বয়সের ভারে জীর্ণ পশ্চিমাঞ্চল রেলপথ, ঈদযাত্রায় সর্বোচ্চ প্রস্তুতি
জীর্ণ পশ্চিমাঞ্চল রেলপথে ঈদযাত্রার প্রস্তুতি

বয়সের ভারে জীর্ণ পশ্চিমাঞ্চল রেলপথ, ঈদযাত্রায় সর্বোচ্চ প্রস্তুতি

দীর্ঘদিনের ব্যবহার ও অবহেলায় সক্ষমতা হারিয়েছে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের রেলপথ। কোথাও লাইন দেবে যাচ্ছে, কোথাও স্লিপার ভাঙা, আবার মাঝেমধ্যেই ঘটছে ট্রেন লাইনচ্যুতির ঘটনা। এমন বাস্তবতার মধ্যেই আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিচ্ছে রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চল।

১৯৩০ সালে স্থাপিত পুরনো রেলপথের বর্তমান চিত্র

রাজশাহীর সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছিল ১৯৩০ সালে। এই পুরনো রেলপথ কোনোরকমে মেরামত করে চলছে যাতায়াত। সরেজমিন দেখা যায়, দ্রুতগতিতে চলছে রেলপথ সংস্কার, রেলক্রসিং ও কোচ মেরামতের কাজ। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, ঈদযাত্রার আগেই এসব কাজ সম্পন্ন হবে।

পশ্চিমাঞ্চল রেলের ২৫৮/১ থেকে ২৫৯/০ পর্যন্ত এক কিলোমিটার রেলপথে মোট ৫৯টি জয়েন্ট রয়েছে। এসব জয়েন্টে ২৩৬টি নাট-বোল্ট থাকার কথা থাকলেও আছে মাত্র ১৮৯টি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই এক কিলোমিটারের চিত্রই যেন পুরো পশ্চিমাঞ্চল রেল লাইনের প্রতিচ্ছবি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্থানীয়দের অভিযোগ ও রেলকর্মীদের ব্যাখ্যা

স্থানীয় বাসিন্দা আশিক বলেন, 'ট্রেন যখন যায়, তখন রেললাইনের প্রতিটি জয়েন্টে কাঁপন ধরে। নাট-বোল্ট কম থাকায় জয়েন্টে বিকট শব্দ হয়।' প্রতিদিন এই রুটে লোকাল ও আন্তনগরসহ ১৭টি ট্রেন চলাচল করে বলেও জানান তিনি।

রেলওয়ের কয়েকজন কর্মীর দাবি, জনবসতি ও ফাঁকা এলাকা হওয়ায় নাট-বোল্ট বেশি চুরি হয়। এ কারণেই লাইনে নাট-বোল্টের ঘাটতি রয়েছে। এ ছাড়া পশ্চিমাঞ্চল রেলের অনেক স্থানে লাইনের ওপর ট্রেন উঠলেই স্লিপার দেবে যায়। কোথাও স্লিপার ভাঙা, কোথাও আবার ক্লিপ নেই। উঁচু-নিচু ও আঁকাবাঁকা রেললাইনে রয়েছে পাথরের ঘাটতিও।

গত বছর কমপক্ষে আড়াইশো স্থানে রেলের লাইন ভেঙেছে। এতে একদিকে যেমন ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনা বেড়েছে, অন্যদিকে কমেছে ট্রেনের গতি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে বিশেষ প্রস্তুতি

এমন বাস্তবতা মেনেই ট্রেনযোগে ঘরমুখো মানুষের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে প্রস্তুতি শুরু করেছে রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চল। রেলপথ সংস্কার, রেলক্রসিংসহ আগে-পরের লাইন এবং রেলের কোচ বা বগি মেরামতের কাজ পুরোদমে চলছে। বিশেষ করে, রাজশাহী-জয়দেবপুর প্রকৌশলী বিভাগের আওতায় থাকা রেলপথে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

পবিত্র ঈদুল-ফিতর উপলক্ষে পশ্চিমাঞ্চল রেল দুটি বিশেষ ট্রেন পরিচালনা করবে। ট্রেন দুটি জয়দেবপুর থেকে পার্বতীপুর পর্যন্ত চলবে। তবে এবারও রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জের জন্য থাকছে না বিশেষ কোনও ট্রেন।

বিশেষ ট্রেনের সময়সূচি ও ব্যবস্থা

বিশেষ ওই ট্রেন দুটির নাম 'পার্বতীপুর স্পেশাল''জয়দেবপুর স্পেশাল'। পার্বতীপুর স্পেশাল ট্রেনটি পার্বতীপুর থেকে সকাল ১১টায় ছাড়বে। জয়দেবপুর পৌঁছাবে বিকাল ৩টা ২০ মিনিটে। আর জয়দেবপুর থেকে ছাড়বে বিকাল ৫টা ১০ মিনিটে। পাবর্তীপুর পৌঁছাবে রাত ৯টা ৪০ মিনিটে।

