দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা তখন চরমে। আকাশে যুদ্ধবিমান, সাগরে সাবমেরিন, মাটিতে ট্যাংকের গোলাবর্ষণ। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। সবাই ধরেই নিয়েছিল, এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ আরও বহু বছর ধরে চলবে। কিন্তু একটি লোক, যাঁর হাতে কোনো বন্দুক ছিল না, যিনি কোনো দিন রণাঙ্গনে গিয়ে যুদ্ধ করেননি, তিনি তাঁর মেধা ও একটি যন্ত্রের সাহায্যে এই বিশ্বযুদ্ধকে অন্তত দুই থেকে চার বছর কমিয়ে দিয়েছিলেন! ঐতিহাসিকদের মতে, এই মানুষটির কারণে প্রায় এক কোটি ৪০ লাখ মানুষের প্রাণ বেঁচে গিয়েছিল।
ভাবতে অবাক লাগে, একজন গণিতবিদ কীভাবে এমন একটি কাজ করতে পারেন, যা সাধারণত দুর্ধর্ষ সব সেনাপতি ও সৈন্যদের করার কথা? উত্তরটা লুকিয়ে আছে তাঁর অসামান্য প্রতিভার মধ্যে। এই ইংরেজ গণিতবিদের নাম অ্যালান টুরিং। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান নাৎসি বাহিনীর তৈরি করা সবচেয়ে দুর্ভেদ্য সংকেত, অর্থাৎ এনিগমা তিনিই ভেঙে ফেলেছিলেন। এনিগমা ছিল একটি বিশেষ কোড তৈরির যন্ত্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানীর সেনাবাহিনী তাদের গোপন বার্তা পাঠানোর জন্য এটি ব্যবহার করত। কিন্তু টুরিংয়ের যন্ত্রের কারণে মিত্রবাহিনী আগে থেকেই জার্মানদের গোপন সামরিক পরিকল্পনা জেনে যেত। শুধু যুদ্ধ জয়ই নয়, আমরা আজ যে কম্পিউটার, ল্যাপটপ বা স্মার্টফোন ব্যবহার করছি, তার মূল তাত্ত্বিক ধারণাও এই অ্যালান টুরিংয়েরই মস্তিষ্কপ্রসূত। তাঁকে নির্দ্বিধায় বলা যায় ফাদার অব কম্পিউটার সায়েন্স।
অথচ এই অবিশ্বাস্য প্রতিভাবান মানুষটিকে তাঁর নিজের দেশ, নিজের সরকার যে প্রতিদান দিয়েছিল, তা মানব ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে আছে। সর্বকালের অন্যতম সেরা এই বিজ্ঞানীর জীবন ছিল এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা, বঞ্চনা ও মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিতে ঘেরা। চলুন, মানবসভ্যতাকে বদলে দেওয়া এই মহান গণিতবিদের জীবনের গভীরে ঢুঁ মারা যাক।
শৈশব ও শিক্ষা
অ্যালান ম্যাথিসন টুরিংয়ের জন্ম ১৯১২ সালের ২৩ জুন, লন্ডনের প্যাডিংটনে। তাঁর বাবা জুলিয়াস ম্যাথিসন টুরিং ছিলেন ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা। তিনি ভারতের মাদ্রাজে (বর্তমান চেন্নাই) কাজ করতেন। মা ইথেল সারা স্টোনিও থাকতেন স্বামীর সঙ্গেই। ফলে টুরিংয়ের শৈশবের একটি বড় সময় কেটেছে মা-বাবাকে ছাড়া, ইংল্যান্ডের বিভিন্ন ফস্টার হোমে; মানে পালক পরিবারে। মা-বাবার আদর ও পারিবারিক উষ্ণতার অভাব ছোটবেলা থেকেই টুরিংকে ভীষণ অন্তর্মুখী ও লাজুক করে তুলেছিল।
মাত্র ছয় বছর বয়সে তাঁকে সেন্ট মাইকেলস ডে স্কুলে ভর্তি করা হয়। এরপর ১০ বছর বয়সে হ্যাজেল হার্স্ট প্রিপারেটরি স্কুলে। ছোটবেলা থেকেই তাঁর শিক্ষকদের চোখ কপালে উঠতে শুরু করে। তাঁরা বুঝতে পারেন, ছেলেটির মেধা সাধারণ কোনো স্তরের নয়। ছেলের পড়াশোনা নিয়ে মা ইথেল খুব চিন্তিত ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন ছেলে কোনো নামীদামি প্রাইভেট স্কুলে পড়ুক। মায়ের ইচ্ছাতেই ১৯২৬ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে শ্যারবোর্ন স্কুলে ভর্তি হন টুরিং।
