ফরিদপুরে হাটবাজার ইজারা টেন্ডারে বিএনপি কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ ও বাধার অভিযোগ
ফরিদপুর পৌরসভার হাটবাজার ইজারার টেন্ডারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে যে, বিএনপি ও তার অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা এই টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করেছেন। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ফরিদপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয় ও পৌরসভা কার্যালয়ের সামনে তাদের অবস্থান এবং একাধিক দরপত্রদাতাকে বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
টেন্ডার প্রক্রিয়া ও সময়সীমা
ফরিদপুর পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, পৌর এলাকার ১৫টি হাটবাজার ও পৌর বাস টার্মিনালের বার্ষিক ইজারার জন্য গত ১৮ জানুয়ারি দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। পরবর্তীতে ২ ফেব্রুয়ারি সংশোধিত বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়, যেখানে দরপত্র বিক্রয়ের শেষ সময় ছিল সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) এবং মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১টা পর্যন্ত। এই সময়ের মধ্যে মোট ৪১টি দরপত্র জমা পড়ে এবং বিকাল ৩টায় দরপত্র উন্মুক্ত করা হয়। দরপত্র দাখিলের জন্য জেলা প্রশাসক কার্যালয় ও পৌরসভা কার্যালয়ে পৃথক দুটি বুথ স্থাপন করা হয়েছিল।
দরপত্রদাতাদের অভিযোগ ও বাধার ঘটনা
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ঠিকাদার ও দরপত্রদাতা জানিয়েছেন, সকাল থেকে বুথ দুটির আশপাশে বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদলসহ অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা অবস্থান নিয়েছিলেন। জেলা প্রশাসক কার্যালয় চত্বরে মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব গোলাম মোস্তফা মিরাজ এবং পৌরসভা কার্যালয়ে জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। দরপত্রদাতারা অভিযোগ করেন যে, কেউ দরপত্র জমা দিতে গেলে গেট থেকেই বাধার সম্মুখীন হন, যা টেন্ডার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
এক দরপত্রদাতা আনিসুজ্জামান বলেন, ‘দরপত্র জমা দেওয়ার শুরু থেকেই দুটি বুথ এলাকার সামনে ও আশপাশে বাধা দেওয়া হয়। উন্মুক্তভাবে আগ্রহী সবাই অংশগ্রহণ করতে পারলে আরও অনেকে টেন্ডারে অংশ নিতে পারতেন, যা স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতো।’ তবে তিনি কারা বাধা দিয়েছেন সে বিষয়ে বিস্তারিত বলতে অপরাগতা প্রকাশ করেন।
অন্য এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স আলাউদ্দিন ট্রেডিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘দুপুর ১টার আগে টেপাখোলা গরুর হাটের দরপত্র জমা দিতে গিয়ে প্রচুর ভিড় দেখি। প্রবেশপথে শতাধিক ব্যক্তির অবস্থান পরিবেশকে অস্বস্তিকর করে তুলেছিল, তাই আমি দরপত্র জমা না দিয়েই ফিরে আসি।’
বিএনপি নেতাদের বক্তব্য
মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব গোলাম মোস্তফা মিরাজ বলেন, ‘আমি দুপুর সাড়ে ১২টায় নিজের ক্রয়কৃত দরপত্র জমা দিতে গিয়েছিলাম। ভিড়ের মধ্যে আমিই হিমশিম খেয়েছি। ডিসি অফিসে আমার যাওয়ার আগে কিছু হয়েছে কিনা জানি না, তবে পরে সবাইকে দরপত্র জমা দেওয়ার কথা বলেছি। পৌরসভার দিকে কী ঘটেছে, তা বলতে পারবো না।’
জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন মিয়া বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে বলেন, ‘আমার নিজের একটি দরপত্র জমা দিতে পৌরসভায় গিয়েছিলাম। সেখানে কাউকে বাধা দেওয়ার কোনও ঘটনা ঘটেনি।’
পৌরসভা ও প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া
ফরিদপুর পৌরসভার সচিব তানজিলুর রহমান জানান, ১৫টি হাটবাজারের বিপরীতে ৪১টি শিডিউল জমা পড়েছে। বাধা দেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘সেটি আমাদের পৌর কার্যালয়ে বা ডিসি অফিসে হয়নি। এর বাইরে হয়েছে কিনা, তা আমার জানার বিষয় নয়।’
পৌর প্রশাসক ও স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. সোহরাব হোসেন বলেন, ‘সকাল থেকে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত সবাই দরপত্র জমা দিয়েছেন। কোনও বাধার অভিযোগ পাইনি। তবে নির্ধারিত সময়ের পর একদল জমা দিতে এসেছিল, তাদেরটা নেওয়া হয়নি। সব নিয়ম মেনেই স্বচ্ছভাবে টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ করা হবে।’
এই ঘটনায় টেন্ডার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, যা স্থানীয় ব্যবসায়ী ও নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
