বাগেরহাটে সংঘর্ষের পর হামলার শঙ্কায় বাসিন্দাদের উদ্বেগ
বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার মচন্দপুর গ্রামে দুই পক্ষের সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর থেকে এলাকার পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ ও থমথমে হয়ে রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা এখন পাল্টাপাল্টি হামলার আশঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন, যার ফলে অনেকেই তাদের বাড়িঘর থেকে মূল্যবান মালামাল ও গবাদিপশু সরিয়ে নিচ্ছেন। অনেকে তো নিরাপত্তার খাতিরে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ারও সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সংঘর্ষের পটভূমি ও ক্ষয়ক্ষতি
গত বৃহস্পতিবার রাতে চিতলমারীতে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে। এই সংঘর্ষে বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের মতো ভয়াবহ ঘটনা সংঘটিত হয়। এ ঘটনায় চিংগড়ী গ্রামের ২৫ বছর বয়সী রাজিব শেখ নিহত হন এবং অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছেন। প্রায় ৪০টি বসতঘর ও দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে ২৫টি বাড়ি সম্পূর্ণরূপে আগুনে পুড়ে গেছে। পরে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন।
বাসিন্দাদের মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা
ক্ষতিগ্রস্ত শেখ পরিবারের বাড়িতে অধিকাংশ পুরুষ সদস্য অনুপস্থিত, অন্যদিকে বিশ্বাস বংশের পরিবারগুলোও প্রায় পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। চিংগড়ী গ্রামে প্রবেশ করতেই পোড়া বাড়িঘরের দৃশ্য চোখে পড়ে, যেখানে টিন ও কাঠের ঘরগুলোর পাশাপাশি গোয়ালঘরে গবাদিপশু পুড়ে গেছে এবং ঘরের মালপত্র ছাইয়ে পরিণত হয়েছে। বাসিন্দারা তাদের শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে অসহায়ত্বের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন, অনেক ঘরে একবেলা খাবারেরও ব্যবস্থা নেই।
নিহত রাজিব শেখের পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন যে বিশ্বাস বংশের লোকজন হামলা চালিয়ে প্রতিটি বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে এবং পরে পেট্রল ও পিচ ঢেলে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। মানিক শেখের স্ত্রী সুফিয়া বেগমের মতো অনেকে তাদের সম্পূর্ণ জীবনযাত্রা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার বেদনা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা যে এখন কী খাব, কোথায় থাকব, কিছুই নেই। সব নিয়ে গেছে লুট করে।’
মচন্দপুর গ্রামে আতঙ্কের পরিবেশ
শুক্রবার সকালে মচন্দপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, হামলার আশঙ্কায় বিশ্বাস বংশের লোকজন তাদের বাড়ি থেকে টিভি, ফ্রিজ, খাটসহ বিভিন্ন মূল্যবান মালামাল ভ্যান, নছিমন ও পিকআপে করে সরিয়ে নিচ্ছেন। নারীরা কাঁধে, কোমরে ও মাথায় করে মালপত্র বহন করছেন, অনেকে গ্রামের পেছনের মরা খাল পার হয়ে অন্য গ্রামে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
ফারুক বিশ্বাসের স্ত্রী রহিমা খানম বলেন, ‘আগেরবার আমাদের সবকিছু লুট করে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। এখন আবার হুমকি দিচ্ছে, তাই আমরা মালামাল সরাচ্ছি।’ পান্না বিশ্বাসের স্ত্রী সালমা বেগমও অনুরূপ আতঙ্ক প্রকাশ করে বলেন, ‘ওরা হুমকি দিয়েছে, সবকিছু পুড়িয়ে দেবে, তাই আমাদের বাঁচতে হলে মালামাল সরাতেই হবে।’
কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ ও বর্তমান অবস্থা
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের চিতলমারীর স্টেশন কর্মকর্তা আবদুল ওয়াদুদ জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তারা খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান, তবে বাধার কারণে আগুন নেভানোর কাজে কিছুটা দেরি হয়। আনুমানিক ২০-২৫টি বসতঘর পুড়ে গেছে এবং চারটি ইউনিটের সমন্বিত প্রচেষ্টায় প্রায় তিন ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নেভানো সম্ভব হয়েছে।
বাগেরহাটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শামীম হোসেন নিহত রাজিবের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন। এ ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং পুলিশ অপরাধীদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করেছে। সংঘাত এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে তিনি দাবি করেছেন।
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা এখনও কাটেনি, তারা নিরাপত্তা ও সহায়তার জন্য জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।



