মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপে কয়েক দিন ধরে দখলদার সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) অবস্থানে বিমান হামলা চালাচ্ছে দেশটির সরকারি জান্তা বাহিনী। পাল্টা জবাব দিচ্ছে আরাকান আর্মিও। তাতে হতাহতের ঘটনা ঘটছে। বাস্তুচ্যুত হচ্ছে বহু বেসামরিক লোকজন। অন্যদিকে রাখাইন রাজ্যের বিপরীতে থাকা বাংলাদেশের টেকনাফ, উখিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের কয়েক হাজার মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। ওপারে বিকট শব্দের বিস্ফোরণ, এপারের লোকজনের ঘরবাড়ি কাঁপছে। ওপার থেকে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশেরও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশেষ সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত
এমন উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে আজ শনিবার টেকনাফে অনুষ্ঠিত হলো জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির বিশেষ সভা। সভায় রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নাফ নদী ও স্থল সীমানায় বিজিবি-কোস্টগার্ডের টহল জোরদারের পাশাপাশি নজরদারিও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অপহরণ, মাদক-অস্ত্র চোরাচালান ও সমুদ্রপথে মানব পাচার বন্ধ, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, পাহাড়ে সন্ত্রাসীদের আস্তানা উচ্ছেদ, আশ্রয়শিবিরে সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার, ক্যাম্পের বাইরে অবস্থানকারী রোহিঙ্গাদের শনাক্তকরণ এবং অনলাইন জুয়া বন্ধে যৌথ বাহিনীর অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। টেকনাফ উপজেলা পরিষদ সম্মেলনকক্ষে বেলা ১১টায় শুরু হওয়া এই বিশেষ সভা আড়াইটা পর্যন্ত চলে।
সভায় উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী। টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরীর সঞ্চালনায় সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন কক্সবাজারের রামু বিজিবি সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল মো. মহিউদ্দিন আহমেদ, জেলা পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান, টেকনাফ ২ বিজিবি অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হানিফুর রহমান ভূঁইয়া, র্যাব-১৫ কক্সবাজার অধিনায়ক লে. কর্নেল নিয়ানুল হালিম খান, উখিয়া ৬৪ বিজিবি অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জহিরুল ইসলাম, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক সোমেল মণ্ডল, উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার প্রমুখ।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের উদ্বেগ
সভায় মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ এবং নাফ নদীসংলগ্ন টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্তের কয়েক হাজার মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কথা তুলে ধরেন কয়েকজন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি। টেকনাফ সদর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান বলেন, ‘মিয়ানমারের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে টেকনাফ সীমান্তের মানুষেরা আতঙ্কে আছেন। নাফ নদী ও সীমান্তে বিজিবি ও কোস্টগার্ড সতর্ক অবস্থানে থাকলেও ওপার থেকে ছোড়া গুলিতে প্রাণহানি ঘটতে পারে। তা ছাড়া টেকনাফে অপহরণের মাধ্যমে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা ও সমুদ্রপথে মানব পাচার বৃদ্ধি পাচ্ছে।’
বিজিবি সেক্টর কমান্ডারের বক্তব্য
সীমান্তের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে সভায় বিজিবি রামু সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘মিয়ানমারের অভ্যন্তরে বিমান হামলা ও বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে উখিয়া-টেকনাফ সীমান্তে বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এ পর্যন্ত রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ ঘটেনি। সীমান্তে নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।’
সংসদ সদস্যের মতামত
সীমান্তের উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে এবারের জেলার আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত কমিটির বিশেষ সভাটি টেকনাফে করা হয়েছে উল্লেখ করে কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বলেন, ‘টেকনাফে মাদক, অপহরণ, মানব পাচার ও রোহিঙ্গা ইস্যুসহ বিভিন্ন সমস্যা অনেক। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সংঘাতময় পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। এমন পরিস্থিতিতে নাফ নদী অতিক্রম করে কোনো রোহিঙ্গা যেন বাংলাদেশ ঢুকতে না পারে, সে জন্য সীমান্তে কঠোর নজরদারি ও টহল বাড়াতে হবে।’
সভা শেষে শাহজাহান চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আশ্রয়শিবিরে রোহিঙ্গারা মাদক পাচার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছে। উখিয়া-টেকনাফেও নানা অপরাধকর্ম বেড়ে যাচ্ছে। তাই ক্যাম্পের বাইরে অবস্থানকারী রোহিঙ্গাদের শনাক্তকরণ, অপহরণ-মুক্তিপণ, অনলাইন জুয়া বন্ধ, সমুদ্রপথে মানব পাচার ও মাদক চোরাচালান এবং পাহাড়ের সন্ত্রাসী আস্তানা উচ্ছেদে সব বাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জান্তা বাহিনীর বিমান হামলা শুরুর পর যেন কোনো রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশের ঘটনা না ঘটে, সে জন্য নাফ নদী ও স্থল সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। যদিও আগে থেকে সেখানে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে।’
মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের মাদক চোরাচালান বেড়েছে। বড় বড় ইয়াবা-আইসের চালান ধরা পড়লেও মূল হোতারা ধরা পড়ে না উল্লেখ করে সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘মাদক নিয়ে যাঁরা ধরা পড়ছেন, তাঁরাও আইনের ফাঁকফোকরে বেরিয়ে এসে আবার চোরাচালানে জড়াচ্ছেন। আজকের সভায় অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে আইনে কিছু সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে।’
জেলা প্রশাসকের বক্তব্য
সভা শেষে জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, ‘মিয়ানমারের অভ্যন্তরে ঘটে চলা যুদ্ধ পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে সরকার। আমরা বাংলাদেশ সীমান্তের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি নাফ নদী অতিক্রম করে কোনো রোহিঙ্গা যেন বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করব। পাশাপাশি মাদক চোরাচালান, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার এবং সমুদ্রপথে অবৈধ পাচার রোধে যৌথ অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
পটভূমি
উল্লেখ্য, টানা ১১ মাস যুদ্ধের পর ২০২৩ সালের ৮ ডিসেম্বর রাখাইন রাজ্য থেকে সরকারি বাহিনীকে হটিয়ে রাখাইন রাজ্যের মংডু, বুচিডং, রাচিডং টাউনশিপসহ ৮০ শতাংশ এলাকা (২৭১ কিলোমিটার সীমান্ত) দখলে নেয় আরাকান আর্মি। অবশিষ্ট আছে রাজ্যের রাজধানী সিথুয়ে। এখন সিথুয়ে থেকে উড়ে এসে বিমানে হামলা চালাচ্ছে সরকারি বাহিনী। মংডু থেকে সিথুয়ের দূরত্ব প্রায় ৯০ কিলোমিটার। দখল করা রাখাইন রাজ্যের বিপরীতে টেকনাফ, উখিয়া ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা পড়েছে।



