কক্সবাজার রেলপথে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা থামছে না, আহত যাত্রী ও কর্মীর সংখ্যা বাড়ছে
কক্সবাজার রেলপথে পাথর নিক্ষেপ: আহত ১২, হামলা ৩৭ বার

কক্সবাজার রেলপথে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা: যাত্রীদের আতঙ্ক ও নিরাপত্তা সংকট

কক্সবাজার রুটে চলাচলরত আন্তনগর ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা থামছে না। গতকাল মঙ্গলবার রাতে কক্সবাজারের রামু উপজেলায় বাইরে থেকে দুর্বৃত্তের ছোড়া পাথরে মাথায় আঘাত পান এক যাত্রী। এর আগের রাতেও চকরিয়ার ডুলাহাজারা এলাকায় পাথরের আঘাতে গুরুতর আহত হয়েছেন ট্রেনের ভেতরে থাকা রেলের এক কর্মী। ছাবের আহমেদ (৫২) নামের এই রেলকর্মীকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

এক বছরে ১৪৪ বার পাথর নিক্ষেপ, আহত ৩৭ জন

গত এক বছরে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে চলাচলরত ট্রেনগুলোতে ১৪৪ বার পাথর ছুড়ে মেরেছে দুর্বৃত্তরা। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন ৩৭ জন। এ ছাড়া পাথরের আঘাতে ট্রেনের দরজা ও জানালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে কক্সবাজার রুটে। এই রুটে চলাচলরত ট্রেনগুলোতে গত এক বছরে অন্তত ৩৭ বার পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এতে আহত হয়েছেন অন্তত ১২ জন। আহতের তালিকায় নারী-পুরুষ থেকে শুরু করে শিশুও আছে। পাথরের আঘাতে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে বিভিন্ন সময়ে।

রেলওয়ের পদক্ষেপ ও চ্যালেঞ্জ

ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা রোধ করতে রেলওয়ে নিয়মিত বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় জনসাধারণকে সচেতন করা, প্রচারপত্র বিতরণ করা হয়। রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা মোহাম্মদ সফিকুর রহমান বলেন, "নিরাপদ যাত্রার জন্য মানুষের পছন্দ রেল। এখন চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের কারণে যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়।" তবে, এই পদক্ষেপগুলো কার্যকর ফল আনতে পারছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

আইনী বিধান ও প্রয়োগের অভাব

ট্রেনের যাত্রীদের পাথর ছুড়ে আহত করলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান আছে। রেলওয়ে আইন, ১৮৯০-এর ১২৭ ধারায় উল্লেখ রয়েছে, যাত্রীদের ক্ষতি হতে পারে জেনেও কেউ যদি পাথর ছোড়ে, তাহলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হবে বা সর্বনিম্ন ১০ বছরের জেল দেওয়া হবে। তবে আইনের প্রয়োগ খুব একটা নেই বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিচ্ছেন।

কক্সবাজার রুটের জনপ্রিয়তা ও শঙ্কা

বর্তমানে কক্সবাজার রুটে চার জোড়া ট্রেন চলাচল করে। এর মধ্যে দুই জোড়া ঢাকা-কক্সবাজার রুটে এবং দুই জোড়া চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে। যখন টানা ছুটি থাকে কিংবা যাত্রীদের চাহিদা বাড়ে, তখন বিশেষ ট্রেনও চালানো হয়। এই রুটের ট্রেনগুলো যাত্রীদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তবে এই রুটে এখন শঙ্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা। কক্সবাজার রুটে সবচেয়ে বেশি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটছে চকরিয়া ও রামু উপজেলা অংশে।

যাত্রী কল্যাণ পরিষদের বক্তব্য

চট্টগ্রাম-দোহাজারী-কক্সবাজার রেলওয়ে যাত্রী কল্যাণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আবু সাঈদ তালুকদার বলেন, "দেশের সবচেয়ে বড় সমুদ্রসৈকত ও পর্যটন শহর কক্সবাজারে সড়কপথে যাতায়াত ভোগান্তির। ট্রেন চলাচল শুরু হওয়ায় মানুষ স্বস্তিতে কক্সবাজারে যাতায়াত করার সুযোগ পেয়েছেন। তাঁরা সড়কপথের চেয়ে রেলপথকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন। এতে স্বাভাবিকভাবে একটি মহলের স্বার্থে আঘাত লেগেছে। যাত্রীরা যাতে ট্রেনে যাতায়াতে নিরুৎসাহিত হন, সে উদ্দেশ্যে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।"

উল্লেখযোগ্য ঘটনাসমূহ

  • গত বছরের ২ এপ্রিল: কক্সবাজারের হারবাং-চকরিয়ার মধ্যবর্তী এলাকায় পাথরের আঘাতে প্রবাল এক্সপ্রেসের এক যাত্রী আহত।
  • ১০ মে: সৈকত এক্সপ্রেসের ট্রেনে বাইরে থেকে পাথর ছুড়ে মারলে এক যাত্রী আহত।
  • ২৪ জুলাই: চট্টগ্রামের লোহাগাড়া-সাতকানিয়া অংশে কক্সবাজার এক্সপ্রেসের এক নারী যাত্রী আহত।
  • ১৭ জানুয়ারি: ঢাকা থেকে কক্সবাজারগামী পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনে ৯ বছর বয়সী এক শিশু আহত।

রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে প্রতিদিন গড়ে ২৯ জোড়া আন্তনগর ট্রেন চলাচল করে। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে।