১৯৭১ সালের ২২ মার্চ পিলখানায় প্রথম বিদ্রোহ: স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনের অজানা ইতিহাস
১৯৭১ সালের ২২ মার্চ পিলখানায় প্রথম বিদ্রোহের ইতিহাস

১৯৭১ সালের ২২ মার্চ পিলখানায় প্রথম বিদ্রোহ: স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনের অজানা ইতিহাস

ঢাকার পিলখানা, যা ২৩০ বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্যে গৌরবান্বিত, তা কেবল একটি প্রশাসনিক স্থাপনা নয়। এটি দেশপ্রেম, বীরত্ব, আত্মত্যাগ ও অঙ্গীকার পূরণের এক জীবন্ত প্রাঙ্গন। এখানকার সবুজ-শ্যামল প্রকৃতি যেন ধারণ করে আছে জাতির সংকটকালের স্পন্দন। পিলখানার অসংখ্য প্রাচীন বৃক্ষের মাঝে একটি বিশেষ গাছ—যার সাথে জড়িয়ে আছে ১৯৭১ সালের রক্তাক্ত মার্চের দুঃসাহসিক বীরত্বগাঁথা। এই ইতিহাস দীর্ঘদিন বিস্মৃতির অতল গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে তা পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।

ইতিহাস অনুসন্ধানের সূচনা

২০২১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের বিজয়ের সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে ‘স্পাইস’ নামের একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ‘অতন্দ্র: বিজয়ের ৫০’ শীর্ষক একটি বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা করে। এই প্রামাণ্যচিত্রে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পিলখানায় সংঘটিত নারকীয় হত্যাযজ্ঞকে কেন্দ্র করে শ্যুটিং করার জন্য তারা অনুমতি চায়। বিজিবির মহাপরিচালক বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় জনসংযোগ কর্মকর্তাকে সার্বিক সহযোগিতা প্রদানের নির্দেশ দেন।

শ্যুটিংয়ের প্রস্তুতিকালে টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ ২৫ মার্চের ঘটনার সময় পিলখানায় উপস্থিত ও বর্তমানে জীবিত একজন তৎকালীন ইপিআর সদস্যের সাক্ষাৎকার চায়। জনসংযোগ কর্মকর্তা রেকর্ড উইংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে ল্যান্স নায়েক আব্দুল মালেক, বীরপ্রতীক-এর সন্ধান পান এবং তার মোবাইল নম্বর সরবরাহ করেন। আব্দুল মালেককে সিলেট থেকে ঢাকায় আনা হয় এবং পিলখানার অভ্যন্তরে টানা তিন রাত ধরে শ্যুটিং সম্পন্ন করা হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পতাকা উত্তোলনের বীরত্বগাঁথা

আব্দুল মালেকের সাক্ষাৎকারে উঠে আসে ১৯৭১ সালের ২২ মার্চ দিনগত রাতের এক অসীম সাহসিকতার কাহিনী। তৎকালীন ইপিআরের কতিপয় সাহসী ও অকুতোভয় বাঙালি সৈনিক পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বেলুচ রেজিমেন্টের কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে পিলখানার একটি গাছে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। আব্দুল মালেক তার ‘যুদ্ধদিনের আত্মস্মৃতি’ শীর্ষক বইয়ে এই ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দেন, যা একটি মূল্যবান দলিল হিসেবে কাজ করে।

পরবর্তীতে জাতীয় আর্কাইভ থেকে ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত বিশেষ ক্রোড়পত্রে পিলখানায় পতাকা উত্তোলনের একটি সাদাকালো ছবি আবিষ্কার করা হয়। ছবির নিচে সংক্ষিপ্ত তথ্য ছিল—১৯৭১ সালের মার্চে পিলখানার এক গাছে উত্তোলিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। এই ঘটনা শুধু প্রতীকী সাহসিকতা নয়; এটি ছিল পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ, মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রথম স্ফুলিঙ্গ এবং স্বাধীনতার প্রত্যয়ে এক সুদৃঢ় পদক্ষেপ।

বিস্তৃত অনুসন্ধান ও নতুন আবিষ্কার

বিজিবির মহাপরিচালক ঘটনাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনুধাবন করে সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ, গাছের অবস্থান এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের নির্দেশ দেন। শুরু হয় বিস্তৃত ও পদ্ধতিগত অনুসন্ধান। পুরোনো পত্রিকা, আর্কাইভ ফুটেজ, গ্রন্থাগারের দুর্লভ বই ও রেকর্ড রুমে নিবিড় অনুসন্ধান চালানো হয়। বিজিবির কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত ‘মুক্তিযুদ্ধ ও রাইফেলস’ বইয়ের মাধ্যমে আরেকটি অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়।

দীর্ঘ অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৭১ সালের মার্চে পতাকা উত্তোলনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন তৎকালীন ইপিআরের ১০ থেকে ১১ জন অকুতোভয় বাঙালি সদস্য। বেঁচে আছেন শুধু ল্যান্স নায়েক আব্দুল মালেক। তাকে পিলখানায় আনা হলে তিনি একটি গাছ শনাক্ত করেন এবং আবেগাপ্লুত কণ্ঠে জানান—এই গাছেই উত্তোলিত হয়েছিল স্বাধীনতার লাল-সবুজ পতাকা। গাছটিকে তিনি স্যালুট করেন, যা ইতিহাসের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংলাপের মতো মুহূর্ত তৈরি করে।

