এলজিইডির ২৫৭ সহকারী প্রকৌশলীর পদোন্নতির প্রস্তাব: উচ্চ আদালতের স্থিতাবস্থার মধ্যেই গোপন পাঁয়তারা
এলজিইডির ২৫৭ প্রকৌশলীর পদোন্নতি প্রস্তাব: গোপন পাঁয়তারা

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকল্প থেকে বিধিবহির্ভূতভাবে রাজস্ব খাতে নিয়োগকৃত ২৫৭ জন সহকারী প্রকৌশলীকে গোপনে পদোন্নতি দেওয়ার পাঁয়তারা চলছে। উচ্চ আদালতের স্থিতাবস্থার মধ্যেই এই পদোন্নতির প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, যা সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় নতুন আলোচনার সূত্রপাত করেছে।

প্রধান প্রকৌশলীর চিঠি ও প্রস্তাবের বিস্তারিত

এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) বেলাল হোসেন গত ১০ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে একটি দাপ্তরিক পত্র পাঠিয়েছেন। এই চিঠিতে তিনি এলজিইডির সাংগঠনিক কাঠামোভুক্ত ৫ম গ্রেডের নির্বাহী প্রকৌশলী বা সমমানের পদ চলতি দায়িত্বের মাধ্যমে পূরণের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি প্রকল্প থেকে আসা বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও সমমর্যাদার পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়ার পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন।

পদ শূন্যতার পরিসংখ্যান ও যুক্তি

বেলাল হোসেনের চিঠিতে বলা হয়েছে, এলজিইডির সাংগঠনিক কাঠামোতে রাজস্ব বাজেটভুক্ত নির্বাহী প্রকৌশলীর ১৬৮টি পদ রয়েছে, যার মধ্যে ১১৪টি শূন্য। এই পদগুলো জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী ৫ম গ্রেডের, যার বেতনক্রম ৪৩ হাজার থেকে ৬৯ হাজার ৮৫০ টাকা। এছাড়া উন্নয়ন বাজেটভুক্ত বিভিন্ন প্রকল্পে নির্বাহী প্রকৌশলী বা উপ-প্রকল্প পরিচালক ও উপ-পরিচালকের পদ রয়েছে ১১২টি, যার মধ্যে ১৬টি প্রেষণে পূরণ করা হয়েছে। সব মিলে বর্তমানে ২১০টি পদ শূন্য রয়েছে।

প্রস্তাবের আরেক অংশে উল্লেখ করা হয়েছে, কর্মকর্তাদের যোগদানের ভিত্তিতে ইতোপূর্বে ৩৩৩ জনের পদোন্নতি প্রদান করা হয়েছে, কিন্তু পরবর্তীতে জ্যেষ্ঠতা নিয়ে মামলা চলমান থাকায় পদোন্নতি দেওয়া যায়নি। পদগুলো দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় চলতি দায়িত্ব প্রদানের মাধ্যমে পূরণ করার বিষয়টি বিবেচনাযোগ্য বলে মনে করা হচ্ছে। প্রস্তাবিত শূন্য পদগুলোর কারণে বিভাগ, অঞ্চল ও সদর দপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ

বঞ্চিত কর্মকর্তারা মনে করছেন, কৌশলে প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেন বিধিবহির্ভূতভাবে প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত ২৫৭ জন সহকারী প্রকৌশলীকে ৫ম গ্রেডে দায়িত্ব দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এই পদোন্নতি প্রক্রিয়া যদি গোপনে সম্পন্ন হয়, তাহলে তা প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত পদোন্নতি প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে এবং অন্যান্য যোগ্য কর্মকর্তাদের প্রতি অবিচার সৃষ্টি করতে পারে।

মন্ত্রণালয় ও প্রধান প্রকৌশলীর প্রতিক্রিয়া

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. রেজাউল মাহমুদ জাহেদী মঙ্গলবার এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, সহকারী প্রকৌশলীদের পদোন্নতির বিষয়ে আলোচ্য আবেদন সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না। তার এই মন্তব্য প্রস্তাবের গোপনীয়তা ও স্বচ্ছতার অভাবকে ইঙ্গিত করে।

অন্যদিকে, এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) বেলাল হোসেনের বক্তব্য নিতে মঙ্গলবার তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। পরে বিষয়বস্তু উল্লেখ করে ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি, যা এই প্রস্তাব নিয়ে আরও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

প্রভাব ও সম্ভাব্য ফলাফল

এই পদোন্নতি প্রস্তাব যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে তা এলজিইডির অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক কাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে পারে। এটি নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিধিবহির্ভূত পদ্ধতির একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে, যা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন তুলছে। উচ্চ আদালতের স্থিতাবস্থা সত্ত্বেও এই প্রস্তাব এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা আইনি ও নৈতিক দিক থেকে বিতর্কিত হতে পারে।

স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাদের অনুমোদন ছাড়া এই পদোন্নতি সম্ভব নয়। ভবিষ্যতে এই বিষয়ে আরও তদন্ত ও আলোচনা হতে পারে, যা সরকারি কর্মকর্তাদের পদোন্নতি নীতিতে সংস্কারের দাবি জোরালো করতে পারে।