ঈদ-চাঁদ শেষে কর্মস্থল জমেছে। গণমাধ্যম জুড়ে ছিল মানুষের ঘরে ফেরা-সংক্রান্ত খবর। কর্মস্থলে ফেরার পর এখন খবরের জগৎ বাজেট নিয়ে। গত মাস খানেকেরও বেশি সময় ধরে দেশের বিশাল সীমান্ত জুড়ে কী পরিস্থিতি যাচ্ছে, তা কীভাবে মোকাবিলা করে চলছে আমাদের সীমান্ত শার্দূল বিজিবি সদস্যরা–সেই খবরাদির সামান্য অংশই আসছে গণমাধ্যমে।
পুশব্যাক প্রতিহতে বিজিবির সাফল্য
সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় ভারতের পরিকল্পিত পুশব্যাকের অপচেষ্টা শক্ত হাতে প্রতিহত করছে বিজিবি। দিন-রাত মিলিয়ে অহর্নিশ বিভিন্ন সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে তারা। স্থানীয়দের সঙ্গে নিয়ে টহল, মাইকিংসহ বিশাল এক কর্মযজ্ঞ চালাচ্ছে বাহিনীটি। যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিয়ে কাটছে তাদের প্রতিটি মুহূর্ত। এরই মধ্যে পুশইনের বেশ কয়েকটি চেষ্টা রুখে দেওয়া হয়েছে সাফল্যের সঙ্গে।
ভারতের তৎপরতা ও বিজিবির প্রতিরোধ
এর পরও বিএসএফসহ ভারতীয় সীমান্ত সম্পৃক্ত শক্তি দমছে না। দৃশ্যত একটু-আধটু দম নেয়। পুশইনের উদ্দেশ্যে আজ এখানে, কাল সেখানে সীমান্তের নানা পয়েন্টে কথিত বাংলাদেশিকে জড়ো করে। বিজিবি আগাম তথ্যদৃষ্টে যথা প্রস্তুতিতে তা রুখে দিচ্ছে। বেনাপোল, সাতক্ষীরা ও হিলিসহ বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকায় বিজিবির গত কিছু দিনের প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান সীমান্তবাসীর জন্য স্মরণকালের ঘটনা।
পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার ও পুশইন যন্ত্রণা
পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ব্যাপক পুশইন যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। ভারত থেকে বাংলা ভাষাভাষী সাধারণ মানুষকে অবৈধ অভিবাসী, রোহিঙ্গাসহ নানা আখ্যা দিয়ে বলপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন সংখ্যায় অধিক। সীমান্তে মানবিক বিপর্যয়, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা হুমকি এবং দুই দেশের মধ্যে চরম কূটনৈতিক অস্বস্তিও বিরাজ করছে।
বিজিবির ভূমিকা ও চ্যালেঞ্জ
বিএসএফ যখন কাঁটাতার ঘেঁষে বা নো-ম্যানস ল্যান্ডে লোকজনকে জড়ো করে ঠেলে দেওয়ার আয়োজন করে, তখন বিজিবিকে বাধ্য হয়ে 'পুশব্যাক' বা প্রতিরোধ করতে হয়। সমস্যাটি ভারতের নিজস্ব। পুশইন প্রক্রিয়ার শিকার ব্যক্তিরা তীব্র পরিচয়ের সংকটে আক্রান্ত। তাদের অনেকেরই বৈধ ভারতীয় নাগরিকত্ব বা কাগজপত্র থাকার পরও সন্দেহবশত বিতাড়িত করার অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার এবং বিজিবি এ অন্যায় অনুপ্রবেশের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বারবার কূটনৈতিক পত্র (ডিপ্লোমেটিক নোট) পাঠাচ্ছে। ভারত গা মাখাচ্ছে না। রাজনীতি ভারতের, আর ভুগছে বাংলাদেশ। গলদঘর্ম হতে হচ্ছে বিজিবিকে।
এমনিতেই দেশের সীমান্ত সুরক্ষা ও চোরাচালান দমনে দিনরাত হাই ভলিউম কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয় বিজিবিকে। সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ, মাদক ও অস্ত্র পাচার রোধ তাদের নিয়মিত কাজ। সেখানে এখন যোগ হয়েছে বাড়তি কাজ পুশইন রোখা। গঠনগতভাবে বিজিবি কেবল সীমান্ত সুরক্ষাই দেয় না। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে সচেতনতা বাড়ায়। শিক্ষা- চিকিৎসায়ও ভূমিকা রাখে। আবার জাতীয় প্রয়োজনের সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামলানোর কাজেও আসতে হয়।
ভারতে 'বাংলাদেশি শনাক্তকরণ' অভিযান
ভারতের আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, দিল্লি, কর্নাটক, মহারাষ্ট্র ও অন্যান্য রাজ্যে গত কয়েক বছরে 'বাংলাদেশি শনাক্তকরণ' অভিযান জোরদার হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে ভাষা, ধর্ম বা আর্থসামাজিক অবস্থানই সন্দেহের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষ করে দরিদ্র বাংলা ভাষাভাষী শ্রমজীবী মানুষদের নাগরিকত্ব প্রমাণে নানা জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে। বন্যা, নদীভাঙন বা দারিদ্র্যের কারণে বহু পরিবারের পুরোনো নথিপত্র হারিয়ে যাওয়ায় নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করাও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আসামের ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস (এনআরসি) প্রক্রিয়ার সময়ও নথিপত্রগত অসংগতির কারণে বহু মানুষের নাগরিকত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক আইন ও পুশইনের বৈধতা
এক দেশের নাগরিক আরেক দেশে অনুপ্রবেশ করলে তাকে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও আন্তর্জাতিক আইনকানুন অনুসরণ করে ফেরত পাঠাতে হয়। কিন্তু ভারত যেভাবে কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়া মানুষকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করে, তা সম্পূর্ণ বোইনি, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক রীতিনীতির পরিপন্থি। এভাবে পুশইনের ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়ে ভারতের কাছে কূটনৈতিক পত্র দিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু এখনো সীমান্তের বিভিন্ন স্থানে পুশইনের জন্য মানুষ জড়ো করা হচ্ছে।
