

এই রহস্য উন্মোচনের সূত্রপাত হয়েছিল তৎকালীন ২১ জুনের এক বিশেষ তথ্য থেকে। ইরাটোস্থেনিসের এক সওদাগর বন্ধু তাঁকে একটি অদ্ভুত প্রাকৃতিক ঘটনার কথা জানান। মিসরের সায়েন শহরে (বর্তমানে আসওয়ান) ২১ জুন ঠিক দুপুরে সূর্য যখন মাথার ওপরে থাকে, তখন সেখানে কোনো বস্তুর ছায়া পড়ে না। এর অকাট্য প্রমাণ হিসেবে তিনি বলেছিলেন, সেদিন সেখানে একটি গভীর কুয়োর একদম তলদেশে সূর্যের উজ্জ্বল প্রতিফলন দেখা যায়। অর্থাৎ, সূর্যরশ্মি সেখানে একদম লম্বভাবে পতিত হচ্ছে।

পর্যবেক্ষণ ও যুক্তি

এই তথ্যটি কৌতূহলী ইরাটোস্থেনিসের মনে দারুণ এক প্রশ্নের জন্ম দিল। তিনি খেয়াল করলেন, একই দিন এবং একই সময়ে আলেকজান্দ্রিয়া শহরে কুয়োর ভেতরে সূর্যের কোনো প্রতিফলন দেখা যায় না, বরং সেখানে বস্তুর ছায়া পড়ে। এই সাধারণ পর্যবেক্ষণটিই ছিল তাঁর যুগান্তকারী আবিষ্কারের ভিত্তি। তিনি যুক্তি দিলেন, পৃথিবী যদি সমতল হতো, তবে একই সময়ে দুই শহরেই সূর্যরশ্মি একইভাবে পড়ত এবং কোনো ছায়া তৈরি হতো না। কিন্তু পৃথিবী যেহেতু গোল, তাই এর বক্রতার কারণে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে সূর্যের কোণও হবে ভিন্ন। এই অসামান্য অন্তর্দৃষ্টি থেকেই শুরু হয়েছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক বুদ্ধিবৃত্তিক অভিযান।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পরীক্ষার পরিকল্পনা

এই অসাধারণ পর্যবেক্ষণ থেকে পাওয়া তথ্যগুলোকে গাণিতিক রূপ দিতে ইরাটোস্থেনিস এক যুগান্তকারী পরীক্ষার পরিকল্পনা করলেন। তাঁর হাতে কোনো আধুনিক যন্ত্রপাতি ছিল না, ছিল কেবল একটি সোজা লাঠি, সূর্যের আলো ও জ্যামিতিক প্রজ্ঞা। আলেকজান্দ্রিয়া শহরে তিনি একটি লাঠিকে একদম ৯০ ডিগ্রি কোণে, মানে লম্বভাবে মাটিতে পুঁতে রাখলেন। ২১ জুন ঠিক দুপুরবেলা, যখন সায়েন শহরে সূর্যের কোনো ছায়া নেই, তখন তিনি দেখলেন আলেকজান্দ্রিয়াতে সেই লাঠিটি মাটিতে একটি নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের ছায়া তৈরি করছে। এই ছায়ার দৈর্ঘ্য এবং লাঠির উচ্চতা ব্যবহার করে তিনি ত্রিকোণমিতিক ও জ্যামিতিক হিসাব কষলেন। তিনি বের করলেন, সূর্যরশ্মি লাঠির সঙ্গে ঠিক ৭.২ ডিগ্রি কোণ তৈরি করেছে।

জ্যামিতির প্রয়োগ

ইরাটোস্থেনিস জানতেন, সূর্য পৃথিবী থেকে অত্যন্ত দূরে অবস্থিত, তাই সেখান থেকে আসা আলোকরশ্মিগুলোকে একে অপরের সমান্তরাল হিসেবে ধরা যায়। জ্যামিতির একান্তর কোণের সূত্র অনুযায়ী, লাঠির মাথায় তৈরি হওয়া এই ৭.২° কোণটি আসলে পৃথিবীর কেন্দ্রে তৈরি হওয়া কোণের সমান। অর্থাৎ আলেকজান্দ্রিয়া এবং সায়েন শহর পৃথিবীর কেন্দ্রে যে কৌণিক দূরত্ব তৈরি করে, তার মান হলো ৭.২°।

