নওগাঁয় প্রভাবশালীদের অবৈধ দখলে সরকারি পুকুর, কোটি টাকা রাজস্ব বঞ্চিত সরকার
নওগাঁ জেলার রাণীনগর উপজেলায় সরকারের রাজস্বভুক্ত মোট পুকুরের সংখ্যা ৫৮৫টি। তবে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, এর মধ্যে একটি সংগঠিত চক্র প্রায় ১১৫টি পুকুর জনস্বার্থে ও স্থানীয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের নাম করে আদালতে মামলা দায়ের করে বছরের পর বছর ধরে অবৈধভাবে ভোগদখল করে আসছে। এই চক্রের সদস্যরা বাদী হয়ে মামলা করে পুকুরগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে অন্যের কাছে ইজারা দিয়ে অঢেল অর্থ উপার্জন করছেন, অথচ সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
মামলার ছত্রছায়ায় লুটপাট
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করে দেখা গেছে, যে পুকুর থেকে সরকার বর্তমানে ৫ লাখ টাকা ইজারা পেতে পারত, মামলার জটিলতায় সেই পুকুর অন্যরা বাদীর কাছ থেকে নামমাত্র মূল্যে ইজারা নিয়ে ভোগ করছেন। ইজারার এই অর্থ সরকারকে দেওয়া হচ্ছে না, বরং জনসাধারণের নাম ভাঙিয়ে সমাজের প্রভাবশালীরা লাভবান হচ্ছেন। অপরদিকে, সরকার যুগের পর যুগ ধরে মামলার কারণে পুকুরগুলো ইজারা দিতে না পারায় কোটি কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে, যা স্থানীয় উন্নয়নে ব্যয় হতে পারত।
স্থানীয় প্রতিক্রিয়া ও বাস্তবতা
এলাকা ঘুরে জানা গেছে, মামলাভুক্ত পুকুর থেকে আয় হওয়া অর্থের সামান্য অংশও স্থানীয় মসজিদ, মাদ্রাসা বা মন্দিরের উন্নয়নে ব্যয় করা হয় না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কমিটির সদস্যরা জানান, প্রতিষ্ঠানের নামে বা জনসাধারণের ব্যবহারের অজুহাতে পুকুরগুলো নিয়ে মামলা করা হলেও আয়ের অর্থ প্রভাবশালীদের পকেটেই চলে যায়। কখনো নামমাত্র কিছু অর্থ পাওয়া গেলেও অনেক বছর তাও আসে না, ফলে প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে।
উপজেলা প্রশাসনের কার্যক্রম
আশার কথা হলো, ইতিমধ্যে উপজেলা প্রশাসন এই অবৈধ দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়েছে। যেসব পুকুর জনসাধারণের নামে মামলা করে অন্যের কাছে ইজারা দেওয়া হচ্ছে, সেগুলোর তালিকা তৈরি করে সেগুলো জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করতে কার্যক্রম শুরু করেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাকিবুল হাসান জানান, পুকুরগুলোর চলমান মামলা নিষ্পত্তি করে দ্রুত ইজারার আওতায় আনতে আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এ পর্যন্ত ৩১টি পুকুরের তালিকা করা হয়েছে, যা উদ্ধার করে সঠিক কমিটির কাছে হস্তান্তর করা হবে।
নির্দিষ্ট মামলার উদাহরণ
উপজেলার কালীগ্রাম ইউনিয়নের রামজীবনপুর মৌজার ২৮০ নম্বর দাগে ১.৭০ একর পুকুরটি ১৯৮৮ সালে জনস্বার্থে ব্যবহার ও স্থানীয় মসজিদ-মাদ্রাসার উন্নয়নের নামে মামলা করা হয়। এরপর থেকে পুকুরটি ইজারার আওতায় আসেনি। ২০০৮ সালে রামজীবনপুর গ্রামের দবির উদ্দিনের ছেলে মোজার আলী জনসাধারণের পক্ষে পুনরায় মামলা (মামলা নং ১৭৮/২০০৮ অ: প্র:) দায়ের করলে এখন পর্যন্ত বাদী ভোগদখল করে আসছেন। একই ইউনিয়নের আমগ্রাম মৌজার আটটি পুকুরের ওপর ২০০৭ সালে আব্দুল জব্বার বাদী হয়ে মামলা (মামলা নং ১৮১/২০০৭ অ: প্র:) দায়ের করেন, যার পর থেকে পুকুরগুলো তার ছেলে আব্দুল খালেক ভোগদখল করছে। মামলার রায় বাদীর অনুকূলে যাওয়ায় সরকারের পক্ষে পুকুরগুলো ইজারার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।
রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিবাদ
উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, "রাষ্ট্রীয় সম্পদ কারো একার ভোগের জন্য নয়। যারা মিথ্যে মামলা দিয়ে বছরের পর বছর সরকারের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে খাস পুকুরগুলো ভোগদখল করে আসছে, তাদেরকে আইনের আওতায় আনার কোনো বিকল্প নেই।" তার এই বক্তব্য স্থানীয় জনগণের ক্ষোভ ও প্রত্যাশাকে প্রতিফলিত করে, যারা দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধতা দেখে আসছেন।
সর্বোপরি, রাণীনগর উপজেলায় সরকারি পুকুরের অবৈধ দখল ও রাজস্ব বঞ্চনার এই সমস্যা সমাধানে উপজেলা প্রশাসনের আইনি পদক্ষেপ আশা জাগাচ্ছে। তবে স্থানীয় প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
