পেকুয়া ইউএনও মাহবুব আলম মাহবুব বদলি, থানায় মা-মেয়ে নির্যাতনের ঘটনায় তদন্ত চলছে
কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুব আলম মাহবুবকে বদলি করা হয়েছে। গতকাল রোববার চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মো. মোতাহার হোসেন স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে তাঁর বদলির আদেশ জারি করা হয়। এই সিদ্ধান্তটি এসেছে পেকুয়া থানার ভেতরে মা-মেয়েকে নির্যাতনের ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনা ও তদন্তের পরিপ্রেক্ষিতে।
নির্যাতনের ঘটনা ও ইউএনওর ভূমিকা
৪ মার্চ বিকেলে পেকুয়া থানার ভেতরে মা-মেয়েকে নির্যাতনের অভিযোগ উঠে পুলিশের বিরুদ্ধে। পরে থানায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে নির্যাতিত নারীদের এক মাস করে সাজা দেন পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুব আলম মাহবুব। নির্যাতিত নারীদের একজন রেহেনা মোস্তফা রানু প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘ওই দিন ইউএনও থানায় পৌঁছে পুলিশের হাত থেকে আমাদের রক্ষা করার বদলে এক মাস করে সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠিয়ে দেন। অথচ ইউএনও আমাদের সঙ্গে কথা বলেননি। ভ্রাম্যমাণ আদালতে আমাদের মুখোমুখি করেননি। এমনকি অভিযোগ গঠনের কাগজে আমার স্বাক্ষর জালিয়াতি করা হয়েছে।’
থানার ভেতরে মা-মেয়েকে নির্যাতনের পর সমালোচনার ঝড় উঠে সারা দেশে। প্রথম আলোসহ দেশের বিভিন্ন পত্রিকা, অনলাইন পোর্টালে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এই ঘটনার সূত্র ধরে ৭ মার্চ চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) নুসরাত সুলতানাকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ১০ মার্চ ও ১২ মার্চ দুই দফায় তিনি পেকুয়া গিয়ে ভুক্তভোগী ও অভিযুক্তদের সঙ্গে কথা বলেন।
বদলির আদেশ ও তদন্তের অগ্রগতি
অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মো. মোতাহার হোসেন স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুব আলম মাহবুবকে বান্দরবানের রুমা উপজেলায় বদলি করা হয়েছে। রুমা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. এমদাদুল হক শরীফকে পেকুয়ায় পদায়ন করা হয়েছে।
নির্যাতনের শিকার নারী রেহেনা মোস্তফা বলেছেন, পেকুয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) পল্লব কুমার ঘোষ তাঁর কাছ থেকে প্রতিবেদন পক্ষে দেওয়ার কথা বলে ২০ হাজার টাকা ঘুষ নেন। প্রতিবেদন পক্ষে না দেওয়ায় ওই টাকা ফেরত চেয়ে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন ওই নারী। এতে ক্ষিপ্ত হন এসআই পল্লব কুমার ঘোষসহ থানার পুলিশ সদস্যরা। ৪ মার্চ মেয়ে জুবাইদা বেগমকে সঙ্গে নিয়ে রেহেনা মোস্তফা পেকুয়া থানায় গেলে দুজনকেই বেধড়ক মারধর করা হয়। পরে পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুব আলম মাহবুবকে ডেকে নিয়ে থানায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে দুজনকে এক মাস করে সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। ৭ মার্চ কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাহিদুল আলম সাজা বাতিল করে মা-মেয়েকে মামলার দায় থেকে খালাস দেন।
৯ মার্চ কক্সবাজার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ শফিউল আযম মা-মেয়েকে নির্যাতনের ঘটনায় স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা করেন। এক আদেশে আদালত পেকুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) ১৬ মার্চের মধ্যে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা প্রদানের নির্দেশ দেন।
পুলিশের তদন্ত ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
পুলিশের পক্ষ থেকেও বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তের অংশ হিসেবে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মোহাম্মদ সামীম কবীর আজ সোমবার দুপুরে পুলিশের চকরিয়া সার্কেল অফিসে ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য ও জবানবন্দি নেন। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের কাছ থেকেও ঘটনার বিষয়ে সাক্ষ্য প্রমাণ নেন।
এই ঘটনাটি প্রশাসনিক ও আইনগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, যা সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীলতা ও নাগরিক অধিকার রক্ষার বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তদন্ত কমিটি ও আদালতের সিদ্ধান্তের উপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতে আরও পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