গাছটি শনাক্ত হওয়ার পরও অনুসন্ধান থেমে থাকে না। আব্দুল মালেকের কাছ থেকে নায়েব সুবেদার আব্দুল হাই সাহেবের নাম জানা যায়, এবং বিজিবির রেকর্ড উইং বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগ করে তার পরিবারের সন্ধান পায়। নায়েব সুবেদার আব্দুল হাইয়ের সহধর্মিণী সুফিয়া বেগমের দেওয়া তথ্য ইতিহাসের কাঙ্ক্ষিত সত্যের অকাট্য প্রমাণ সরবরাহ করে।

অনুসন্ধানে আরও যোগাযোগ করা হয় শহিদ নায়েব সুবেদার শামসুল হক, হাবিলদার খোরশেদ আলম, হাবিলদার মোশাররফ হোসেন, নায়েক সিগন্যাল মহি উদ্দিন ভূইয়া, ল্যান্স নায়েক রেজাউল হক ও সিপাহি সিগন্যাল আবুল বাশারের পরিবারের সঙ্গে। সকলের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও ছবি, যা প্রমাণভিত্তিক একটি পূর্ণাঙ্গ বিবরণ তৈরি করে।

গাছের প্রকৃত পরিচয় ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য

পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণে নিশ্চিত হয়—গাছটি বটবৃক্ষ নয়, বরং একটি পাকুড় গাছ। তবে নামের এই সংশোধন তার মাহাত্ম্যকে ম্লান করেনি; বরং ইতিহাস অনুসন্ধানের প্রজ্ঞা ও দায়বদ্ধতাকে উজ্জ্বল করেছে। গাছটির অবস্থান ও বয়স ১৯৭১ সালের ঘটনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এই অনুসন্ধান কেবল একটি গাছ চিহ্নিত করার প্রয়াস ছিল না; এটি ছিল ইতিহাসকে সত্যের আলোয় পুনর্গঠনের দায়িত্বশীল প্রয়াস। ১৯৭১ সালের ২২ মার্চ রাতে, নায়েব সুবেদার আব্দুল হাইয়ের নেতৃত্বে ইপিআরের ১০ থেকে ১১ জন দেশপ্রেমিক সৈনিক সেই গাছে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। ২৩ মার্চ সকালে তা দৃপ্তভাবে উড়তে থাকে, যা শত্রুর ঘাঁটির ভেতরেই স্বাধীনতার ঘোষণা হিসেবে কাজ করে।

২৫ মার্চের কালোরাত ও মুক্তিযুদ্ধের সূচনা

এই সাহসিকতার পর আসে ২৫ মার্চের বিভীষিকাময় রাত। ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে পিলখানায় চালানো হয় নির্মম হত্যাযজ্ঞ। নিরস্ত্র ও ঘুমন্ত ইপিআর সদস্যদের ওপর নেমে আসে নৃশংসতা। সুবেদার মেজর শওকত আলী, নায়েব সুবেদার আব্দুল হাই, নায়েব সুবেদার শামসুল হক ও হাবিলদার খোরশেদ আলমসহ অনেককে গ্রেফতার করে নারায়ণগঞ্জের পাগলায় শীতলক্ষা নদীর তীরে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করা হয়। সৌভাগ্যক্রমে আব্দুল মালেকসহ কয়েকজন সদস্য বেঁচে ফিরেন।

তৎকালীন ইপিআরের ১২ হাজার অকুতোভয় বাঙালি সৈনিক মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং ৮১৭ জন সদস্য জীবন উৎসর্গ করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে অবিস্মরণীয় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এ বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে ২ জন বীরশ্রেষ্ঠ, ৮ জন বীরউত্তম, ৩২ জন বীরবিক্রম ও ৭৭ জন বীরপ্রতীক খেতাবে ভূষিত হন।

নতুন প্রজন্মের জন্য অঙ্গীকার

এই অনুসন্ধানের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের মার্চের পতাকা উত্তোলনের পূর্ণাঙ্গ ও প্রমাণভিত্তিক বিবরণ উঠে আসে। তথ্যচিত্র আকারে উপস্থাপিত হলে বিজিবির সদস্যবৃন্দ আবেগাপ্লুত হন। নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া হয় এই গৌরবগাঁথা, যেন তারা জানে সীমান্ত রক্ষার বর্তমান দায়িত্বের পেছনে রয়েছে আত্মত্যাগের গভীর ঐতিহ্য। আজও সেই পাকুড় গাছ নীরবে দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে।

জাতীয় পতাকা আমাদের অনুপ্রেরণা ও শক্তি। সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ অতীতে যেমন দায়িত্ব পালন করেছে, আজও তেমনি সতর্ক ও অঙ্গীকারাবদ্ধ থেকে ভবিষ্যতেও জাতির পতাকা সমুন্নত রাখার দৃপ্ত প্রত্যয়ে এগিয়ে যাবে।