শ্যারবোর্নে ভর্তি হওয়ার প্রথম দিনেই ঘটে এক বিপত্তি। সে সময় পুরো ইংল্যান্ডে সাধারণ ধর্মঘট চলছিল, কোনো ট্রেন বা বাস চলছিল না। কিন্তু টুরিংয়ের স্কুলে যাওয়া চাই-ই চাই। অদম্য জেদি টুরিং সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। বাড়ি থেকে প্রায় ৬০ মাইল পথ সাইকেল চালিয়ে প্রথম দিন স্কুলে হাজির হলেন তিনি! পথে রাত কাটানোর জন্য তাঁকে একটি হোটেলেও থাকতে হয়েছিল।
তবে শ্যারবোর্নের প্রধান শিক্ষক টুরিংকে নিয়ে খুব একটা খুশি ছিলেন না। কারণ, সেই যুগে ভালো ছাত্র বলতে বোঝানো হতো যারা ক্ল্যাসিকস মানে গ্রিক ও ল্যাটিন সাহিত্যে ভালো। কিন্তু টুরিংয়ের ধ্যানজ্ঞান ছিল শুধুই গণিত ও বিজ্ঞানে। প্রধান শিক্ষক টুরিংয়ের মা-বাবাকে চিঠি লিখে সতর্ক করে বলেছিলেন, 'সে যদি শুধু একজন সায়েন্টিফিক স্পেশালিস্ট হতে চায়, তবে সে এই পাবলিক স্কুলে শুধু নিজের সময়ই নষ্ট করছে।'
কিন্তু টুরিং এসবে কান দেওয়ার পাত্র ছিলেন না। মাত্র ১৬ বছর বয়সেই তিনি অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করেন। মজার ব্যাপার হলো, তখনো পর্যন্ত স্কুলেই তাঁকে সাধারণ ক্যালকুলাস শেখানো হয়নি, অথচ তিনি নিজের চেষ্টায় গণিতের অত্যন্ত জটিল সব সমস্যার সমাধান করে ফেলতেন!
এই স্কুলেই টুরিংয়ের জীবনে আসে প্রথম প্রেম এবং এক ভয়াবহ মানসিক ধাক্কা। ক্রিস্টোফার মরকম নামে এক প্রতিভাবান সহপাঠীর সঙ্গে তাঁর গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। ক্রিস্টোফারও ছিলেন বিজ্ঞানপাগল। এই বন্ধুত্ব টুরিংয়ের জন্য ছিল এক পরম আশ্রয়। কিন্তু ১৯৩০ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে বোভাইন টিউবারকিউলোসিস বা যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে ক্রিস্টোফারের হঠাৎ মৃত্যু হয়। এই মৃত্যু টুরিংয়ের মনোজগতে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করে। তিনি ধর্ম ও ঈশ্বরবিশ্বাসের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেন এবং হয়ে ওঠেন পুরোপুরি বস্তুবাদী। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন, ক্রিস্টোফার বিজ্ঞান নিয়ে যে স্বপ্ন দেখত, সেই স্বপ্ন তিনি একাই পূরণ করবেন।
কেমব্রিজ ও টুরিং মেশিন
১৯৩১ সালে টুরিং আন্ডারগ্র্যাজুয়েট পড়ার জন্য কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত কিংস কলেজে ভর্তি হন। এখানেই তিনি প্রথমবারের মতো নিজের জন্য একটি সত্যিকারের বাড়ি খুঁজে পান। কেমব্রিজের মুক্ত পরিবেশ তাঁকে স্বাধীনভাবে ভাবতে শিখিয়েছিল।
অনেকেই ভাবতে পারেন, একজন গণিতবিদ সারা দিন হয়তো বইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজে পড়ে থাকেন। কিন্তু টুরিং ছিলেন একেবারেই ব্যতিক্রম। তিনি ছিলেন একজন তুখোড় অ্যাথলেট। কেমব্রিজে পড়ার সময় তিনি নিয়মিত নৌকাবাইচ এবং দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন। কর্মজীবনে প্রবেশের পর তিনি প্রায়ই অফিসে যাওয়ার জন্য কোনো বাস বা ট্রেন ব্যবহার করতেন না। বাড়ি থেকে ১০ মাইল পথ দৌড়েই অফিসে চলে যেতেন! তাঁর দৌড়ের গতি এতই ভালো ছিল যে, ১৯৪৮ সালে তিনি একটি ম্যারাথনে অংশ নিয়ে ২ ঘণ্টা ৪৬ মিনিট ৩ সেকেন্ডে দৌড় শেষ করেন। সে বছরের অলিম্পিক ম্যারাথন জয়ীর চেয়ে টুরিংয়ের সময় মাত্র ১১ মিনিট বেশি ছিল!
