ভারত থেকে বাংলা ভাষাভাষী মানুষদের অবৈধভাবে বাংলাদেশে পুশইনের (জোর করে ঠেলে দেওয়া) অপচেষ্টাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে উত্তেজনা চলছে। বিশেষ করে যশোর, চাপাইনবাবগঞ্জ ও লালমনিরহাট সীমান্তে বিজিবি-বিএসএফ মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে পূর্বনির্ধারিত আগামী ৮ থেকে ১১ জুন পর্যন্ত নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) এবং ভারতীয় সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর (বিএসএফ) মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
বিজিবির দাবি: বিএসএফের ১০ প্রচেষ্টা ব্যর্থ
বিজিবি দাবি করেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে সীমান্ত পার করে লোক পাঠানোর জন্য ভারতের বিএসএফ-এর ১০টি পৃথক প্রচেষ্টা তারা ব্যর্থ করে দিয়েছে। তারা বলেছে, এ ধরনের আরো ঘটনা প্রতিরোধ করতে নজরদারি ও টহল অভিযান জোরদার করা হয়েছে। তারা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
জয়ন্তীপুর সীমান্তে পুশইন চেষ্টা
বিজিবির ভাষ্যমতে, ভারতের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার জয়ন্তিপুর সীমান্তের কাছে, বেনাপোল আন্তর্জাতিক চেকপয়েন্টের উত্তরে সাদিপুর সীমান্ত চৌকির ঠিক বিপরীতে আট থেকে দশ জন পুরুষ, মহিলা ও শিশুকে বাংলাদেশে জোর করে ঢোকানোর স্পষ্ট চেষ্টায় জড়ো করা হয়েছিল। যশোরের ৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সাইফুল ইসলাম খান বলেন, ‘সারারাত সীমান্তে পূর্ণ শক্তিতে টহল রাখা হয়েছিল। বিজিবির সতর্ক অবস্থানের কারণে বিএসএফ সাদিপুর খড়ক্ষেত এলাকায় ১৯/এস-৬ সীমান্ত স্তম্ভের কাছে ঐ ব্যক্তিদের বাংলাদেশে ঠেলে ঢোকাতে পারেনি। তাদের বর্তমানে জিরো লাইনে আটকে রাখা হয়েছে। বিষয়টির সমাধানের জন্য বিএসএফকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
মহেশপুর ও যাদবপুর সীমান্তে বাধা
মহেশপুর ব্যাটালিয়নের (৫৮ বিজিবি) আওতাধীন ঝিনাইদহের যাদবপুর সীমান্তের কাছে একটি টহল দল চার-পাঁচজন ব্যক্তিকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশে বাধা দেয়। বিজিবি সদস্যদের প্রতিরোধের মুখে ঐ ব্যক্তিরা ভারতীয় ভূখণ্ডে ফিরে যান। মহেশপুরের সীমান্ত চৌকি এলাকায় একটি সীমান্ত গেট খুলে বিএসএফ সদস্যরা একটি প্রিজন ভ্যান ব্যবহার করে প্রায় ৩০-৩৫ জনকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করানোর চেষ্টা করে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিজিবি টহল সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দাদের তাত্ক্ষণিক প্রতিরোধের মুখে বিএসএফ ঐ ব্যক্তিদের সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
গোগা ও রুদ্রপুর সীমান্তে নজরদারি
খুলনা ব্যাটালিয়নের (২১ বিজিবি) আওতাধীন যশোরের গোগা ও রুদ্রপুর সীমান্ত এলাকায়, সম্ভাব্য অনুপ্রবেশের জন্য সীমান্তের কাছে বেশ কয়েক জন নারী-পুরুষকে জড়ো হতে দেখা গেছে। ২০ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধীনস্থ জয়পুরহাটে, কোয়া ও বাসুদেবপুর সীমান্তের কাছে অনুপ্রবেশের চেষ্টার প্রস্তুতিতে প্রায় ১০ জন জড়ো হয়েছিল বলে জানা গেছে, যা পরে ব্যর্থ করে দেওয়া হয়।
পঞ্চগড়ে পুশইন ও প্রত্যাবর্তন
১৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধীনে পঞ্চগড়ের রওশনপুর সীমান্ত এলাকায় বিএসএফ এক ব্যক্তিকে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়রা তাকে আটক করে বিজিবির হাতে তুলে দেয়। পরে যাচাই-বাছাইয়ের পর তাকে ভারতে ফেরত পাঠানো হয়।
মালদায় আটক ২২ জনকে পুশইনের প্রস্তুতি
