কুড়িগ্রামে সরকারি গাছ নিলামে গোপনীয়তা ও অনিয়মের অভিযোগ
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় সরকারি গাছ কাটার জন্য আহ্বান করা নিলাম প্রকাশ্যে না হয়ে গোপনে ও বেনামে সম্পন্ন হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় ইউনিয়ন ভূমি অফিসে এই ঘটনায় উপজেলা সহকারী কমিশনার (এসিল্যান্ড) আরিফুল ইসলামকে জড়িত করা হচ্ছে। এমনকি, নিলামে সর্বোচ্চ দরদাতা ব্যক্তিও জানেন না কখন এবং কোথায় এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।
নিলাম বিজ্ঞপ্তি ও বাস্তবতার পার্থক্য
নিলাম বিজ্ঞপ্তি সূত্রে জানা যায়, কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়ন ভূমি অফিসের নতুন ভবন, পার্কিং ও রাস্তা নির্মাণের জন্য অফিস চত্বরে থাকা ১৭টি মেহগনি ও একটি কাঁঠাল গাছসহ মোট ২১টি গাছ প্রকাশ্য নিলামের মাধ্যমে কেটে অপসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গত ৫ মার্চ প্রকাশ্য নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে গাছ নিলাম কমিটি, যেখানে ১৫ মার্চ ইউনিয়ন ভূমি অফিস চত্বরে নিলাম ডাকের কথা উল্লেখ ছিল। নিলাম ডাক মূল্য নির্ধারণ করা হয় এক লাখ এক হাজার ৪১০ টাকা।
তবে, বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত তারিখে ভূমি অফিস চত্বরে গিয়ে আগ্রহীরা কোনও নিলাম আয়োজন দেখতে পাননি। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, গোপনে নিজ কার্যালয় সদর উপজেলা ভূমি অফিসে বেনামে নিলাম প্রক্রিয়া সেরে ফেলেন এসিল্যান্ড আরিফুল ইসলাম। মাত্র তিনজন ব্যক্তিকে উপস্থিত দেখিয়ে এক লাখ ১২ হাজার টাকায় নিলাম সম্পন্ন দেখানো হয়।
স্থানীয়দের তীব্র অভিযোগ ও দাবি
স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন যে, ‘আর্থিক সুবিধা নিয়ে’ পছন্দের ব্যক্তির কাছে নামমাত্র মূল্যে সরকারি গাছ বিক্রি করতেই এই গোপন নিলাম করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, নিলাম বিজ্ঞপ্তিতে ঘোষিত ২১টি গাছের চেয়ে অতিরিক্ত গাছ কাঁটা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এলাকাবাসীর মতে, ঈদের ছুটির সুযোগ নিয়ে ২৮টি গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে, যার জন্য বাড়তি সুবিধা নিয়েছেন নিলাম সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় বাসিন্দা সাদেকুল ইসলাম মিলন বলেন, “বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশ্য নিলাম হওয়ার কথা ছিল ইউনিয়ন ভূমি অফিসে। কিন্তু, গোপনে নিলাম হয়েছে উপজেলা ভূমি অফিসে। এটা সম্পূর্ণ অনিয়ম এবং দুর্নীতির মাধ্যমে হয়েছে। আমরা শুনেছি, সরকারি রেটের বাইরে অতিরিক্ত টাকা লেনদেন হয়েছে।”
কাঁঠালবাড়ী বাজার সমিতির সাধারণ সম্পাদক নুরুল হক যোগ করেন, “এই নিলাম প্রক্রিয়া ত্রুটিপূর্ণ হয়েছে। এসিল্যান্ড গোপনে তার নিজ অফিসে এই নিলাম করেছেন। নিলামে অংশ নিতে আগ্রহী ব্যক্তিরা এ সম্পর্কে কিছুই জানতে পারেনি। সরকারি অফিস এত বড় দুর্নীতি মেনে নেওয়া যায় না।”
সর্বোচ্চ দরদাতার অজ্ঞতা ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত নুর আলম বলেন, “আমি জানি না কবে কোথায় নিলাম হয়েছে। আমি উপস্থিত ছিলাম না। শুনেছি আমার নামে আমার মামা নিলাম ডাকে অংশ নিয়েছিলেন।” এই অবস্থান নিলাম প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
অতিরিক্ত গাছ কাঁটার কথা আংশিকভাবে স্বীকার করেছেন সদর উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী জুল জালাল। তিনি বলেন, “বন বিভাগ ২১টি গাছ চিহ্নিত করলেও লে-আউটের জন্য দুই-একটি গাছ বেশি কাঁটা হয়েছে। তবে তা এসিল্যান্ড স্যারের অনুমতি সাপেক্ষে।”
গাছ কাঁটার সময় ভূমি অফিসের কোনও কর্মচারী উপস্থিত ছিলেন না, যা ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মঞ্জুরুল ইসলাম স্বীকার করেছেন।
এসিল্যান্ডের প্রতিক্রিয়া ও অস্বীকার
সব অভিযোগ অস্বীকার করে এসিল্যান্ড আরিফুল ইসলাম দাবি করেন, “নিলাম প্রক্রিয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে। যারা নিলামে অংশ নিয়েছেন তাদেরকে আমাদের স্টাফরা সঙ্গে করে ভূমি অফিসে নিয়ে এসে নিলাম ডাক সম্পন্ন করেছি। ২১টি গাছের নিলাম হয়েছে। যদি বেশি সংখ্যক গাছ কাঁটা হয়ে থাকে তাহলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সর্বোচ্চ দরদাতা নিলামে অংশ না নেওয়া প্রশ্নে তিনি বলেন, “কেউ যদি কারও নামে নিলামে অংশ নেন সেটাতো জাস্টিফাই করা সম্ভব নয়। উনি না থাকলে ওনার প্রতিনিধি হয়তো ছিলেন।” তার মতে, তিনি যা করেছেন ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উন্নয়নের জন্য করেছেন, যদিও এই দাবির সত্যতা যাচাই করা যায়নি।
তদন্তের দাবি ও অন্যান্য তথ্য
নিলাম কমিটির সভাপতি ও সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইসমাইল হোসেন ছুটিতে থাকায় তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয়রা এই ঘটনায় একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগের মূল বিষয়গুলো হলো:
- প্রকাশ্য নিলাম না হয়ে গোপনে নিলাম সম্পন্ন করা।
- নিলামে ঘোষিত গাছের চেয়ে অতিরিক্ত গাছ কাটা।
- সর্বোচ্চ দরদাতার নিলাম প্রক্রিয়ায় অনুপস্থিতি ও অজ্ঞতা।
- আইন ও নিয়মনীতির লঙ্ঘন করে তড়িঘড়ি নিলাম করা।
এই ঘটনা সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেছে। স্থানীয় সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে যে, দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে দ্রুত তদন্ত ও শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক।



