নতুন বাজেটে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার
নতুন বাজেটে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগের কারণে দেশের অর্থনীতি যখন নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন নতুন অর্থবছরের বাজেটে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে যাচ্ছে সরকার। নীতিনির্ধারকদের আশা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের মাধ্যমে অর্থনীতিতে নতুন গতি ফিরবে, তৈরি হবে লাখো নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার যে বাজেট প্রস্তাব করা হচ্ছে, তার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে বেসরকারি খাতকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা। সরকারের বিশ্বাস, দীর্ঘদিন ধরে মন্থর হয়ে থাকা বিনিয়োগ প্রবাহকে সচল করতে পারলে শিল্প, কৃষি ও সেবা খাত নতুন করে গতিশীল হবে এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রও বিস্তৃত হবে।

কেন কর্মসংস্থান এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ?

বাংলাদেশে প্রতি বছর লাখ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু সেই তুলনায় নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। অনেক শিক্ষিত তরুণ দীর্ঘদিন চাকরির অপেক্ষায় থাকছেন। আবার অনেকেই নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ না পেয়ে কম দক্ষতার কাজে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু সরকারি চাকরির ওপর নির্ভর করে দেশের বেকারত্ব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কর্মসংস্থানের প্রধান উৎস হতে হবে বেসরকারি খাত, শিল্পায়ন এবং নতুন বিনিয়োগ। ফলে বিনিয়োগ বাড়াতে না পারলে কর্মসংস্থান সংকট আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই এবারের বাজেটে কর্মসংস্থানকে প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রবিন্দুতে আনা হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জিডিপির ৩১.৪ শতাংশ বিনিয়োগের লক্ষ্য

সরকার আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ বিনিয়োগে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং সরকারি খাতে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ বিনিয়োগ আনার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থ বিভাগ মনে করছে, এই লক্ষ্য অর্জন করা গেলে অর্থনীতির চাকা আরও দ্রুত ঘুরবে। নতুন শিল্প কারখানা গড়ে উঠবে, উৎপাদন বাড়বে, রপ্তানি সম্প্রসারিত হবে এবং তার সরাসরি প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থানে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বিনিয়োগ বাড়লে শুধু বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান নয়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ব্যবসাও সম্প্রসারিত হবে। এর ফলে শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

২৫ লাখ কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা

দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে বন্ধ ও অর্ধচলমান শিল্পপ্রতিষ্ঠান। উৎপাদন বন্ধ হওয়ায় কর্মসংস্থান হারিয়েছেন হাজার হাজার শ্রমিক। অনেক কারখানার রপ্তানি কার্যক্রমও স্থবির হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবার উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা, নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের মতে, এই কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।

এই বৃহৎ প্রণোদনা প্যাকেজের অংশ হিসেবে বন্ধ শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করতে ২০ হাজার কোটি টাকার একটি ‘প্রাক-অর্থায়ন স্কিম’ গঠন করা হয়েছে। গত ৪ জুন জারি করা বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সার্কুলারে বলা হয়েছে, তিন বছর মেয়াদি এই তহবিল ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য ব্যবহার করে পরিচালিত হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন শিল্প স্থাপনের তুলনায় বন্ধ কারখানা পুনরায় চালু করা অনেক দ্রুত এবং তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়বহুল। অনেক প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো, যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবল আগে থেকেই রয়েছে। প্রয়োজন শুধু অর্থায়ন ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা। তাই এই তহবিলের মাধ্যমে সম্ভাবনাময় কিন্তু আর্থিক সংকটে বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় উৎপাদনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধাও রাখা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা মাত্র ৪ শতাংশ সুদে ঋণ পাবেন। এর ফলে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও শ্রমঘন শিল্প খাত নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এই কর্মসূচি কেবল বন্ধ কারখানা চালুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একই সঙ্গে থমকে যাওয়া রপ্তানি কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করা, উৎপাদন বৃদ্ধি করা এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিও এর অন্যতম লক্ষ্য। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, চামড়া, কৃষিভিত্তিক শিল্প, হালকা প্রকৌশল এবং সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো এ সুবিধার আওতায় আসতে পারে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বর্তমানে বেসরকারি বিনিয়োগের ধীরগতি এবং কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ দেশের অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ। এমন পরিস্থিতিতে বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করা গেলে স্বল্প সময়ের মধ্যেই উৎপাদন ও কর্মসংস্থান উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। পাশাপাশি ব্যাংক খাতের উদ্বৃত্ত তারল্য উৎপাদনমুখী খাতে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই কর্মসূচির সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। প্রকৃত উৎপাদনমুখী ও সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে অর্থায়ন পায় এবং ঋণের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহৃত হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।

