কুড়িগ্রামের উলিপুরে ভিজিএফ চাল বিতরণ তালিকায় অনিয়মের অভিযোগে ইউপি চেয়ারম্যান মারধর
ভিজিএফ তালিকা অনিয়মে কুড়িগ্রামে ইউপি চেয়ারম্যান মারধর

কুড়িগ্রামে ভিজিএফ তালিকা নিয়ে সংঘাত: ইউপি চেয়ারম্যান মারধরে আহত

কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলায় পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে সরকারি খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির (ভিজিএফ) চাল বিতরণের তালিকা তৈরিতে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এই অনিয়মের জেরে বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বিকালে ধরনীবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এরশাদুল হকের ওপর সদস্যদের অংশগ্রহণে হামলার মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হামলায় গুরুতর আহত চেয়ারম্যানকে চিকিৎসার জন্য রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

তালিকা তৈরির প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ

উলিপুর উপজেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিস সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ঈদুল ফিতর উপলক্ষে অসহায় ও দুস্থ ব্যক্তিদের মধ্যে ১০ কেজি করে চাল বিতরণের কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। ধরনীবাড়ি ইউনিয়নে মোট ৬ হাজার ৮০০ ব্যক্তি এই সুবিধা পাওয়ার কথা রয়েছে। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যরা সুবিধাভোগীদের চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করছেন।

স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, ইউনিয়ন পরিষদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক বৃহস্পতিবার দুপুরে ৪, ৫ ও ৬ নং ওয়ার্ডের সুবিধাভোগীদের তালিকা তৈরির জন্য যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা ছিল। এই প্রক্রিয়ায় ইউপি সদস্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের উপস্থিতি নিশ্চিত করার নির্দেশনা ছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ও সুবিধা প্রত্যাশী মানুষ এসে দেখেন যে তালিকা তৈরির কাজ ইতিমধ্যেই শেষ হয়ে গেছে।

হামলার ঘটনা ও উত্তেজনার পটভূমি

সুবিধাভোগী বাছাইয়ে সুস্পষ্ট অনিয়মের অভিযোগ তুলে তারা চেয়ারম্যান এরশাদুল হকের সঙ্গে তীব্র বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে এই বাগবিতণ্ডা হাতাহাতি ও মারপিটের রূপ নেয়। হামলাকারীরা চেয়ারম্যানকে নির্মমভাবে মারধর করেন, যার ফলে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরিবারের সদস্যরা তাকে দ্রুত চিকিৎসার জন্য রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।

ধরনীবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের এক সূত্র দাবি করে, অতীতে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকায় চেয়ারম্যান এরশাদুল হকের সঙ্গে কয়েকজন ইউপি সদস্য ও স্থানীয়দের দীর্ঘদিন ধরে ঝামেলা চলছিল। তারা চেয়ারম্যানকে ধরার একটি সুযোগ খুঁজছিলেন এবং তালিকা তৈরির অনিয়মের অভিযোগে সেই ক্ষোভ প্রকাশ করে।

ইউপি সদস্য ও আহত চেয়ারম্যানের বক্তব্য

ধরনীবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শাহজাহান আলী বলেন, ‘পরিষদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক সবার সমন্বয়ে দুস্থদের তালিকা তৈরির কথা থাকলেও চেয়ারম্যান তার অনুসারীদের নিয়ে আগেই তালিকা তৈরি করেন। এ ঘটনায় বঞ্চিত লোকজন ক্ষিপ্ত হয়ে চেয়ারম্যানের কাছে অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।’ তিনি দাবি করেন যে ইউপি সদস্যরা চেয়ারম্যানের ওপর হামলা করেননি।

আহত চেয়ারম্যানের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা সম্ভব না হলেও তার ছোট ভাই ওবায়দুল হক বলেন, ‘স্বচ্ছ তালিকা তৈরির জন্য উদ্যোগ নিলেও ইউপি সদস্যরা ক্ষিপ্ত হয়ে তাদের অনুসারীদের নিয়ে চেয়ারম্যানের ওপর হামলা চালিয়েছেন। চিকিৎসা শেষে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।’

প্রশাসন ও পুলিশের বক্তব্য

উলিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাঈদ ইবনে সিদ্দিক বলেন, ‘খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। কোনো প্রকার অভিযোগ পেলে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রস্তুত আছি।’

উলিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহামুদুল হাসান সন্ধ্যায় বাংলা ট্রিবিউনকে নির্মিত করে বলেন, ‘চেয়ারম্যানের ওপর হামলার কথা শুনেছি। পরিষদের ইউপি সদস্যের সঙ্গে তার ঝামেলা চলছিল। সম্ভবত তালিকায় নিজেদের পছন্দের লোকজনের নাম থাকা না থাকা নিয়ে ঝামেলা। বিস্তারিত এখনও জানা যায়নি। কোনো অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এই ঘটনায় স্থানীয় পর্যায়ে ভিজিএফ কর্মসূচির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে দুস্থদের জন্য নির্ধারিত সহায়তা সঠিক হাতে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।