১৯৩৪ সালে কিংস কলেজ থেকে তিনি প্রথম শ্রেণিতে সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর অসামান্য মেধার কারণে মাত্র ২২ বছর বয়সেই তাঁকে কিংস কলেজের ফেলো নির্বাচিত করা হয়।
১৯৩৬ সাল। টুরিং একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। নাম দেন 'অন কম্পিউটেবল নাম্বার্স, উইথ অ্যান অ্যাপ্লিকেশন টু দ্য এন্টশাইডুংসপ্রবলেম'। এই একটি গবেষণাপত্র তাঁকে চিরকালের জন্য ইতিহাসের পাতায় অমর করে দেয়। কুর্ট গোডেল যেমন প্রমাণ করেছিলেন, গণিতে সব সত্য প্রমাণ করা যায় না, টুরিং ঠিক সেই পথ ধরেই প্রমাণ করলেন, গণিতে এমন কোনো সর্বজনীন অ্যালগরিদম বা যন্ত্র নেই যা দিয়ে আগে থেকেই বলে দেওয়া সম্ভব যে একটি গাণিতিক বাক্য সত্য নাকি মিথ্যা।
এই প্রমাণটি করার জন্য টুরিং তাঁর কল্পনায় একটি অদ্ভুত যন্ত্র তৈরি করলেন। এটি কোনো বাস্তব যন্ত্র ছিল না, ছিল একটি বিমূর্ত যন্ত্র। যন্ত্রটিতে একটি অসীম ফিতা থাকবে, যা ছোট ছোট ঘরে বিভক্ত। একটি স্ক্যানার সেই ফিতার ওপর থাকা সংকেত পড়তে পারবে, নিয়ম অনুযায়ী মুছতে পারবে বা নতুন কিছু লিখতে পারবে। টুরিং দেখালেন, এই সহজ সাধারণ যন্ত্রটি দিয়ে পৃথিবীর যেকোনো গাণিতিক কাজ করানো সম্ভব। এই কাল্পনিক যন্ত্রটিকেই আজ আমরা টুরিং মেশিন নামে চিনি।
এই টুরিং মেশিনই হলো আজকের দিনের আধুনিক কম্পিউটারের আদি পিতা! কম্পিউটারের হার্ডওয়্যার এবং সফটওয়্যার—এই দুটি যে আলাদা জিনিস হতে পারে এবং একটি মাত্র যন্ত্রের ভেতরে নিয়ম সফটওয়্যার বদলে দিয়ে যে হাজারো রকম কাজ করানো যায়, টুরিংয়ের এই ধারণাই তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল। কিংবদন্তি গণিতবিদ জন ফন নিউম্যান টুরিংয়ের এই কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন।
এরপর টুরিং পিএইচডি করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। ১৯৩৮ সালে তিনি সেখান থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ফন নিউম্যান তাঁকে প্রিন্সটনে থেকে যাওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু টুরিংয়ের মন পড়েছিল নিজের দেশে। তিনি ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন।
ব্লেচলি পার্ক ও এনিগমা
১৯৩৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর। জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল ব্রিটেন। বেজে উঠল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা।
যুদ্ধ শুরুর ঠিক পরপরই টুরিং ব্রিটিশ সরকারের গোপন সংস্থা গভর্নমেন্ট কোড অ্যান্ড সাইফার স্কুলে পূর্ণকালীন হিসেবে যোগ দেন। এই সংস্থাটির সদর দপ্তর ছিল বাকিংহ্যামশায়ারের একটি বিশাল ম্যানশনে, যার নাম ব্লেচলি পার্ক। টুরিংয়ের কাঁধে এসে পড়ল বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন দায়িত্ব, জার্মান বাহিনীর এনিগমা কোড ভাঙা।
