ঢাবিতে ২০ ছাত্র সংগঠনের ঐক্য: উপাচার্যের প্রশংসা, গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের আহ্বান
ঢাবিতে ২০ ছাত্র সংগঠনের ঐক্য, গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের আহ্বান

ঢাবিতে ২০ ছাত্র সংগঠনের ঐক্য: উপাচার্যের প্রশংসা, গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের আহ্বান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিয়াশীল বিভিন্ন রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিয়ে আলোচনা সভা ও ইফতার মাহফিলের আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (ডুজা)। এই অনুষ্ঠানে প্রায় ২০টি ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতৃবৃন্দ এক ছাদের নিচে অংশ নেন, যা ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক সহাবস্থান, সুস্থ রাজনৈতিক চর্চা এবং সম্প্রীতির পরিবেশ জোরদারের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

উপাচার্যের প্রশংসা ও গণতান্ত্রিক আহ্বান

শুক্রবার (৬ মার্চ) বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) মিলনায়তনে ‘গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার: প্রত্যাশিত শিক্ষাঙ্গন’ শীর্ষক আলোচনা সভা ও ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সভাপতি মহিউদ্দিন মুজাহিদ মাহির সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মাহাদি হাসানের সঞ্চালনায় এই অনুষ্ঠানটি পরিচালিত হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান বলেন, “ডুজার আহ্বানে প্রতি বছরই বিভিন্ন মত ও দলের প্রতিনিধিরা একত্রিত হওয়ার সুযোগ পান। ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর মধ্যে মতানৈক্য থাকলেও এমন আয়োজনে তাদের এক ছাদের নিচে আনা সম্ভব হয়, যা একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, “আমরা চাই ক্যাম্পাসে সবসময় রাজনৈতিক সহাবস্থান বজায় থাকুক। শিক্ষার্থীরা যেন সুস্থ রাজনৈতিক চর্চা করার সুযোগ পায় এবং বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠুক গণতান্ত্রিক চর্চার উন্মুক্ত ক্ষেত্র।”

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সাংবাদিক সমিতির ভূমিকা

ঢাবির উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বিভিন্ন সময় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে সহায়তা করে এবং অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতিও তুলে ধরে। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম আরও গতিশীল হয়। প্রো-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ যোগ করেন, “এই ধরনের আয়োজন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর মধ্যে সংলাপের সুযোগ তৈরি করে, যা ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ শক্তিশালী করতে সহায়ক। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সম্প্রীতির ক্যাম্পাস গড়ে তুলতে কাজ করছে।”

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ওবায়দুল ইসলাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিকরা সবসময় সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে কথা বলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থিতিশীলতা ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষায় ক্যাম্পাস সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

ছাত্র সংগঠন নেতাদের মতামত ও দাবি

ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতারাও ক্যাম্পাসে সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ ও সহাবস্থানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, “ক্যাম্পাসে যে ‘মব সংস্কৃতি’ তৈরি হয়েছিল, তা আসন্ন ছাত্রসংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে শেষ হবে বলে আমরা আশা করছি। ঢাবিতে যেন অযথা কোনো মব তৈরি না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।” তিনি ক্যাম্পাসে ‘গুপ্ত রাজনীতি’ বন্ধের আহ্বান জানান এবং ভুয়া ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে গুজব ছড়ানোর বিষয়ে সাংবাদিকদের সতর্ক থাকার অনুরোধ করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহ-সভাপতি আবু সাদিক কায়েম বলেন, “আজকের গণতান্ত্রিক ক্যাম্পাস ও দেশ আমরা পেয়েছি জুলাই শহীদদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে। তাদের আত্মত্যাগের কথা আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে।” তিনি ডাকসু নির্বাচনকে বার্ষিক ক্যালেন্ডারের আওতায় আনার দাবি জানান।

বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীর কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক জাবির আহমেদ জুবেল বলেন, ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখতে প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার আহ্বান জানান তিনি। বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি নাজমুল হাসান যোগ করেন, “রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও শিক্ষাঙ্গনে সহনশীলতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ বজায় রাখা জরুরি। তিনি সব ছাত্র সংগঠনকে সহিংসতা ও অসহিষ্ণুতা পরিহার করে শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখার আহ্বান জানান।”

অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের অংশগ্রহণ

এছাড়া অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. মোর্শেদ হাসান খান এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা, ছাত্রশক্তির কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদ আহসান, ছাত্রপক্ষের কেন্দ্রীয় সভাপতি মোহাম্মদ প্রিন্স, ছাত্র ফেডারেশনের ঢাবি শাখার আহ্বায়ক আরমানুল হক, ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি মুনতাসীর আহমেদ এবং সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট (মার্কসবাদী)-এর সভাপতি সালমান সিদ্দিকী।

এই আয়োজনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর মধ্যে সংলাপ ও সহাবস্থানকে উৎসাহিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে শিক্ষাঙ্গনে গণতান্ত্রিক চর্চাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।