জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বাসায় ছাত্রী হত্যা: স্বামী গ্রেপ্তার ও আদালতে রিমান্ড আবেদন
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) সংলগ্ন ইসলামনগর এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে শারমীন জাহান (খাদিজা) নামে এক ছাত্রীর রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধারের মর্মান্তিক ঘটনায় পুলিশ তার স্বামী ফাহিম আল হাসানকে গ্রেপ্তার করেছে। সোমবার (১৬ মার্চ) সকালে তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডের জন্য আদালতে পাঠানো হয়েছে। এদিকে, এই হত্যাকাণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনসহ বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।
নিহত ও গ্রেপ্তারকৃতের পরিচয়
নিহত শারমীন জাহান চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার তেতৈয় গ্রামের শাহজাহান মোল্লার মেয়ে ছিলেন। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। অপরদিকে, তার স্বামী ফাহিম আল হাসান কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার খুইরুল গ্রামের মো. হানিফ সরকারের ছেলে এবং ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।
ঘটনার বিবরণ ও তদন্তের অগ্রগতি
আশুলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আজগর হোসেনের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার পরপরই ফাহিম আল হাসানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছিল। পরে রোববার দিবাগত রাতে শারমীনের চাচা মনিরুল ইসলামের করা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শারমীন ও ফাহিম প্রেমের সম্পর্কের পর গত বছরের ২৪ জুন বিয়ে করেন এবং সেপ্টেম্বর মাসে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ইসলামনগর এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করেন। বিয়ের কিছুদিন পর থেকে পারিবারিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে কলহের সৃষ্টি হয়, যা শারমীন পরিবারের সদস্যদের জানিয়েছিলেন।
মামলার বিবরণে আরও বলা হয়েছে, ১৫ মার্চ বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে ফাহিম মুঠোফোনে শারমীনের চাচা মনিরুল ইসলামকে জানান যে শারমীন গুরুতর অসুস্থ। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে মনিরুল শারমীনকে খাটের ওপর রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। আশপাশের লোকজনের সহায়তায় তাকে সাভারের বেসরকারি এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। সুরতহালের তথ্যানুসারে, শারমীনের কপালের ডান পাশে ও মাথার উপরে গভীর কাটা রক্তাক্ত জখম দেখা গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ছাত্রসংগঠনের প্রতিক্রিয়া
এই হত্যাকাণ্ডে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ কামরুল আহসান গভীর শোক ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। রোববার রাত পৌনে ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে উপাচার্যের শোকবার্তা জানানো হয়। বিবৃতিতে তিনি বলেন, "শারমীন জাহানের খুনের ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক। এতে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার গভীরভাবে শোকাহত হয়েছে। ঘটনা দ্রুত তদন্ত করে অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।"
এছাড়াও, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু), ছাত্র ইউনিয়ন (একাংশ) ও জাতীয় ছাত্রশক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতাকর্মীরা হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবি জানিয়েছেন। জাকসুর সহসভাপতি আবদুর রশিদ ও সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলামের সই করা বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, শারমীনের মাথায় গভীর আঘাতের চিহ্ন এবং রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে থাকা, একইসঙ্গে বাসা থেকে ল্যাপটপ ও ফোন নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি প্রাথমিকভাবে একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের ইঙ্গিত দেয়। তারা বলেন, "একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর এমন অস্বাভাবিক ও নৃশংস মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।"
এই ঘটনা শিক্ষার্থী নিরাপত্তা ও পারিবারিক সহিংসতার গুরুতর দিকগুলো তুলে ধরছে, যা সমাজে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পুলিশের তদন্ত ও আদালতের রিমান্ড আবেদনের পরবর্তী পদক্ষেপগুলো এখন সবার নজরে রয়েছে।