৫৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধীনে মহানন্দা ব্যাটালিয়নের সোনা মসজিদ সীমান্ত এলাকায় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মালদা জেলার ইংলিশ বাজার থানার অন্তর্গত চন্দন পার্কে ভারতীয় পুলিশের স্থাপিত একটি কেন্দ্রে আটক ২২ জনকে সম্ভাব্য পুশইনের জন্য বিএসএফের কাছে হস্তান্তরের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল। বিজিবি জানিয়েছে, কড়া নজরদারির কারণে তারা পুশইনে ব্যর্থ হয়েছে।
সিলেটে সন্দেহভাজন আটক
৪৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধীনে সিলেটে উত্মাছড়া সীমান্ত এলাকায় স্থানীয়রা দুজন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক করে বিজিবির হাতে তুলে দিয়েছে। যাচাই-বাছাইয়ের পর, তাদের ভারতীয় নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করা হয় এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ফেরত পাঠানো হয়।
নেত্রকোনায় জড়ো হওয়া ব্যক্তি
৩১ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধীনে নেত্রকোনার কোচুগোড়া সীমান্তের কাছে বালিশি গীতারাম সরকারি অফিসের নিকটবর্তী ভারতীয় ভূখণ্ডে ১৫-২০ জন ব্যক্তি জড়ো হয়েছিল বলে জানা গেছে। বিজিবি জানিয়েছে, সীমান্তের কিছু অংশে বেড়া না থাকায় তারা উচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
লালমনিরহাটে ৩৩ জনকে পুশইন চেষ্টা
লালমনিরহাট প্রতিনিধি জানান, জেলার চারটি পৃথক সীমান্ত এলাকা দিয়ে ৩৩ জনকে বাংলাদেশে পুশইন চেষ্টা করেছে বিএসএফ। তবে বিজিবির তাত্ক্ষণিক তত্পরতায় ওই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। গতকাল শুক্রবার ভোরে জেলার বড়খাতা, পয়ষট্টিবাড়ি, দুর্গাপুর ও দিঘলটারী সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছে ১৫ বিজিবি ও ৬১ বিজিবি ব্যাটালিয়ন কর্তৃপক্ষ। লালমনিরহাট ১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমাম বলেন, ‘অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করা ব্যক্তিদের সীমান্তের শূন্যরেখায় আটকে দেওয়া হয়েছে। সীমান্ত পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। যে কোনো ধরনের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।’
নওগাঁয় ১৭ জনকে পুশইন চেষ্টা, পতাকা বৈঠক
নওগাঁ প্রতিনিধি জানান, সাপাহার সীমান্ত এলাকা দিয়ে নারী, পুরুষ এবং শিশুসহ ১৭ জনকে পুশইনের চেষ্টা চালিয়েছে বিএসএফ। ১৭ জনের মধ্যে ৬ জন পুরুষ ৬ জন নারী এবং পাঁচজন শিশু রয়েছে। বিজিবির তাত্ক্ষণিক তত্পরতায় বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেনি তারা। শুক্রবার সকাল ৮টার দিকে উপজেলার হাঁপানিয়া এ ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে দুপুরে দুই দেশের বাহিনী পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিএসএফ তাদেরকে বাংলাদেশি বলে দাবি করলেও এর পক্ষে কোনো প্রমাণাদি দেখাতে পারেনি। ফলে সমাধান ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়। নওগাঁ ব্যাটালিয়ান ১৬ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম মাসুম বলেন, অবৈধভাবে বাংলাদেশে কাউকে অনুপ্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
পুশইন প্রতিরোধে কোস্ট গার্ড তৎপর
পুশইন প্রতিরোধে তৎপর রয়েছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। বাহিনীটি উপকূলীয় সীমান্তবর্তী এলাকায় টহল ও নজরদারি জোরদার করেছে। গতকাল শুক্রবার বিকালে কোস্ট গার্ড মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, আমরা সচেতন নাগরিকদের আহ্বান করছি পুশইন সংক্রান্ত যে কোনো তথ্য কোস্ট গার্ড জরুরি সেবা নম্বর ১৬১১১-এ প্রদান করে পুশইন রোধে সহযোগিতা করুন।