দূরত্ব নির্ণয়ের চ্যালেঞ্জ

হিসাবটি সম্পন্ন করতে এবার তাঁর প্রয়োজন ছিল আলেকজান্দ্রিয়া থেকে সায়েন শহরের একদম সঠিক রৈখিক দূরত্ব বা সরণ। এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন—রাস্তার আঁকাবাঁকা দৈর্ঘ্য হলো দূরত্ব, কিন্তু জ্যামিতিক পরিমাপের জন্য প্রয়োজন দুটি বিন্দুর মধ্যবর্তী একদম সোজা বা ন্যূনতম দৈর্ঘ্য, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় সরণ। এই সরণ বের করা ছিল সেই যুগের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। লোকগাথা অনুযায়ী, তিনি অভিজ্ঞ পথচারী বা উটের কাফেলার সাহায্য নিয়েছিলেন। অত্যন্ত ধৈর্য ও নিষ্ঠার সঙ্গে হিসাব করে দেখা গেল, এই দুই শহরের মধ্যবর্তী সরণ প্রায় ৮০০ কিলোমিটার (সেই সময়ের মাপ অনুযায়ী ৫ হাজার স্টেডিয়া)।

গাণিতিক হিসাব

ইরাটোস্থেনিস হিসাব করলেন: ৭.২° কৌণিক দূরত্বের জন্য সরণ হয় = ৮০০ কিলোমিটার; ১° কৌণিক দূরত্বের জন্য সরণ হয় = (৮০০ ÷ ৭.২) কিলোমিটার; ৩৬০° কৌণিক দূরত্বের জন্য সরণ হয় = (৮০০ × ৩৬০) ÷ ৭.২ কিলোমিটার = ৪০ হাজার কিলোমিটার।

আধুনিক পরিমাপের সাথে তুলনা

বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, আজকের এই অত্যাধুনিক যুগে কৃত্রিম উপগ্রহ, লেজার রশ্মি এবং উন্নত জিপিএস সিস্টেম ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর যে প্রকৃত পরিধি মেপেছেন, তা হলো প্রায় ৪০ হাজার ৭৫ কিলোমিটার। অর্থাৎ আজ থেকে ২ হাজার ২০০ বছর আগে কোনো ধরনের আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়াই ইরাটোস্থেনিসের করা হিসাবটি ছিল শতকরা ৯৯ ভাগের বেশি নির্ভুল! তাঁর এই অভাবনীয় সাফল্যের গুরুত্ব অনুধাবন করতে হলে আমাদের একটু পেছনে তাকাতে হবে।

প্রাচীন বিজ্ঞানের বিজয়

সেই প্রাচীন যুগে যখন বেশিরভাগ মানুষ জানত না পৃথিবী কতটা বিশাল, যখন মহাসাগরগুলোর ওপারে কী আছে তা ছিল কল্পনার অতীত, তখন একজন মানুষ কেবল একটি লাঠির ছায়া ও জ্যামিতিক প্রজ্ঞা দিয়ে পুরো গ্রহের পরিধি মেপে ফেলেছিলেন। এটি প্রমাণ করে, প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনের জন্য সব সময় দামি যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হয় না; বরং সঠিক পর্যবেক্ষণক্ষমতা এবং যুক্তিনির্ভর চিন্তাধারাই হলো বিজ্ঞানের আসল চাবিকাঠি।

অনুপ্রেরণার উৎস

ইরাটোস্থেনিসের এই পরীক্ষাটি শুধু একটি গাণিতিক সমাধান ছিল না, বরং এটি ছিল অন্ধকারের বিরুদ্ধে জ্ঞানের আলো। কোনো উচ্চতর প্রযুক্তি ছাড়াই শুধু জ্যামিতির একান্তর কোণের সূত্র ও ছায়ার দৈর্ঘ্য ব্যবহার করে প্রকৃতির এত বড় এক পরম সত্য উন্মোচন করা আজ অবধি মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং অনুপ্রেরণামূলক বুদ্ধিবৃত্তিক বিজয় হিসেবে অমর হয়ে আছে।