সুন্দরবনে দস্যুদের উৎপাত: জেলেদের আতঙ্ক ও যৌথ বাহিনীর অভিযান
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে নজরদারির অভাবে আবারও দস্যুদের উৎপাত বেড়েছে। বনজীবীদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের খবর পাওয়া গেছে, যেখানে ধারালো অস্ত্র ও বন্দুক নিয়ে দস্যুরা তাদের সম্পদ লুট করছে। নতুন নতুন দস্যু দল বনের বিভিন্ন এলাকায় ঘোরাফেরা করছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বনজীবীরা। গত ১০ দিনেও অপহৃত ২০ জেলেকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় দস্যু দমনে ‘কম্বিং অপারেশন’ শুরু করেছে যৌথ বাহিনী।
জেলেদের আতঙ্ক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি
স্থানীয় বনজীবীরা বলছেন, সুন্দরবনে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বনদস্যুরা। আত্মসমর্পণকারী এবং নতুন দল মিলে প্রায় ২০টি বাহিনী এখন সক্রিয় রয়েছে। জেলেদের অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ে আতঙ্ক তৈরি করছে এসব বাহিনীর সদস্যরা। সাগর ও উপকূলের জেলেরা এখন মাছ আহরণেও ভীতসন্ত্রস্ত রয়েছেন। গত এক সপ্তাহে অন্তত ৫০ জেলেকে অপহরণ করা হয়েছে।
এসব ঘটনায় উদ্বিগ্ন জেলেরা প্রাণের ভয়ে সাগর ও নদীতে মাছ ধরা বন্ধ করে দিয়েছেন। এ অঞ্চলের প্রায় ২০ হাজার জেলে ও তাদের পরিবার উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপের সভাপতি কামাল আহমেদ বলেন, ‘মাছ ধরার শেষ মৌসুমে দস্যু আতঙ্কে জেলেরা মাছ ধরা বন্ধ রেখেছেন। এতে কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। উপকূলীয় এলাকায় বর্তমানে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।’
যৌথ বাহিনীর অভিযান ও চ্যালেঞ্জ
বন বিভাগ ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, দস্যুদের হাতে জিম্মি জেলেদের উদ্ধার ও দস্যু দমনে সুন্দরবনজুড়ে ‘কম্বিং অপারেশন’ শুরু করেছে যৌথ বাহিনী। মঙ্গলবার থেকে এ অভিযান শুরু হয়েছে। কম্বিং অপারেশনে র্যাব, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী ও পুলিশ সমন্বিতভাবে অংশ নিচ্ছে।
প্রথম দিনের অভিযানে বনের বিভিন্ন পয়েন্টে তল্লাশি চালানো হলেও কোনও অপহৃত জেলেকে উদ্ধার কিংবা দস্যুকে আটক করা সম্ভব হয়নি। তবে অপহৃত জেলেদের উদ্ধার ও সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত না করা পর্যন্ত এ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
আত্মসমর্পণকারীদের ফিরে আসা ও বর্তমান পরিস্থিতি
২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সুন্দরবন অঞ্চলের ৩২টি দস্যু বাহিনীর ৩২৮ জন দস্যু আত্মসমর্পণ করেছিল। পরে ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর সুন্দরবনকে ‘দস্যুমুক্ত’ ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের আগস্টের পর পাল্টে যায় দৃশ্যপট। সরকার পতনের সুযোগে দুলাভাই বাহিনীসহ অন্তত ২০টি দস্যুদল আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে।
আত্মসমর্পণকারীদের অন্তত ১৩ জন আবার দস্যুতায় ফিরেছেন বলে জানা গেছে। বর্তমানে সুন্দরবনে আসাবুর বাহিনী, করিম শরীফ বাহিনী, জাহাঙ্গীর বাহিনী, সুমন বাহিনীসহ বিভিন্ন দল সক্রিয় রয়েছে। এসব বাহিনীর প্রত্যেকের হাতে রয়েছে দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, এবং তারা গহীন বনে আস্তানা গড়ে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায় করছে।
অপহৃত জেলেদের অবস্থা ও সরকারের প্রতিক্রিয়া
বঙ্গোপসাগর থেকে অপহরণের ১০ দিন পার হলেও মুক্তি মেলেনি ২০ জেলের। এসব জেলের প্রতি জনের মুক্তিপণ হিসেবে সাড়ে তিন লাখ টাকা করে মোট ৭০ লাখ টাকা দাবি করা হয়েছে। মুক্তিপণের টাকা কমবেশি নিয়ে মহাজন-বনদস্যুদের দরকষাকষি চলছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।
বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেছেন, ‘অর্থনৈতিক কেন্দ্র ও অগ্রগতি ঠিক রাখার জন্য সুন্দরবনের জলদস্যুতা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বনকে দস্যুমুক্ত করতে সব ধরনের পদক্ষেপ নেবো আমরা।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এভাবে চললে ইকো-ট্যুরিজম ও ব্লু-ইকোনমি মুখথুবড়ে পড়তে পারে।
ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ ও আশাবাদ
খুলনা র্যাব-৬-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নিস্তার আহমেদ বলেন, ‘সুন্দরবনসহ উপকূলকে নিরাপদ করতে যৌথ বাহিনীর অভিযান জোরদার করা হয়েছে। আশা করছি, এর মধ্য দিয়ে সমুদ্র ও উপকূলে শান্তি ফিরবে। জেলেরা নিরাপদে মাছ আহরণ করতে পারবেন।’ কোস্টগার্ডের নেভিগেশন কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট মোল্লা মাহমুদ আল হোসাইনও দস্যু নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলমান রাখার কথা জানিয়েছেন।
সুন্দরবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। জেলেদের উদ্ধার ও দস্যু দমনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এই অঞ্চলের অর্থনীতি ও পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে পারে।