নিকট অতীতে ভারত কর্তৃক এভাবে বড় ধরনের পুশইনের ঘটনা ঘটেনি। তবে এর আগে ২০০২-০৩ সালে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট ক্ষমতায় থাকার সময় ভারত থেকে প্রায়ই পুশইনের ঘটনা ঘটত। অনেক দিন পর সম্প্রতি আবারও সেই ধারাপাত। একে বিচ্ছিন্ন ও অপরিকল্পিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি কেবল সীমান্ত ব্যবস্থাপনা বা অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নাগরিক পরিচয়, মানবাধিকার, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক।
বিশেষ করে, ২০২৬ সালের ৯ মে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি নেতা ও মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর পরিস্থিতি আরো আলোচনায় আসে। অবৈধ অনুপ্রবেশ মোকাবিলাই যদি ভারতের উদ্দেশ্য হতো, তাহলে নারী-শিশুসহ এই মানুষগুলোকে চোখ বেঁধে নির্যাতন করে না খাইয়ে সীমান্তের জনমানবহীন স্থানে পুশইন করার প্রয়োজন পড়ত না।
সীমান্ত ব্যবস্থাপনার প্রটোকল ও লঙ্ঘন
সীমান্ত ব্যবস্থাপনার জন্য ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের প্রটোকল রয়েছে। এরকম দুটি প্রটোকল হলো জয়েন্ট ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ গাইডলাইনস ফর বর্ডার অথরিটিজ অব দ্য টু কান্ট্রিজ, ১৯৭৫ ও দ্য ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ কো-অর্ডিনেটেড বর্ডার ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান (সিবিএমপি), ২০১১। এসব প্রটোকলের আওতায় আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে মানব পাচার থেকে শুরু করে সব ধরনের সীমান্ত সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। কেউ যদি অবৈধভাবে কোনো দেশে ঢুকে থাকে, স্বভাবতই তাদের যে আইন আছে, সে অনুসারে তাদের বিচার হবে। অথবা বিষয়টি তারা সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারকে জানাবে। এটা না করে পুশইন করাটা মানবতাবিরোধী অপরাধ। ভারত ঐসব নিয়মের ধারেকাছেও যাচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতি অনুসারেও এভাবে এক দেশ থেকে মানুষকে অন্য দেশে ঠেলে দেওয়া অবৈধ। ইন্টারন্যাশনাল কোভেনেন্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস (আইসিসিপিআর) বা নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির আর্টিকেল ১৩ অনুসারে, কোনো দেশে বৈধভাবে থাকা ব্যক্তিকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া সেই দেশ থেকে বের করে দেওয়া যায় না। এ আর্টিকেলটি শুধু বৈধ নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য হলেও আর্টিকেল ১২(৪) অনুসারে, কোনো মানুষকেই তার নিজ দেশে প্রবেশের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটির মতে, এই বিধান বৈধ নাগরিকদের পাশাপাশি যাদের বৈধ নাগরিকত্বের কাগজপত্র নেই কিন্তু দীর্ঘদিনধরে কোনো দেশে বসবাস করছেন, তাদের জন্যও প্রযোজ্য। ভারত ও বাংলাদেশ উভয়ই এই আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুস্বাক্ষর করেছে। ফলে ভারত তার নিজ দেশে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী বাংলাভাষী নাগরিকদের বাংলাদেশে ঠেলে দিয়ে সরাসরি এই আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘন করছে।
অন্যদিকে কনভেনশন অন দ্য প্রটেকশন অব দ্য রাইটস অব অল মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কার্স অ্যান্ড মেম্বারস অব দেয়ার ফ্যামিলি বা অভিবাসী শ্রমিক এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের অধিকারের সুরক্ষা বিধিসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তির ২২ ধারা অনুসারে, আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কোনো অভিবাসী শ্রমিক ও তার পরিবারের সদস্যদের কোনো দেশ থেকে বহিষ্কার করা যাবে না।
সীমান্তে আটক মানুষের দুর্ভোগ
পুশইনের ঘটনার আগে বাংলাদেশের সীমান্তের ভেতরে এসে অনেকগুলো জায়গা তাদের বলে দখল করেছিল। বাংলাদেশের জনগণ বিজিবির সঙ্গে মিলে তাদের তাড়িয়ে দিয়েছে। পুশইনের ঘটনাগুলোর সবচেয়ে মানবিক দিকটি হলো সীমান্তে আটকে পড়া মানুষের দুর্ভোগ। সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তের জিরো লাইন, অস্থায়ী ক্যাম্প, সরকারি গেস্টহাউজ, এমনকি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও আটক ব্যক্তিদের রাখার খবর পাওয়া গেছে। নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের অনেকে দিনের পর দিন অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটাচ্ছে। তারা কোথায় যাবে, কোন দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পাবে কিংবা শেষ পর্যন্ত তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব দরকার।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিষ্ট



