চট্টলা এক্সপ্রেসে হামলার তদন্তে রেলকর্মীদের গাফিলতি ও শাস্তির সুপারিশ
ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী চট্টলা এক্সপ্রেস ট্রেনে টিকিটধারী যাত্রীদের ওপর হামলার ঘটনায় রেলওয়ের তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। গত ৬ এপ্রিল সন্ধ্যায় নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার মেথিকান্দা স্টেশনে এ ঘটনা ঘটে, যেখানে রেলকর্মীদের অবহেলা ও গাফিলতি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যায়।
তদন্ত কমিটির গঠন ও প্রতিবেদন জমা
ঘটনার পর বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা আনিসুর রহমানকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ট্রেন ও সংশ্লিষ্ট দফতরের ১৩ জন কর্মীর সঙ্গে কথা বলে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রস্তুত করে। রেলওয়ের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা আনিসুর রহমান প্রতিবেদন জমা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, "যাদের অবহেলা ও গাফিলতিতে ট্রেনের টিকিটধারী যাত্রীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। কিছু কিছু স্টেশনে এ ধরনের ঘটনা ঘটে। এমন ঘটনা প্রতিরোধে পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে বলা হয়েছে।"
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ
ঘটনার দিন বিকাল পৌনে ৫টায় ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে আসে ১৮ বগির চট্টলা এক্সপ্রেস। 'ক', 'খ' ও 'গ' বগি ছিল শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (এসি), কিন্তু এসব বগিতে বিপুলসংখ্যক বিনা টিকিট ও স্ট্যান্ডিং যাত্রী উঠে পড়েন। টিকিটধারী যাত্রীরা তাদের বের করে দিতে রেলকর্মীদের অনুরোধ করলে শুরু হয় কথা-কাটাকাটি, যা একপর্যায়ে হাতাহাতিতে রূপ নেয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেলওয়ে পুলিশ, আরএনবি ও টিটিইদের সহায়তায় কিছু যাত্রীকে নামিয়ে দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে 'গ' বগির এক পাশ তালা লাগিয়ে দেয় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ১০-১২ জন ব্যক্তি তালা ভেঙে আবার বগিতে ঢুকে মারামারি শুরু করেন। এ সময় তাদের একজন মুঠোফোনে মেথিকান্দা স্টেশনে আরও লোক জড়ো হওয়ার নির্দেশ দেন।
পরে ট্রেনটি মেথিকান্দা স্টেশনে পৌঁছালে সেখানে আগে থেকে অবস্থান নেওয়া ১০-১২ জন ব্যক্তি হুড়মুড় করে বগিতে উঠে যাত্রীদের ওপর এলোপাতাড়ি হামলা চালায়। এতে রেলকর্মীরাও হামলার শিকার হন। ট্রেনের ভেতরে ভিড় বেশি থাকায় নিরাপত্তাকর্মীরা দ্রুত হস্তক্ষেপ করতে পারেননি। ট্রেন ছাড়ার পর হামলাকারীরা দ্রুত নেমে যায়।
আহত ও তদন্তের ফলাফল
এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি–ইচ্ছুক এক শিক্ষার্থী, তার পরিবারের দুই সদস্য এবং এক চাকরিজীবীসহ কয়েকজন আহত হন। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দায়িত্বে থাকা কর্মীদের সমন্বয়হীনতা ও অবহেলা পরিস্থিতি জটিল করে তোলে। তদন্তে অন্তত আটজন রেলকর্মীর গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে খালাসি মোশাররফ হোসেনকে চট্টলা এক্সপ্রেসে আর দায়িত্ব না দেওয়া, দুই আরএনবি সদস্যকে ভবিষ্যতে চলন্ত ট্রেনে দায়িত্ব না দেওয়া এবং চারজন টিটিইর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। অনুপস্থিত টিটিই তানজিম ফরাজীকে বদলিরও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সুপারিশ ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
কমিটি আরও উল্লেখ করেছে, নরসিংদী ও মেথিকান্দা স্টেশনে প্রায়ই এ ধরনের ঘটনা ঘটে। তাই এসব স্টেশনে আন্তনগর ট্রেনের স্টপেজ বাতিলের সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি সুশীল সমাজ, স্থানীয় প্রশাসন ও রেল কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি কার্যকর কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া প্রতিটি আন্তনগর ট্রেনে স্ট্যান্ডিং যাত্রীদের জন্য আলাদা কোচ সংযোজন, প্রতিটি কোচে অ্যাটেনডেন্ট নিয়োগ এবং নিরাপত্তা জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে বলে তদন্ত কমিটি আশা করছে।



