বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা সিটির আওতায় আনতে সরকারের সিদ্ধান্ত
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা সিটির আওতায় আনছে সরকার

বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে সরকার। গত ৭ মে মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে এলাকাটি বসুন্ধরা গ্রুপের নিজস্ব আইনে পরিচালিত হচ্ছিল, যা অনেকের মতে 'রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটি রাষ্ট্র' হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল।

বসুন্ধরা গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ ও অভিযোগ

প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ব্যক্তিমালিকানায় জমি কিনতে গেলে বসুন্ধরা গ্রুপের আবাসন কোম্পানিকে কাঠাপ্রতি অতিরিক্ত ৫ লাখ টাকা দিতে হয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগে এই হার ছিল ১০ লাখ টাকা। এছাড়া বসুন্ধরা ওয়েলফেয়ার সোসাইটি ফ্ল্যাটমালিকদের কাছ থেকে সার্ভিস চার্জ আদায় করে, যা সরকার নির্ধারিত গৃহকরের বাইরে। এলাকায় নিজস্ব নিরাপত্তাবাহিনী রয়েছে এবং সিটি করপোরেশন গৃহকর নিতে পারে না।

সরকারের পদক্ষেপ

বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মার্চ মাসে বসুন্ধরাকে সিটির আওতায় আনার নির্দেশ দেন। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় একটি প্রতিবেদন তৈরি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠায়। ৭ মে মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রস্তাব পাস হয় এবং ১৩ মে প্রধানমন্ত্রী নথি অনুমোদন করেন। সিদ্ধান্তে বলা হয়, গেজেটভুক্ত সব এলাকায় সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, রাজউক ও অন্যান্য সংস্থা স্ব স্ব আইন অনুযায়ী কার্যক্রম চালাবে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বসুন্ধরা গ্রুপের বক্তব্য

বসুন্ধরা গ্রুপের মিডিয়া অ্যাডভাইজার আব্দুল বারী জানান, তারা সরকারের সিদ্ধান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। কাঠাপ্রতি টাকা নেওয়ার বিষয়ে তারা দাবি করে, রাস্তাঘাট, সেতু, সড়কবাতি ও অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজের জন্য কিছু টাকা নেওয়া হয়, তবে তা অতিরিক্ত নয়। তারা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে এলাকা হস্তান্তরে সময় চেয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাজউকের অবস্থান

রাজউকের চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম জানান, বসুন্ধরার সঙ্গে রাজউকের কোনো সমঝোতা চুক্তি নেই। রাজউক বসুন্ধরাকে চিঠি দিয়ে এলাকা সিটি করপোরেশনের কাছে বুঝিয়ে দিতে বলেছে।

বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতা

এলাকার বাসিন্দারা জানান, বসুন্ধরা গ্রুপ নিজেদের মতো করে নিয়ম চালায়। কেউ জমি কিনলে বাড়তি টাকা দিতে হয়। সার্ভিস চার্জের হার ফ্ল্যাটের আকার ও ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে। বাসিন্দাদের মতে, বসুন্ধরা 'রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র' হিসেবে কাজ করছে।

নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ

বসুন্ধরায় নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মী বাহিনী রয়েছে। প্রবেশের পাঁচটি পথের মধ্যে চারটি রাত ১২টার পর বন্ধ হয়। বাসিন্দারা নিরাপত্তার নামে হয়রানির অভিযোগ করেন। সম্প্রতি এক আইনজীবী হত্যাকাণ্ড ও রিকশাচালকের মৃত্যু ঘটনা আলোচনায় এসেছে।

নগর পরিকল্পনাবিদের মতামত

নগর-পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র থাকতে পারে না। উন্নয়নকাজ শেষে প্রকল্প সরকারি কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়া আইনসিদ্ধ। বসুন্ধরাকে সিটির আওতায় আনার উদ্যোগ যথাযথ।

আইনি প্রক্রিয়া

বেসরকারি আবাসিক প্রকল্পের ভূমি উন্নয়ন বিধিমালা (২০০৪) অনুযায়ী, প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন ১০ বছরের মধ্যে শেষ করতে হবে। বসুন্ধরাকে প্রথম লে-আউট প্ল্যান অনুমোদন দেওয়া হয় ১৯৮৭ সালে। পরে একাধিকবার সংশোধিত প্ল্যান অনুমোদন নেওয়া হয়। রাজউক সম্প্রতি নাগরিক সুবিধার জন্য সংরক্ষিত জমি সিটির কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দিয়েছে।

বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকের অবস্থা

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের তদন্ত শুরু করে দুদক। তাদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। বসুন্ধরা গ্রুপের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে দুটি মামলা চলছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান জানান, বসুন্ধরাকে পরিবেশবান্ধব রেখে সিটি করপোরেশন কার্যক্রম পরিচালনা করবে। এলাকায় পৃথক পুলিশ থানা স্থাপন ও নাগরিক সেবা উন্মুক্ত করা হবে।