বাংলাদেশের জিডিপি দক্ষিণ এশিয়ার সর্বনিম্ন উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “আগামী দুই বছর কঠিন যাবে। এই কঠিন অবস্থা থেকে বের হতে হলে অনেক অপ্রিয় ও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে সরকারকে।” পরিস্থিতি সামাল দিতে আগামী দুই বছর অর্থনৈতিক সুরক্ষা বা সেফটি মার্জিন চেয়েছেন তিনি। ২০০৫ সাল থেকে বিএনপি ধারাবাহিকভাবে ক্ষমতায় থাকলে জিডিপি ভারতের উপরে চলে যেতো বলেও সংসদকে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
অর্থনীতির বর্তমান চিত্র
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ২৫তম দিনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় তিনি এসব কথা জানান। অর্থমন্ত্রী বলেন, “এই মুহূর্তে বাংলাদেশের অর্থনীতি কোথায় দাঁড়িয়ে আছে— এর দুই-চারটা পরিসংখ্যান জানা দরকার। আমাদের সবার জানা দরকার, জনগণের জানা দরকার, আমাদের বিরোধী দলের বন্ধুদের জানা দরকার। এই কারণে আমাদের আপনাদের সহযোগিতা লাগবে দেশটি তো আমাদের সবার। দেশ আমাদের সবার এবং আমরা সবাই অনেক আশায় এখানে এসেছি।”
জিডিপি ও করের হার
দেশের অর্থনৈতিক চিত্র তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, “বর্তমান প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক কিছু চিত্র আমি তুলে ধরছি আপনাদের। যে জিডিপি ট্যাক্সের সঙ্গে জিডিপি ট্যাক্স এবং প্রবৃদ্ধির যে সংখ্যা সেখানে এখন ৭ শতাংশের নিচে নেমে এসেছি। এটা দক্ষিণ এশিয়াতে সর্বনিম্ন এবং বিশ্বের প্রায় সবগুলো দেশের মধ্যেও সর্বনিম্নের দিকে আছে। বিএনপি যখন ক্ষমতা ছেড়ে আসছিল ২০০৫-০৬ সালে ট্যাক্স এসেছিল ১০ শতাংশ। ক্রমান্বয়ে প্রবৃদ্ধি হচ্ছিলো— হয়তো বিএনপি অব্যাহতভাবে (ক্ষমতায়) থাকলে ভারতের ওপরেও চলে যেতো।”
দারিদ্র্যের হার
বর্তমানে দারিদ্রের হার নিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, “দারিদ্রের হার ২০২২ সালে ছিল ১৭ থেকে ১৮ শতাংশ, ২০২৩ সালে ছিল ১৯ শতাংশ, ২০২৪ সালে ছিল ২০ দশমিক ৫ শতাংশ ২০২৫ সালে দারিদ্রের হার হচ্ছে পিপিআর অনুসারে ২৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ। এই মুহূর্তের দারিদ্রের হারে কোথায় আছি এটা আমাদেরকে অনুধাবন করতে হবে। মানে যেটা নিম্নগতি ছিল— দারিদ্রের হার এখন উপরের দিকে উঠছে। এভাবে বেসরকারি খাতের ঋণ অর্থাৎ বেসরকারি খাতের ঋণ যত বাড়বে তাতে উৎপাদন বাড়বে, বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান বাড়বে।”
বেসরকারি খাতের ঋণ
বেসরকারি খাতের উন্নয়ন বাড়ানোর কথা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, “বেসরকারি খাতে জিডিপির ৬ শতাংশ নেমে এসেছে। ২০০৫-০৬ সালে বিএনপি থাকার সময় এটা ছিল ১৮ দশমিক ২৭ শতাংশ, এখন ৬ শতাংশ। সুতরাং আমরা কোথায় আছি অর্থনৈতিকভাবে বোঝার ব্যাপার আছে।”
রপ্তানি ও আমদানি
রপ্তানির চিত্র তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, “রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক ৬ শতাংশ। আমাদের রপ্তানি কিন্তু সবসময় প্রবৃদ্ধি ছিল সবসময় আগাগোড়া গত ২০ বছর ধরে। এটা ২ দশমিক ৬ শতাংশ কমে গেছে। বিএনপি যখন ক্ষমতা ছাড়ে তখন রপ্তানির প্রবৃদ্ধি ছিল ১৪ শতাংশ। এখন হচ্ছে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশ।” আমদানি পরিস্থিতির তথ্য তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, “মূলধনী যন্ত্রপাতি যেগুলো আমাদের ক্যাপিটাল মেশিনারি আমরা আমদানি করি। এটার ওপর বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, প্রবৃদ্ধি। মূলধনী যন্ত্রপাতি বর্তমানে ঋণাত্মক— মাইনাস ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ। আর আমরা বিএনপির শেষ সময়ে ছিল ২০০৪-০৫ সালে ৫৩ শতাংশ— ৫৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ছিল। এখন ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ ঋণাত্মক— এটা হচ্ছে নেগেটিভ।”
খেলাপিঋণ
খেলাপিঋণ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, “খেলাপিঋণের কথা অনেকে বলেছেন— আমরা বলছি, সবাই বলছি বর্তমানে ৩০ শতাংশের অধিক খেলাপিঋণ। কঠিন অবস্থা ৩০ শতাংশের অধিক যখন একটা দেশের খেলাপিঋণ হয় তখন অর্থনীতির গতি অলমোস্ট থেমে যাওয়ার অবস্থায় চলে আসে। আমরা যখন ২০০৫-এ ছিলাম ১৩ শতাংশ এখন ৩০ শতাংশ পার হয়ে গেছে। খেলাপিঋণ সবসময় থাকবে। তবে যে জায়গায় আমরা গেছি এটা এখান থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন।”
ভর্তুকি পরিস্থিতি
ভর্তুকি নিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, “বিদ্যুতে ৩৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। কারণ লুটপাট— বিদ্যুৎ খাতে যে লুটপাট হয়েছে বিগত দিনে তার ক্ষতি এখন আমাদের সবাইকে বহন করতে হচ্ছে। ৩৬ হাজার কোটি টাকা আমরা দিচ্ছি। দেওয়ার পর আরও ২০ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। অবস্থা বুঝেছেন অর্থনীতি কোথায়? আমাদের ফিসক্যাল স্পেস কত কমে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। আমাদের সব সংসদ সদস্যের দাবি এলাকাতে টাকা দিতে হবে, এলাকায় উন্নয়ন করতে হবে। এই দাবি থাকবেই— স্বাভাবিক। আমরা জনগণকে রিপ্রেজেন্ট করি— এ দাবি তো থাকবে। কিন্তু আমি বলছি আমাদের ফিসক্যাল স্পেস কমতে কমতে কোথায় নিয়ে এসছে বিগত সরকার।”
আগামী দুই বছরের পরিকল্পনা
সতর্কবার্তা দিয়ে তিনি বলেন, “আগামী দুই বছর আমাদের জন্য কুশন (সুরক্ষা বা সেফটি মার্জিন) লাগবে। এই কঠিন অবস্থা থেকে বের হতে হলে অনেক অপ্রিয় ও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। আমি বিরোধী দলের বন্ধুদের বলবো, সংকীর্ণ রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে দেশের স্বার্থে আমাদের সহযোগিতা করুন। আমরা অবশ্যই এই সংকট কাটিয়ে উঠবো।”