এনিগমার ব্যাপারটি ওপরে সংক্ষেপে বলেছি। আরেকটু বিস্তারিত বলি। এটি টাইপরাইটারের মতো দেখতে একটি যন্ত্র, যা দিয়ে জার্মানরা তাদের সব গোপন সামরিক বার্তা আদান-প্রদান করত। সাধারণ একটি বার্তাকে এনিগমা মেশিনে টাইপ করলে তা এমন এক সংকেতে পরিণত হতো, যা দেখলে মনে হবে অর্থহীন কিছু হিজিবিজি অক্ষর। এই সংকেত আবার অন্য একটি এনিগমা মেশিনে টাইপ করলে মূল বার্তাটি উদ্ধার হতো। মুশকিল হলো, এনিগমা মেশিনের ভেতরে থাকা চাকা এবং প্লাগবোর্ডের কারণে প্রতিটি অক্ষরের সংকেত প্রতিনিয়ত বদলাতে থাকত।
জার্মানরা প্রতিদিন রাত ১২টায় এনিগমার সেটিং পরিবর্তন করত। একটি এনিগমা মেশিনে সেটিং মেলানোর প্রায় ১৫৯ কুইন্টিলিয়ন সম্ভাব্য উপায় ছিল। ব্লেচলি পার্কের কোডব্রেকারদের কাছে প্রতিদিন সময় থাকত মাত্র ২৪ ঘণ্টা। এই সময়ের মধ্যে এতগুলো উপায় মিলিয়ে সঠিক সেটিং বের করা মানুষের পক্ষে আক্ষরিক অর্থেই অসম্ভব ছিল।
যুদ্ধের শুরুতে পোল্যান্ডের বিজ্ঞানীরা বোম্বা নামে একটি যন্ত্র দিয়ে এনিগমার কোড ভাঙার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু জার্মানরা এনিগমার জটিলতা বাড়িয়ে দিলে পোলিশ যন্ত্রটি অকেজো হয়ে পড়ে। এই পর্যায়ে দৃশ্যপটে আসেন অ্যালান টুরিং। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, মানুষের মস্তিষ্কের পক্ষে এত দ্রুত এই কোড ভাঙা সম্ভব নয়। একটি যন্ত্রকে হারাতে হলে আরেকটি যন্ত্রই দরকার! টুরিং এবং তাঁর সহকর্মী গর্ডন ওয়েলচম্যান মিলে পোলিশ বোম্বার ধারণা থেকে সম্পূর্ণ নতুন এবং অনেক বেশি শক্তিশালী একটি ইলেকট্রোমেকানিক্যাল যন্ত্র তৈরি করেন। সেই যন্ত্রের নাম দেওয়া হয় বোম্ব। যন্ত্রটি মানুষের যৌক্তিক চিন্তাকে যান্ত্রিক রূপ দিয়েছিল।
১৯৪০ সালের শেষের দিকে টুরিংয়ের বোম্ব যন্ত্রটি জার্মান বিমানবাহিনীর কোডগুলো নিয়মিত ভাঙতে শুরু করে। কিন্তু আসল বিপদ ছিল জার্মান নৌবাহিনীর নেভাল এনিগমা। আটলান্টিক মহাসাগরে জার্মান সাবমেরিনগুলো ব্রিটিশ মালবাহী জাহাজগুলোর ওপর রীতিমতো তাণ্ডব চালাচ্ছিল। নেভাল এনিগমা ছিল আরও অনেক বেশি জটিল। কারণ এতে চাকার সংখ্যা ছিল বেশি।
টুরিং হাল ছাড়লেন না। তিনি ব্যানবুরিসমাস নামে এক অভিনব পরিসংখ্যানের পদ্ধতি আবিষ্কার করলেন। ১৯৪১ সালের শেষের দিকে তিনি নেভাল এনিগমার কোডও পুরোপুরি ভেঙে ফেলেন! ফলে মিত্রবাহিনী আগে থেকেই জানতে পারত আটলান্টিকের ঠিক কোথায় জার্মান সাবমেরিনগুলো ঘাপটি মেরে আছে। আটলান্টিকের যুদ্ধে ব্রিটেন জয়ী হয়। ফলে লাখ লাখ মানুষের প্রাণ বাঁচে। ব্রিটেনের জয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় ট্রাম্পকার্ড ছিল টুরিংয়ের এই আবিষ্কার। ব্লেচলি পার্কের সবাই তাঁকে একবাক্যে জিনিয়াস বলে মেনে নিয়েছিল।
অদ্ভুত জীবনযাপন
