সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়: তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের আইনি যাত্রা
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল: সুপ্রিম কোর্টের রায়

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার পুনর্বহাল: সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রায় তিন দশক আগে যুক্ত হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল করেছেন। গত বছরের ২০ নভেম্বর ঘোষিত ও ১২ মার্চ প্রকাশিত ৭৪ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ে আপিল বিভাগ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানের কোনো সাধারণ সংশোধনী ছিল না, বরং এটি ছিল সামাজিক চুক্তির সমঝোতা ও বিস্তৃত জাতীয় ঐকমত্যের ফসল।

ত্রয়োদশ সংশোধনীর আইনি যাত্রা

নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাসংবলিত বিধান অন্তর্ভুক্ত করে ১৯৯৬ সালের ২৮ মার্চ সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী আনা হয়েছিল। এই সংশোধনীর বৈধতা নিয়ে রিট হলে হাইকোর্ট তা বৈধ ঘোষণা করেন। তবে পরবর্তীতে ২০১১ সালের ১০ মে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে (৪ : ৩) ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে রায় দেন।

এই রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল ও পুনর্বিবেচনা আবেদন নিষ্পত্তি করে গত বছরের ২০ নভেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের আপিল বিভাগ সর্বসম্মতিতে নতুন রায় ঘোষণা করেন। রায়ে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে:

  • ২০১১ সালের রায়টি একাধিক কারণে ক্রটিপূর্ণ ছিল
  • ত্রয়োদশ সংশোধনী প্রণয়ন ছিল সার্বভৌম ইচ্ছার সরাসরি নির্দেশ
  • এটি সংসদের সুনির্দিষ্ট নির্বাচনী ম্যান্ডেট অনুসরণ করে সর্বাধিক সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে প্রণীত হয়েছিল

রায়ের মূল বক্তব্য ও প্রভাব

আপিল বিভাগের রায়ে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে 'অগণতান্ত্রিক' বলে যুক্তি দেওয়া মানে গণতন্ত্রের ধারণাকে ভুলভাবে বোঝা। রায়ে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ত্রয়োদশ সংশোধনী কোনো নিয়মিত আইন প্রণয়নই ছিল না, বরং এটি ছিল একটি বিস্তৃত জাতীয় ঐকমত্যের ফসল

২০১১ সালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করেছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তাঁর পক্ষে শুনানি করা জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির প্রথম আলোকে জানান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিধান পুনর্বহাল করেছেন আপিল বিভাগ।

মনির আরও বলেন, 'বিধানটি ছিল সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হবেন। তবে বর্তমান ত্রয়োদশ সংসদের মেয়াদ শেষে এটি কার্যকর হবে।'

ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

মোহাম্মদ শিশির মনির সতর্ক করে দিয়ে বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনী মামলার রায়ের সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত। এই মামলা এখন আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে এবং এই মামলা নিষ্পত্তি না হলে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পরিপূর্ণভাবে কার্যকর সম্ভব নয়।

তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এ বিষয়ে বর্তমান সংসদ সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনতে পারে। এই রায় বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে, যা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার ভূমিকা পুনর্বিবেচনার দরজা খুলে দিয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের এই ঐতিহাসিক রায় প্রকাশের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাংবিধানিক আইনের একটি জটিল অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলেও, ভবিষ্যতে এর বাস্তবায়ন ও প্রয়োগ নিয়ে আইনি ও রাজনৈতিক আলোচনা অব্যাহত থাকবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।