তাদের মতে, সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে ৬০ হাজার কোটি টাকার এই প্রণোদনা কর্মসূচি বন্ধ শিল্পে নতুন প্রাণ ফিরিয়ে আনতে পারে। একই সঙ্গে উৎপাদন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করবে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বিনিয়োগ কেন কমেছে?

গত কয়েক বছরে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি। এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। ডলার সংকটের কারণে শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে সমস্যা তৈরি হয়েছে। ব্যাংক ঋণের সুদের হার বেড়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্কতা বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি সংকট এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি শিল্প খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে। ফলে অনেক উদ্যোক্তা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়েছেন। কেউ কেউ বিদ্যমান বিনিয়োগ সম্প্রসারণের সিদ্ধান্তও স্থগিত রেখেছেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে শুধু কর সুবিধা দিলেই হবে না; ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো, নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং আর্থিক খাতের সংস্কারও জরুরি।

কর্মসংস্থানের জন্য কোন খাতগুলোতে জোর?

সরকারি সূত্র বলছে, তৈরি পোশাক শিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি, হালকা প্রকৌশল, ওষুধ শিল্প এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এসব খাত তুলনামূলকভাবে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম। বিশেষ করে তরুণ ও নারীদের কর্মসংস্থানে এসব খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং স্টার্টআপ খাতেও নতুন সুযোগ তৈরির বিষয়ে আলোচনা চলছে।

এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন

সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে এবারের বাজেটকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, আর্থিক খাত সংস্কার এবং সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বড় অর্থনীতিতে পরিণত হতে হলে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন যথেষ্ট নয়; উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে হবে। কারণ কর্মসংস্থান বাড়লে মানুষের আয় বাড়ে, ভোগ বৃদ্ধি পায় এবং অভ্যন্তরীণ বাজারও শক্তিশালী হয়।

বড় লক্ষ্য, বড় চ্যালেঞ্জ

তবে সরকারের এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার সামনে বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। চলতি অর্থবছরেই রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। ইতোমধ্যে রাজস্ব ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। সরকারি ব্যয় মেটাতে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঋণ নিতে হয়েছে। অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ধীরগতি বিনিয়োগের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কাগজে-কলমে বিনিয়োগের লক্ষ্য নির্ধারণ করা সহজ, কিন্তু বাস্তবে তা অর্জনের জন্য প্রয়োজন কার্যকর নীতি বাস্তবায়ন, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা।

বাজেটের সফলতার আসল মাপকাঠি

বিশেষজ্ঞদের মতে, এবারের বাজেটের সফলতা শুধু রাজস্ব আদায় বা ব্যয়ের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা যাবে না। বরং কত নতুন বিনিয়োগ এলো, কত নতুন শিল্প স্থাপিত হলো এবং কত মানুষের কর্মসংস্থান হলো—সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক। কারণ দেশের কোটি কোটি তরুণের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই—কবে তৈরি হবে নতুন চাকরি? নতুন বাজেট সেই প্রশ্নের কতটা কার্যকর উত্তর দিতে পারে, সেটিই আগামী দিনের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে।

অর্থনীতির ভাষায় এটি শুধু একটি বাজেট নয়; বরং বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে অর্থনীতিকে নতুন গতিপথে ফেরানোর একটি পরীক্ষাও বটে। সফল হলে কর্মসংস্থানের বাজারে নতুন জোয়ার আসতে পারে, আর ব্যর্থ হলে বেকারত্বের চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।