ব্লেচলি পার্কে টুরিংয়ের জীবনযাপন ছিল বেশ অদ্ভুত ও খামখেয়ালিপনায় ভরা। তাঁর সাইকেলের চেইনে একটা সমস্যা ছিল। একটু পর পর চেইন পড়ে যেত। চেইন মেরামত করার বদলে তিনি প্যাডেল গোনা শুরু করলেন। তিনি হিসাব করে দেখলেন, ঠিক কতবার প্যাডেল ঘোরানোর পর চেইনটা পড়ে যায়। এরপর থেকে ঠিক সেই নির্দিষ্ট সংখ্যক প্যাডেল ঘোরানোর আগেই তিনি সাইকেল থেকে নেমে চেইনটা ঠিক করে নিতেন!
বসন্তকালে ফুলের রেণু থেকে তাঁর অ্যালার্জি হতো। এ থেকে বাঁচতে তিনি মুখে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গ্যাস মাস্ক পরে সাইকেল চালিয়ে অফিসে আসতেন! কেউ যাতে তাঁর চায়ের মগ চুরি করতে না পারে, সে জন্য তিনি মগটিকে রেডিয়েটরের সঙ্গে শেকল দিয়ে তালা মেরে রাখতেন।
ব্লেচলি পার্কের ৮ নম্বর হাটে তাঁর এক সহকর্মী ছিলেন জোন ক্লার্ক। জোন ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী কোডব্রেকার। একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তাঁদের মধ্যে দারুণ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। ১৯৪১ সালে টুরিং জোনকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। জোন আনন্দে তা গ্রহণও করেন। কিন্তু কয়েক দিন পরই টুরিং কী ভেবে নিজেই এ বাগদান ভেঙে দেন। তবে তাঁদের মধ্যে আজীবন অটুট বন্ধুত্ব বজায় ছিল।
যুদ্ধোত্তর সময় ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলো। কিন্তু টুরিংয়ের কোনো বীরোচিত সংবর্ধনা জুটল না। কারণ, ব্রিটিশ সরকারের অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের কারণে ব্লেচলি পার্কের পুরো অপারেশনটাই ছিল টপ সিক্রেট। এমনকি টুরিংয়ের মা-বাবাও জানতেন না তাঁদের ছেলে যুদ্ধে এত বড় ভূমিকা রেখেছে!
যুদ্ধের পর টুরিং লন্ডনের ন্যাশনাল ফিজিক্যাল ল্যাবরেটরিতে যোগ দেন। সেখানে তিনি অটোমেটিক কম্পিউটিং ইঞ্জিনের নকশা তৈরি করেন। সেই নকশাই ছিল আজকের দিনের কম্পিউটারের সরাসরি পূর্বসূরি। ১৯৪৮ সালে তিনি ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন এবং সেখানে ম্যানচেস্টার মার্ক ১ কম্পিউটারের জন্য সফটওয়্যার তৈরির কাজ শুরু করেন।
এই ম্যানচেস্টারেই টুরিং তাঁর জীবনের আরেকটি যুগান্তকারী কাজ করেন। তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। ১৯৫০ সালে তিনি একটি বিখ্যাত পেপার প্রকাশ করেন, যার নাম কম্পিউটিং মেশিনারি অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স। পেপারের শুরুতেই তিনি একটি প্রশ্ন ছুড়ে দেন—যন্ত্র কি চিন্তা করতে পারে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তিনি একটি চমৎকার পরীক্ষার কথা বলেন, যা আজ টুরিং টেস্ট নামে পরিচিত। তিনি বললেন, একটি পর্দার পেছনে একজন মানুষ এবং একটি যন্ত্র (কম্পিউটার) আছে। পর্দার এপাশ থেকে একজন বিচারক দুজনের সঙ্গেই কথা বলবেন, মানে টেক্সটে যোগাযোগ করবেন। বিচারক যদি প্রশ্ন করে বুঝতে না পারেন যে পর্দার ওপাশে কে মানুষ আর কে যন্ত্র, অর্থাৎ যন্ত্রটি যদি মানুষকে ধোঁকা দিতে সক্ষম হয়, তবে বুঝতে হবে ওই যন্ত্রের বুদ্ধিমত্তা আছে!