জয়দেবপুর স্পেশাল ট্রেনটি জয়দেবপুর থেকে ছাড়বে সকাল সাড়ে ৮টায়। পার্বতীপুর পৌঁছাবে দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে। আবার পার্বতীপুর থেকে ছাড়বে ৫টা ১০ মিনিটে। জয়দেবপুর পৌঁছাবে সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটে।

ট্রেন দুটি যাত্রাবিরতি করবে:

  • চাটমোহর
  • ঈশ্বরদী বাইপাস
  • নাটোর
  • আহসানগঞ্জ
  • জয়পুরহাট
  • বিরামপুর
  • ফুলবাড়ি স্টেশনে

একটি ট্রেনে আসনসংখ্যা থাকবে ৭৮৬টি। যাত্রীচাহিদা অনুযায়ী কোচ সংখ্যা বাড়ানোও হতে পারে।

অতিরিক্ত সার্ভিস ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ঈদের আগে ও পরে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিভিন্ন রুটে অতিরিক্ত কোচ সংযোজন করা হবে। চাহিদা অনুযায়ী যাত্রীবহুল ট্রেনগুলোতে বাড়তি চেয়ার ও স্লিপার কোচ যুক্ত করা হবে। পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করে পর্যাপ্তসংখ্যক কোচ ও লোকোমোটিভ প্রস্তুত রাখা হচ্ছে।

ঢাকা-রাজশাহী, ঢাকা-খুলনা, ঢাকা-চিলাহাটি, ঢাকা-পঞ্চগড়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রুটে যাত্রীচাপ বিবেচনায় অতিরিক্ত সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পুরনো কোচগুলো সংস্কার করে চলাচলের উপযোগী করা হচ্ছে।

পশ্চিমাঞ্চল রেল ঈদ উপলক্ষে ২১ মার্চ যাত্রী পরিবহনের জন্য থেকে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যাত্রীচাপ বিবেচনায় ১৭ মার্চ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত নির্দিষ্ট কিছু আন্তনগর ট্রেনের অতিরিক্ত কোচ সংযোজন করা হবে। একই সঙ্গে ঈদের আগে ১৭ মার্চ থেকে ১৯ মার্চ এবং ঈদের পরে ২৩ থেকে ২৬ মার্চ স্পেশাল ট্রেন পরিচালনা হবে।

রেলওয়ের দায়িত্বশীলতা ও যাত্রীদের সহযোগিতা

রেলওয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীলভাবে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যাত্রীদেরও সময়মতো স্টেশনে উপস্থিত থাকা এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। এ ছাড়াও টিকিট বিক্রি, নিরাপত্তা ও সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে অফিস জানিয়েছে, যাত্রীদের নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয়সংখ্যক আনসার সদস্য মোতায়েন থাকবে। পাশাপাশি রেলওয়ে স্টেশনে প্রবেশমুখে যানজট নিরসনে ট্রাফিক বিভাগের সমন্বয়ে ট্রাফিক সদস্যদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হবে। জোনাল কন্ট্রোলও বিভাগীয় কান্ট্রোল অফিসের পাশাপাশি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়াও ট্রেনের ভেতরের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখার জন্য কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে স্পেশাল চেকিং প্রোগ্রাম থাকবে। রেলপথ মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে থাকবে বিশেষ নজর।

রেলওয়ে মহাব্যবস্থাপকের বক্তব্য

বাংলাদেশ রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ আহমেদ বলেন, 'আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে যাত্রীদের আরামদায়ক ও নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় আমরা প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি। আশা করছি, এবারের ঈদযাত্রা হবে স্বস্তির ও আনন্দের। আমরা পাশাপাশি রেলওয়ের যাত্রীদের কাছ থেকেও সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রত্যাশা করছি, যাত্রীরা যেন নিয়ম মেনে রেলভ্রমণ করেন।'

ফরিদ আহমেদ আরও জানান, পশ্চিমাঞ্চল রেলপথের রুট ১ হাজার ৯০০ কিলোমিটার। বয়স হওয়ায় এর সক্ষমতা কমেছে। এই রুটে ১২০টি ট্রেন চলাচল করে। বাস্তবতার নিরিখে ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে মেরামতের বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও জানান, এবার রাজশাহী-ঢাকা রুটে কোনও ঈদ স্পেশাল ট্রেন নেই। তবে পার্বতীপুর-জয়দেবপুর রুটে দুই জোড়া স্পেশাল ট্রেন চলবে। পশ্চিমাঞ্চল রেলপথে ৫৫ হাজার যাত্রী আসনে বসে এবং সাড়ে ১৩ হাজার যাত্রী দাঁড়িয়ে যাওয়ার টিকিট পাবেন।