পূর্বাচল-ঝিলমিলে প্লট খালি, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ঘাটতি
পূর্বাচল-ঝিলমিলে প্লট খালি, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ঘাটতি

রাজধানী ঢাকার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ কমাতে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হয়েছে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প ও ঝিলমিল আবাসিক প্রকল্প—দুটি বৃহৎ উদ্যোগ। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, এসব প্রকল্প এখনও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে পিছিয়ে। বরং প্লট বরাদ্দ অনেক ক্ষেত্রেই বসবাসের পরিবর্তে বিনিয়োগ বা আভিজাত্যের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

প্লট বরাদ্দ ও বাস্তব অবস্থা

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে মোট ২৫ হাজার ১৬টি এবং ঝিলমিল আবাসিক প্রকল্পে প্রায় ১ হাজার ৯৮০টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা ছিল, দ্রুত আবাসন গড়ে তুলে ঢাকার জনসংখ্যার একটি বড় অংশকে এসব এলাকায় স্থানান্তর করা। এতে রাজধানীর ওপর চাপ কমবে, যানজট হ্রাস পাবে এবং পরিবেশের মান উন্নত হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, পূর্বাচল ও ঝিলমিলের অনেক প্লট এখনও খালি পড়ে আছে। অনেক ক্ষেত্রে ভবন নির্মাণে দীর্ঘসূত্রতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ফলে জনবসতি স্থানান্তরের প্রত্যাশিত সুফল মিলছে না।

নির্মাণ বাধ্যবাধকতা ও নজরদারির অভাব

পূর্বাচল প্রকল্পের লিজ দলিল অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্লটে ভবন নির্মাণ বাধ্যতামূলক। বিশেষ করে চার নম্বর শর্তে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে—নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে বসবাস নিশ্চিত করতে হবে। তবে অভিযোগ রয়েছে, এই শর্ত বাস্তবায়নে কার্যকর নজরদারির অভাব রয়েছে। অন্যদিকে, পূর্বাচলের ১৯ নম্বর সেক্টরে ১৩০ তলা ভবন নির্মাণ করে এটিকে একটি আধুনিক বিজনেস ডিস্ট্রিক্ট হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও রয়েছে। কিন্তু এ পরিকল্পনার অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি বাস্তবে রূপ নেবে, নাকি কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে?

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতামত

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, শুধু প্লট বরাদ্দের মাধ্যমে নগর বিকেন্দ্রীকরণ সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সরকারি দপ্তর, ব্যাংক, কর্পোরেট অফিসসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থানান্তর। সচিবালয়সহ বড় বড় কর্মস্থল পূর্বাচলে স্থানান্তর করা গেলে প্রতিদিনের যাতায়াতের চাপ কমবে এবং যানজট হ্রাসে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাছাড়া ঢাকার বায়ুদূষণ ও পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় এই ধরনের পরিকল্পিত বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি। বর্তমানে অতিরিক্ত জনসংখ্যা ও যানবাহনের কারণে রাজধানীর বায়ুর মান উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বিআইপি’র প্রেসিডেন্টের বক্তব্য

বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব প্ল্যানার্স’র (বিআইপি) প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, পূর্বাচল ও ঝিলমিল প্রকল্পের পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছিল আজ থেকে তিন দশকেরও বেশি আগে। কিন্তু এখনও সেখানে পূর্ণাঙ্গ নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা না হওয়ায় প্রত্যাশিত জনবসতি গড়ে ওঠেনি। তিনি আরও বলেন, শুধুমাত্র প্লট বরাদ্দ দিয়ে বসবাস নিশ্চিত করা যায় না। মানুষের জন্য আগে প্রয়োজন মৌলিক অবকাঠামো ও নাগরিক সেবা—যেমন সড়ক, পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য সুবিধাগুলো। এসব নিশ্চিত না হলে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেখানে বসবাসে আগ্রহী হবে না।

অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খানের মতে, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পরিকল্পনায় ঘাটতি স্পষ্ট। একটি দায়িত্বশীল সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাজউকের উচিত ছিল পরিকল্পিতভাবে নগরায়ন নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, পূর্বাচল ও ঝিলমিল প্রকল্পে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলা উন্নয়ন এর বিকেন্দ্রীকরণকে গুরুত্ব দেয়ার পরিবর্তে কেন্দ্রীয় নগর এলাকাতেই ভবনের উচ্চতা ও এফএআর (ফার) মান বাড়ানোর মাধ্যমে শহরের জনসংখ্যা ও বিদ্যমান অবকাঠামোর উপর আরও চাপ বাড়ানোর বিষয়েই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি মন্তব্য করেন, রাজউকের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করলে মনে হয়, সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা পূর্বাচল ও ঝিলমিল প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে আন্তরিক নন। ফলে দীর্ঘদিনেও এই প্রকল্পগুলো প্রত্যাশিত রূপ পায়নি। সবশেষে তিনি বলেন, পরিকল্পিত নগর গড়ে তোলার ক্ষেত্রে রাজউক তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে, যা রাজধানীর টেকসই উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাজউকের বক্তব্য

প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ (চলতি দায়িত্ব) রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মো. আশরাফুল ইসলাম জানিয়েছেন, পূর্বাচলকে পূর্ণাঙ্গভাবে বসবাসযোগ্য করে তুলতে নানা ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা জোরদারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ইতোমধ্যে অবহিত করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, পূর্বাচলের ১ থেকে ৫ নম্বর সেক্টরে নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রাজউকের বিধিমালা অনুযায়ী প্লট বুঝিয়ে দেওয়ার চার বছরের মধ্যে ভবন নির্মাণ না করলে নির্ধারিত হারে জরিমানা আরোপ করা হবে। অর্থাৎ কেউ প্লট পাওয়ার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ শুরু বা সম্পন্ন না করলে তাকে রাজউকের নিয়ম অনুযায়ী জরিমানা গুনতে হবে।

রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ঝিলমিল প্রকল্প নিয়ে এখন সরকারের পরিকল্পনা হলো, কাউকে আর প্লট দেব না, ফ্ল্যাট দেব।