আজকে আমরা ইন্টারনেটে কোনো ওয়েবসাইটে ঢোকার সময় যে 'I am not a robot' বা আঁকাবাঁকা অক্ষরের ক্যাপচা পূরণ করি, সেটি মূলত এই টুরিং টেস্টেরই একটি উল্টো এবং আধুনিক রূপ।
কম্পিউটার যে শুধু অঙ্ক কষার যন্ত্র নয়, এটি যে দাবাও খেলতে পারে, তা প্রমাণের জন্য তিনি টুরোচ্যাম্প নামে একটি দাবা খেলার প্রোগ্রাম তৈরি করেছিলেন। তখনো সেই প্রোগ্রাম চালানোর মতো শক্তিশালী কম্পিউটার তৈরি হয়নি। তাই তিনি কাগজ-কলমে হিসাব করে মানুষের সঙ্গে ওই প্রোগ্রামের হয়ে দাবা খেলতেন!
গাণিতিক জীববিজ্ঞান
১৯৫১ সালে টুরিং জীববিজ্ঞানের দিকে আকৃষ্ট হন। বিশেষ করে গাণিতিক দৃষ্টিকোণ থেকে। তিনি বুঝতে চাইতেন, প্রকৃতির বিভিন্ন প্যাটার্ন কীভাবে তৈরি হয়। জেব্রার গায়ে কেন ডোরাকাটা দাগ থাকে? চিতাবাঘের গায়ে কেন ছোপ ছোপ দাগ হয়? গাছের পাতায় কেন ফিবোনাচ্চি ধারার জ্যামিতি দেখা যায়?
তিনি মর্ফোজেনেসিস বা জীবের গঠনপ্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। তিনি দেখান, রাসায়নিক পদার্থের বিক্রিয়া এবং ছড়িয়ে পড়ার কারণেই প্রকৃতির এই অদ্ভুত সুন্দর প্যাটার্নগুলো তৈরি হয়। তাঁর এই কাজ গাণিতিক জীববিজ্ঞানের জগতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিল।
ট্র্যাজেডি ও মৃত্যু
কিন্তু এরপরই নেমে আসে সেই ভয়াবহ আঁধার। ১৯৫২ সালের জানুয়ারি মাস। কিছুদিন পর টুরিংয়ের বাড়িতে একটি চুরির ঘটনা ঘটে। টুরিং সরল মনে পুলিশে খবর দেন।
তদন্তের একপর্যায়ে পুলিশ জানতে পারে টুরিংয়ে যৌনাভ্যাস স্বাভাবিক নয়। তৎকালীন সমাজের চোখে তা ছিল এক ধরনের বিকৃতি। এছাড়া ব্রিটিশ আইনে সেটি ছিল একটি ভয়ংকর ফৌজদারি অপরাধ। এই একই আইনে বিখ্যাত লেখক অস্কার ওয়াইল্ডকেও শাস্তি দেওয়া হয়েছিল।
পুলিশ টুরিংকে গ্রেপ্তার করে। আদালতে টুরিং আত্মপক্ষ সমর্থন করেননি। কারণ তিনি মনে করতেন, তিনি কোনো ভুল করেননি। বিচারে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তাঁকে দুটি বিকল্প দেওয়া হয়—হয় কারাগারে যেতে হবে, না হয় শরীরে হরমোন ইনজেকশন নিয়ে কেমিক্যাল ক্যাস্ট্রেশন করাতে হবে।
নিজের গবেষণা ও কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য টুরিং বাধ্য হয়ে দ্বিতীয় পথটিই বেছে নেন। টানা এক বছর তাঁকে ইস্ট্রোজেন হরমোন পুশ করা হয়। এর ফলাফল ছিল ভয়াবহ। তাঁর শরীর ফুলে যেতে থাকে। এছাড়া দেহের অন্য আরও পরিবর্তন দেখা দিতে থাকে। সেই সঙ্গে চরম বিষণ্ণতায় ডুবে যান টুরিং।
