জুলাই সনদ বাস্তবায়নে উত্তাপ: সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে বিরোধী দলের হুঁশিয়ারি
জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন প্রশ্নে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ তৈরি হচ্ছে। প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে আজ রোববারের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকার দাবি জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য। না হলে রাজপথে আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা। অন্যদিকে সরকারি দল বিএনপি বলেছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে সংসদে আলোচনা হতে পারে।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনে সময়সীমা উত্তীর্ণ
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুসারে, আজ সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকার শেষ দিন। নির্বাচনে জয়ী ব্যক্তিরা একই দিন দুটি শপথ নেওয়ার কথা। একটি সংসদ সদস্য হিসেবে; অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান ছিল গত ১৭ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন দুটি শপথের প্রস্তুতি রেখেছিল সংসদ সচিবালয়। জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ বিরোধী দলের সদস্যরা দুটি শপথই নিয়েছেন। কিন্তু বিএনপি থেকে নির্বাচিতরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। তাঁরা বলেছেন, সংবিধান সংস্কান পরিষদের সদস্যদের শপথের বিষয়ে সংবিধানে কিছু নেই। ভবিষ্যতে এটি যুক্ত হলে তখন শপথের বিষয়টি আসবে। এর পর থেকে সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে রাজনীতিতে আলোচনা চলছে।
বিরোধী দলের অবস্থান ও হুঁশিয়ারি
গতকাল শনিবার বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) ১১-দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির জরুরি বৈঠকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ সাংবাদিকদের বলেছেন, ১৫ মার্চ সরকারের ৩০ দিন পূর্ণ হবে। এর মধ্যে যদি সরকার জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন না ডাকে বা ডাকার ব্যবস্থা না করে, তাহলে তারা জাতির কাছে ক্ষমা পাবে না। সংসদ নেতাসহ সরকারকেই এর দায়দায়িত্ব নিতে হবে।
হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথের আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবে ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য। শিগগিরই শীর্ষ নেতারা বৈঠক করে আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করবেন। ১১-দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক বলেন, একই দিনে দুটি ভোট হয়েছে, দুটি অধিবেশনই ডাকার কথা। কিন্তু অধিবেশন ডাকা হয়েছে শুধু জাতীয় সংসদের। বিএনপির সংসদ সদস্যরা দলীয় সিদ্ধান্তে সংসদ সদস্যের শপথ নিলেও সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি। এতে বোঝা যায়, বিএনপি সরকার গঠনের পর তাদের আগের অবস্থান থেকে ইউটার্ন নিয়েছে, সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে চলে গেছে।
বিএনপির ভিন্নমত ও সংসদীয় আলোচনার সম্ভাবনা
জুলাই সনদে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি সংবিধান-সম্পর্কিত। এর মধ্যে ৩০টি প্রস্তাবের বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল। তবে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমানো, কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানো, নিম্নকক্ষের ভোটের অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন, সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষের অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা; ন্যায়পাল, সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি), দুর্নীতি দমন কমিশনসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের বিধান সংবিধানে যুক্ত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবে বিএনপির ভিন্নমত আছে।
সংস্কার প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান হলো, জুলাই জাতীয় সনদ রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমতসহ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেভাবে বাস্তবায়নে তারা অঙ্গীকারবদ্ধ। দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় এই পরিষদ পূর্ণতা পায়নি। গতকাল জাতীয় সংসদ ভবনে জাতীয় সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সংবিধান সংস্কার পরিষদের বিষয়ে বৈঠকে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আলোচনা, এটা ফ্লোরে (সংসদ অধিবেশনে) হতে পারে।’
আইনি জটিলতা ও ভবিষ্যৎ প্রভাব
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সব মিলিয়ে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের মধ্য দিয়ে বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন খাত, বিশেষ করে সংবিধানের মৌলিক সংস্কারের যে উদ্যোগ নিয়েছিল, তার বাস্তবায়ন ঝুলে গেছে। এরই মধ্যে এ-সংক্রান্ত বিষয়ে হাইকোর্টে রিট হয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথের চিঠি, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মাধ্যমে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্দিষ্ট সংসদ সদস্যের শপথ পরিচালনা এবং গণভোট অধ্যাদেশের ৩ ধারা ও তফসিল প্রশ্নে রুল হয়েছে। পৃথক দুটি রিটের শুনানি নিয়ে হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ ৩ মার্চ পৃথক রুল দেন। বিবাদীদের চার সপ্তাহের মধ্যে পৃথক রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবে। তবে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই সময়সীমা পূরণ কঠিন হয়ে উঠছে। বিরোধী দলের একটি সূত্র জানায়, আজ রোববার অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনের বৈঠকেও উত্তাপ তৈরি হতে পারে। আর এটি হতে পারে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বিষয়টি অনির্ধারিত আলোচনায় উত্থাপনের চিন্তা আছে।
