পঞ্চগড়ে ইউনিয়ন পরিষদে উত্তেজনা: প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে উদ্ধার করে পুলিশ
পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাড়িভাসা ইউনিয়ন পরিষদে (ইউপি) একটি বিশেষ সভায় চেয়ারম্যান ও প্রশাসনিক কর্মকর্তার মধ্যে বাগ্বিতণ্ডার ঘটনায় উত্তেজনা ছড়িয়েছে। গত বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত চলা এই ঘটনায় প্রশাসনিক কর্মকর্তা আলিউল ইসলামকে অবরুদ্ধ করে রাখা হলে, পুলিশ তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। এ সময় বিক্ষুব্ধ লোকজন তার দিকে ডিম নিক্ষেপ করেন।
বাগ্বিতণ্ডার সূত্রপাত ও উত্তেজনা বৃদ্ধি
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গতকাল বিকেলে হাড়িভাসা ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে চেয়ারম্যান সাইয়েদ নুর-ই-আলম, প্রশাসনিক কর্মকর্তা আলিউল ইসলাম ও ইউপি সদস্যদের উপস্থিতিতে একটি বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় পরিষদের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে আলোচনা চলাকালে চেয়ারম্যান ও প্রশাসনিক কর্মকর্তার মধ্যে তীব্র বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে উভয়েই উত্তেজিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন এবং চিৎকার-চেঁচামেচি করেন। পরে ইউপি সদস্যরা তাদের শান্ত করে প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে তার কক্ষে নিয়ে যান।
এ সময় প্রশাসনিক কর্মকর্তা চেয়ারম্যানকে মারতে গেছেন—এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে শতাধিক মানুষ জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। তারা আলিউল ইসলামের বিচার দাবি করে তাকে তার কক্ষে অবরুদ্ধ করে রাখেন।
পুলিশের হস্তক্ষেপ ও উদ্ধার অভিযান
খবর পেয়ে পঞ্চগড় সদর থানা-পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে যায়। পুলিশ ইউপি চেয়ারম্যানের সহায়তায় দীর্ঘ সময় ধরে বিক্ষুব্ধ লোকজনকে বোঝানোর চেষ্টা করে। একপর্যায়ে ভিড়ের মধ্যেই প্রশাসনিক কর্মকর্তা আলিউল ইসলামকে তার কক্ষ থেকে বের করে গাড়িতে তোলে পুলিশ। এ সময় বিক্ষুব্ধ লোকজন তাকে লক্ষ্য করে ডিম নিক্ষেপ করেন। পরে তাকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
পঞ্চগড় সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আশরাফুল ইসলাম বলেন, ঘটনার খবর পেয়ে সেখানে পুলিশ পাঠানো হয়। রাতে ইউপি প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে উদ্ধার করে থানায় আনা হয়। পরে তাকে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) প্রতিনিধির জিম্মায় দেওয়া হয়।
চেয়ারম্যান ও কর্মকর্তার বক্তব্য
আলিউল ইসলাম বলেন, ‘চেয়ারম্যান সাহেব বাগ্বিতণ্ডার সময় হঠাৎ করে দাঁড়িয়ে গেলে আমিও দাঁড়াই। পরে ইউপি সদস্যরা আমাদের থামিয়ে আমাকে আমার কক্ষে নিয়ে যায়। চেয়ারম্যান সাহেব জামায়াতে ইসলামীর নেতা হওয়ায় তিনি তার দলের লোকজন ডেকে আমাকে অবরুদ্ধ করান। এমনকি আমি যেন কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারি, এ জন্য আমার মুঠোফোনটিও চেয়ারম্যান নিয়ে নেন। বিক্ষুব্ধ লোকজন আমার কক্ষে ঢুকে আমাকে আঘাত করেছে, এ সময় তারা তিনটি চেয়ার ভেঙেছে। আমার বাঁ চোখের নিচে গালের ওপর তাদের আঘাতে ফুলে গেছে।’
ইউপি চেয়ারম্যান সাইয়েদ নুর-ই-আলম বলেন, ‘আমরা প্রতি মাসে এ ধরনের বিশেষ সভা করি। সভায় আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হচ্ছিল। এ সময় সচিব সাহেব (প্রশাসনিক কর্মকর্তা) আমার ওপর রাগান্বিত হয়ে হঠাৎ করেই দাঁড়িয়ে যান। এ সময় আমিও দাঁড়াই। পরে ইউপি সদস্যরা তাকে থামিয়ে তার কক্ষে নিয়ে যান। বাজারের পাশে আমাদের অফিস হওয়ায় চিল্লাচিল্লি শুনে লোকজন জড়ো হয়। বাইরে হয়তো খবরটা ভিন্নভাবে ছড়িয়েছে। তবে আমি কাউকে ফোন করে আনিনি।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার প্রতিক্রিয়া
সদর ইউএনও ফাহমিদা সুলতানা মুঠোফোনে বলেন, ‘ঘটনার পর রাতে হাড়িভাসা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হোয়াটসঅ্যাপে একটি লিখিত অভিযোগ পাঠিয়েছেন। এ ছাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সচিবেরা (প্রশাসনিক কর্মকর্তারা) আমার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছেন বলে জেনেছি। ইউনিয়ন পরিষদ চালানোর ক্ষেত্রে দুটি পদই গুরুত্বপূর্ণ। দুই পক্ষকে নিয়ে বসে বিষয়টি সমাধান করা হবে।’
উল্লেখ্য, সভা চলাকালে বাগ্বিতণ্ডার সময় কেউ কাউকে আঘাত করেননি বলে চেয়ারম্যান ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা দুজনই দাবি করেছেন। তবে এই ঘটনা স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনিক উত্তেজনা ও জনসমাগমের দিকে ইঙ্গিত করে, যা দ্রুত সমাধানের জন্য পদক্ষেপের আহ্বান জানাচ্ছে।