সবচেয়ে বড় আঘাত আসে তাঁর পেশাগত জীবনে। অপরাধী সাব্যস্ত হওয়ায় ব্রিটিশ সরকার তাঁর সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স বাতিল করে দেয়। যে মানুষটি বিশ্বযুদ্ধে দেশের সবচেয়ে গোপন তথ্যগুলো সামলেছেন, তাঁকেই এখন দেশের জন্য হুমকি বলে আখ্যায়িত করা হলো! তাঁকে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা জিসিএইচকিউর সব প্রজেক্ট থেকে বের করে দেওয়া হয়।
১৯৫৪ সালের ৮ জুন। টুরিংয়ের পরিচারিকা তাঁর ম্যানচেস্টারের বাড়িতে এসে দেখেন, বিছানায় নিথর হয়ে পড়ে আছেন টুরিং। তাঁর বয়স তখন মাত্র ৪১ বছর।
বিছানার পাশে পড়ে ছিল একটি অর্ধেক খাওয়া আপেল। ময়নাতদন্তে জানা যায়, সায়ানাইড বিষক্রিয়ায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে। পুলিশ রিপোর্ট অনুযায়ী, তিনি আপেলে সায়ানাইড মাখিয়ে সেটি খেয়ে আত্মহত্যা করেছেন। টুরিংয়ের প্রিয় রূপকথার গল্প ছিল স্নো হোয়াইট অ্যান্ড দ্য সেভেন ডোয়ার্ফস। ধারণা করা হয়, সেই গল্পের দুষ্ট রানির বিষাক্ত আপেলের মতোই তিনি নিজের জন্য মৃত্যুর ফাঁদ তৈরি করেছিলেন।
উত্তরাধিকার
যাঁকে মাথায় করে রাখার কথা ছিল, অথচ রাষ্ট্রই তাঁকে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিল। টুরিংয়ের মৃত্যুর পর কয়েক দশক ধরে তাঁর অবদান রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার চাদরে ঢাকা ছিল। ১৯৭০-এর দশকে যখন এনিগমা ভাঙার গল্প প্রথম জনসমক্ষে আসে, তখন বিশ্ববাসী জানতে পারে অ্যালান টুরিং কে ছিলেন!
দীর্ঘ ৫৫ বছর পর, ২০০৯ সালে ব্রিটিশ প্রোগ্রামার জন গ্রাহাম-কামিংয়ের নেতৃত্বে এক বিশাল পিটিশনের পর তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন অ্যালান টুরিংয়ের প্রতি হওয়া অন্যায়ের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষমা চান। ২০১৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ টুরিংকে মরণোত্তর রাজকীয় ক্ষমা ঘোষণা করেন।
আজ অ্যালান টুরিংয়ের নাম শুধু বইয়ের পাতায় নয়, ছড়িয়ে আছে সবখানে। ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ ৫০ পাউন্ডের নোটে চার্লস ব্যাবেজ বা অ্যাডা লাভলেসের মতো বিজ্ঞানীদের টপকে টুরিংয়ের ছবি স্থান পেয়েছে। ২০১৪ সালে তাঁর জীবনী নিয়ে তৈরি হয়েছে অস্কারজয়ী মুভি দ্য ইমিটেশন গেম।
অ্যালান টুরিং লজিক, যন্ত্র এবং প্রকৃতির সীমানাকে এক সুতোয় বেঁধেছিলেন। যে মানুষটি যন্ত্রকে ভাবতে শিখিয়েছিলেন, তিনি হয়তো মানুষের অমানবিক কাঠিন্য ও অন্ধত্বকে বুঝতে পারেননি। একটি বিষাক্ত আপেল হয়তো তাঁর জীবন কেড়ে নিয়েছে, কিন্তু আজকের এই আধুনিক পৃথিবীর প্রতিটি ক্লিকে, প্রতিটি সার্চে এমনকি প্রতিটি অ্যালগরিদমে অ্যালান টুরিং অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন।



